শ্রদ্ধাঞ্জলি: রাশেদ সোহরাওয়ার্দী

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদ

গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একমাত্র পুত্র রাশেদ সোহরাওয়ার্দী যুক্তরাজ্যে গ্রেটার লন্ডনে নিজ বাসভবনে ২০১৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রথম স্ত্রী নিয়াজ ফাতেমা ১৯২২ সালে ইন্তেকাল করেন। তার এক পুত্র ও এক কন্যা আকতার জাহান ও শাহাব সোহরাওয়ার্দী। শাহাব সোহরাওয়ার্দী ছাত্র থাকাকালে ১৯৪০ সালে লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর ১৮ বছর বিয়ে করেননি। ১৯৪০ সালে তিনি রাশিয়ান অভিনেত্রী ভেরা অ্যালেক্সান ড্রভনা টিসেস্কোকে বিয়ে করেন। ১৯৪৬ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে ভেরা শিশুপুত্র রাশেদকে নিয়ে লন্ডনে বসবাস করেন। ভেরা অ্যালেক্সান ড্রভনা টিসেস্কো ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বড় ভাই শাহেদ সোহরাওয়ার্দী মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি মস্কো থিয়েটারে কাজ করতেন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার বিপ্লবের সময় শাহেদ সোহরাওয়ার্দী ও ভেরা উদ্বাস্তুদের সঙ্গে মস্কো ত্যাগ করেন। ১৯৩০ সালে তারা ভারতে আসেন। ভেরা কলকাতায় বাস করতেন।

১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করেন। পিতার মুক্তির জন্য ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসে রাশেদ সোহরাওয়ার্দী এবং সোহরাওয়ার্দীর কন্যা আকতার জাহান আইয়ুব খানের সিনিয়র মন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে করাচিতে তার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। তারা বিনা শর্তে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি দাবি করেন। ৬ মাস কারাভোগের পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুক্তি লাভ করেন। এ সময় রাশেদ সোহরাওয়ার্দী লন্ডনে স্কুলের ছাত্র ছিলেন।

রাশেদ সোহরাওয়ার্দী চার্টার হাউস অক্সফোর্ড এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রয়েল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্ট থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে অভিনয় পেশায় যোগ দেন। তিনি রয়েল শেকসপিয়র কোম্পানিতে কয়েক বছর ছিলেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ইচ্ছা ছিল পুত্র আইনে ডিগ্রি নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেবেন। পিতার বাসনা পূরণ হয়নি। রাশেদ সোহরাওয়ার্দী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেতা। তিনি ১৯৬৩ সালে ডক্টর হু, ১৯৯৮ সালে জিন্নাহ, ২০১৫ সালে লিজেন্ড চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। জিন্নাহ চলচ্চিত্রে তিনি নেহরুর ভূমিকায় অপূর্ব অভিনয় করেন। তিনি একজন বিশ্বখ্যাত লেখকও ছিলেন। লেখক হিসেবে তিনি রবার্ট অ্যাশবি নামে পরিচিত।

১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বৈরুত গমন করেন। তারপর লন্ডনে হ্যাম্প স্ট্রিট গার্ডেনে পুত্রের সঙ্গে ৬ মাস বাস করেন। এ সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার বিখ্যাত গ্রন্থ Memoirs বা স্মৃতিকথা লেখেন। রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে ১৯৮৭ সালে স্মৃতিকথা গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। আমি সে গ্রন্থের ভিত্তিতে ১৯৯৭ সালে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রন্থ রচনা করি।

১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বৈরুতে একটি হোটেলে মৃত্যুবরণ করেন। এ মৃত্যুর খবরে রাশেদ সোহরাওয়ার্দী বৈরুত গমন করেন। তিনি ৮ ডিসেম্বর পিতার লাশ নিয়ে ঢাকায় আসেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে রেসকোর্স ময়দানে জানাজার পর হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়। এ সময় রাশেদ সোহরাওয়ার্দী লন্ডনে স্নাতক শ্রেণির ছাত্র। ছাত্রজীবনে তিনি পিতার গ্রেফতার, মুক্তি আন্দোলন দেখেছেন এবং পিতার লাশ বহন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন ৬ দফা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণার পর শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। আওয়ামী লীগের এ সংকটকালে দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া লন্ডন থেকে রাশেদ সোহরাওয়ার্দীকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পল্টন ময়দানে ৬ দফা ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের আসন শূন্য রেখে সভা চলছে। প্রধান অতিথি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পুত্র রাশেদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ৬ দফা বাস্তবায়ন ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের মুক্তি দাবি করেন। তার ভাষণ ৬ দফা আন্দোলনকে বেগবান করে। সেখানে আমিও ছিলাম।

১৯৯৯ সালের ৬-১৪ জুলাই যুক্তরাজ্য সফরে আমি প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমি এ সময় বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান। ৯ জুলাই যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের উদ্যোগে লন্ডনের টয়েনবি হলে বক্তৃতা-৯৮ অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা শেখ হাসিনা, আলোচক ছিলেন রাশেদ সোহরাওয়ার্দী। ভাষণের এক পর্যায়ে লন্ডন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা রাশেদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন,  I consider Sheikh Hasina & Sheikh Rehana as my own sisters. I request her, to remaining Prime Minister as long as she lives. তার এ ভাষণ সত্যিই প্রমাণিত। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে আছেন এবং চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। রাশেদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টির জন্য নেতৃত্ব দেন। পিতার মতো তার মেধা ও দক্ষতাও ছিল। তার মৃত্যুতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাচ্ছি।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গ্রন্থ প্রণেতা