প্রকৃতি থেকে শিশুর শিক্ষা

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

হুমায়ূন কবির

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চাহিদার পরিবর্তন হয় এবং পরিবর্তন হয় তাদের জীবনমানের। চাণক্য সেনের 'পুত্র পিতাকে' বইটিতে এর আরও ভালোভাবে উলেল্গখ আছে। প্রত্যেক পিতা-মাতাই চান সন্তান আগামীর টিকে থাকার সংগ্রামে এগিয়ে থাকবে; কিন্তু সন্তান জীবন-সংগ্রামে কতটুকু সফল হবে, তা বেশিরভাগ নির্ভর করে তার শৈশবকালের ওপর। কেননা শিশুর মানসিক বিকাশ শুরু হয় মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই। শিশুর মস্তিস্কে অধিকাংশ নিউরন বৃদ্ধি পায় মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় এবং জন্মের পর খুব কমই তা বৃদ্ধি পায়। তাই সন্তানের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, গর্ভবতী মায়ের সুস্থতা নিশ্চিত করা। জন্মের পর শিশুর বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ এবং পরিবেশের প্রভাবে বিভিন্ন উদ্দীপনা সৃষ্টির মাধ্যমে ওই নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ ঘটে। এ সংযোগের ফলে নিউরনগুলো সক্রিয় হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মানসিক বিকাশও শুরু হয়। মনোবিজ্ঞানের পরীক্ষণ অনুসারে ৮০-৯০ শতাংশ মানসিক বিকাশ সাধিত হয় জন্মের পর পাঁচ বছর পর্যন্ত। এ সময়ে শিশুর আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা পরিচর্যা করা প্রয়োজন। শিশুর আবেগের বহিঃপ্রকাশ এবং অন্যের ভাবভঙ্গি উপলব্ধির মাধ্যমে যাতে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়, এ জন্য শিশুর সঙ্গে খেলাধুলা করা, শিশুর সঙ্গে কথা বলা, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তার আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো উচিত। অধিকাংশ অভিভাবক শিশুর আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে শিশুর হারজিত সাফল্য বিবেচনা করে তার বুদ্ধিমত্তা নির্ণয় করেন, যা শিশুকে খুবই হতাশ করে। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ অভিভাবক শিশুর পড়া মুখস্থ না হলে বা ক্লাসে ভালো রেজাল্ট না করলে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেন। যেমন অনেক মা-বাবা সন্তানকে বলেন, তুই যদি ভালো ফল না করিস, তাহলে আমার মরামুখ দেখবি। ওই বাড়ির সন্তান অনেক ছোট হয়েও তুর থেকে অনেক ভালো ফল করেছে, তার পা ধুয়ে পানি খেতে যা ইত্যাদি। এ ধরনের মানসিক শাস্তি শিশুর বিকাশে দীর্ঘ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রায় সময় দেখা যায়, শিশুর মতপ্রকাশে স্বাধীনতা দেওয়া হয় না। বড়দের মাঝে ছোটদের নাক গলাতে নেই বলে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শিশুর মানসিক বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সন্তানকে প্রাণ খুলে হাসতে ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিন। মনোবিজ্ঞানী ক্যাসপার অ্যাডিমান গবেষণা করে দেখান, হাসির মাধ্যমেই শিশু সামাজিকতা বুঝতে শেখে। ফ্রয়েড বলেছেন, নিজেকে বুদ্ধিমান মনে করায় শিশু হাসে। হাসি শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শিশু যাতে আত্মবিশ্বাস ও হীনমন্যতায় না ভোগে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শিশুর মানসিক বিকাশে জন্মের পর পাঁচ বছর সময়ে শিশুর পঞ্চইন্দ্রিয়ের যথাযথ ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এ সময়টাতেই শিশুর অধিকাংশ নিউরনের সংযোগ ঘটে। প্রথমদিকে শিশুকে প্রকৃতি থেকেই শিক্ষার পাঠ নিতে দিন। প্রকৃতি আমাদের অনেক কিছু শেখায়। প্রকৃতির কাছ থেকে শিশু যদি শিক্ষা নিতে পারে, তাহলে মুখস্থের প্রবণতা ও মানসিক চাপ কমবে। শিশুর কোনো কথাকে হেয় করে উড়িয়ে না দিয়ে শিশুকে বোঝান ও তাকে উৎসাহ দিন। খেলাধুলা ও অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ করে দিন। এতে সামাজিকতার মনোভাব ও নেতৃত্বের গুণ পুষ্ট হবে। ধমক না দিয়ে শিশুর কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করতে হবে। এতে শিশুর অনুসন্ধিৎসু মন তৈরি হবে। সর্বোপরি শিশুর যথাযথ যত্ন নিন এবং একজন সুন্দর মনের মানুষ ও আগামীর সম্পদ হতে সহায়তা করুন। যতটুকু পারুন শিশুকে প্রকৃতির মাঝে রাখুন। প্রকৃতিকে জানতে ও ভালোবাসতে তাকে শেখান।