ইটভাটায় করুণ মৃত্যু ও মঙ্গামুক্ত উত্তরবঙ্গ

সমাজ

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯     আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

নূরুননবী শান্ত

মনোরঞ্জন রায়ের বয়স ১৫। দশম শ্রেণিতে উঠেছিল এবার। তার ছোট ভাই নির্মল চন্দ্র রায়ও অনেক স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রবল অভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে লেখাপড়া করে যাচ্ছে। ওরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, লেখাপড়াই উন্নত জীবনের হাতিয়ার। প্রায় একই বয়সী স্বপ্নবান কিশোর মৃণাল চন্দ্র রায়, শঙ্কর চন্দ্র রায়, প্রশান্ত রায়, তরুণ চন্দ্র রায়, বিপ্লব কুমার রায়, মোরসালিন, মোহাম্মদ সেলিম, মাসুম ও অমিত চন্দ্র রায়- সবাই নীলফামারী জেলার শিমুলবাড়ি গ্রামের সন্তান। হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম ওদের। ওদের বুকে অসীম স্বপ্ন লেখাপড়া শিখে দারিদ্র্য জয় করার। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে যেহেতু ক্লাস করার চাপ নেই, পরীক্ষা শেষ; তাই কিছু পয়সা রোজগারের জন্য গ্রামের প্রাপ্তবয়স্ক দিনমজুর কনক চন্দ্র রায়ের (৩৫) নেতৃত্বে ওরা গিয়েছিল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে; বিদেশে। কুমিল্লার মানুষের কাছে বিদেশ বলতে হয়তো পাশ্চাত্য বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। কিন্তু নীলফামারীর শিমুলবাড়ির অভাব-অনটনে জর্জরিত মানুষের কাছে কুমিল্লাই বিদেশ। কুমিল্লার ইটভাটায় দিনমজুরি রংপুর অঞ্চলের দিনমজুরির চেয়ে দ্বিগুণ। রংপুর-নীলাফামারীতে ইটভাটার শ্রমিকের দিনমজুরি ৩শ' টাকা; কুমিল্লায় ৬শ'। মাস দুই-তিন খাটলে এক বছরের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করা যায়। কনক কাকার কাছে এই হিসাব পেয়ে কিশোর শিক্ষার্থীরা বছরান্তের ছুটির সময়ে তাই কুমিল্লা গিয়েছিল ইটভাটায় কাজ করতে। কাজী অ্যান্ড কোং ইটভাটার মালিক তাদের সপ্তাহের সাতদিন খাটাত। অসুখ-বিসুখ হলেও নিস্তার নেই। রাতে থাকতে হতো কয়লার স্তূপের পাশে অস্থায়ী ঘরে। ওরা যখন ঘুমায় তখন কয়লাভর্তি ট্রাক আনলোড হয়। অনেক শব্দ হয় তখন। কিন্তু ক্লান্ত দেহগুলোর ঘুম ভাঙে না। আনলোড করার সুবিধার জন্য ট্রাকের ডালা কয়লার স্তূপের বেশ খানিকটা ওপরে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু ২৫ জানুয়ারি এভাবে ট্রাক রাখতে গিয়ে ট্রাকের ভারসাম্য হারিয়ে যায়। কয়লাসহ ট্রাক উল্টে গেলে শ্রমিকদের থাকার জায়গাটা চাপা পড়ে। এক মুহূর্তে ১৩টি প্রাণপাখি স্তব্ধ হয়ে যায়! ভেঙে যায় ১৩টি পরিবারের স্বপ্ন। তাদের মধ্যে ১০ জনই স্কুল শিক্ষার্থী, যারা লেখাপড়ার খরচ জোগাতে নীলফামারীর মীরেরবাজার থেকে বাসে চেপে কুমিল্লায় গিয়েছিল। প্রতিদিনই সেখান থেকে শতাধিক শ্রমিক যেমন যায় ভাগ্যের সন্ধানে।

মা-বাবার আদরের ছেলেগুলোকে কী বলব? শ্রমিক, শিক্ষার্থী, শিশু, না কিশোর? জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ মোতাবেক এদের শিশুই বলতে হয়। তবে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে শিশুর বয়স নিয়ে দ্বিধান্বিত না হয়ে উপায় নেই। সংবিধান অনুযায়ী ১৬ বছরের নিচে ছেলেমেয়েদের শিশু ধরা হয়েছে। ২০১১ সালের শিশুনীতি অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে হলেই শিশু; কারখানা আইনে শিশুর বয়স ১৬ বছর, দোকান ও প্রতিষ্ঠান আইনে ১২, খনি আইনে ১৫, চুক্তি আইনে ১৮, শিশু (শ্রম নিবন্ধক) আইনে ১৫। এদিকে, শ্রম আইনে বলা হয়েছে, যে শিশুর বয়স ১৪ বছর পূর্ণ হয়নি, তাকে কারখানার কাজে নিয়োগ করা যাবে না; ১৪ পূর্ণ হয়েছে কিন্তু ১৮ পূর্ণ হয়নি এমন বয়সীদের শর্তসাপেক্ষে নিয়োগ দেওয়া যায়। যেমন, শিশুদের দৈনিক ৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না; শিশুদের কাজের সময় হবে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে। নিরাপত্তার জন্য আরও অনেক দিকনির্দেশনা আছে আইনে। অন্যদিকে, সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ বলেছে, রাষ্ট্র সব বালক-বালিকার অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বার্থের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র প্রাথমিক কর্তব্য বলে মনে করবে। ৩৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব ধরনের জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ।

২৫ জানুয়ারি ২০১৯, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ট্রাকচাপায় মরে যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে ১০ জনেরই বয়স ১৮-এর নিচে। এখন, এই যে নীলফামারী দেশ থেকে কুমিল্লা দেশে একদল শিশু ওরফে বালক শ্রম বিক্রি করতে গেল, ওদের কি কেউ জবরদস্তি করে নিয়ে গেছে? বাহ্যিকভাবে- না। তবে পরিস্থিতির জবরদস্তি তো ছিল বটে। তীব্র দারিদ্র্য ওদের জবরদস্তি করেছে। রংপুরের মঙ্গা নাকি বিদায় নিয়েছে! সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের ভেতরে বসে এখন মঙ্গার কথা বলতে আস্পর্ধাও কিছুটা লাগে। গরিবের জন্য দু'বেলা দু'মুঠো খেয়ে মুখ বুজে থাকার নাম মঙ্গামুক্ত থাকা। লেখাপড়ার নূ্যনতম ব্যয়ভার বহন করার অক্ষমতা মঙ্গার মধ্যে পড়ে না; পুষ্টিহীনতা মঙ্গা নয়; বেঁচে থাকার অনিরাপত্তাও মঙ্গা নয়। রাষ্ট্রের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ছায়ার নিচে উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্য উন্নয়ন বৈষম্যের বিচ্ছিন্ন নমুনামাত্র। শিমুলবাড়ির স্কুলপড়ূয়া মফিজ (বোকা!) ছেলেগুলো কুমিল্লার ইটভাটায় শেষবারের মতো ঘুমোতে যাওয়ার আগে কেউ কেউ বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছে- তারা ফিরবে দেশে, ঘরে। কিন্তু শ্রমিকদের বাঁচা-মরা আল্লাহর হাতে! কাজ করো, মজুরি নাও। হঠাৎ মরে গেলেও শ্রমিকদের পরিবারের লাভ। সরকার কিছু টাকা তো দেবে এসব তুচ্ছ জীবনের বিনিময়ে। তাতে এদের আয়ের তুলনায় অনেকদিন চলবে পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের।

এই ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড বলার সৎসাহস আমাদের নেই। কাকে অভিযুক্ত করা সম্ভব? ট্রাকচালক ও হেলপার; যারা ঝুঁকি সত্ত্বেও কয়লার স্তূপের ওপরে ভারসাম্যহীনভাবে ট্রাক দাঁড় করিয়েছিল? কাজী অ্যান্ড কোং ইটভাটার মালিক, যিনি একটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কিশোর শ্রমিকদের ঘুমানোর ব্যবস্থা অনুমোদন করেছিলেন? কিশোররা নিজেরাই; যারা বেশি মজুরির লোভে জলঢাকার মীরেরবাজার থেকে বাসে চড়ে কুমিল্লায় গিয়েছিল? নাকি চরম দারিদ্র্য, যার কারণে তারা বাধ্য হয়েছিল কয়েক মাসের দাস-জীবন বেছে নিতে? দাস-জীবনই বটে। আধুনিক দাস-জীবন। সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের চাপে মানুষ যখন বাধ্য হয় ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে, সে মানুষকেই আধুনিক দাস হিসেবে চিহ্নিত করা যায় নিশ্চয়। সংবিধান তার নিরাপত্তা দিতে পারে না। এক মীরেরবাজার থেকেই প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ বাসভর্তি শ্রমিক যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হওয়ার জন্য। তাহলে, পুরো নীলফামারী জেলা থেকে কত মানুষ শ্রম বিক্রি করতে দেশের নানা প্রান্তে ছোটে? সেই নীলফামারী, যেখানকার উত্তরা ইপিজেড ইতিমধ্যে কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে; যেখানকার সৈয়দপুরের যোগাযোগ-সুবিধা বড় শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত সহায়ক। অন্যদিকে, রংপুরের গঙ্গাচড়া থেকে কয় বাস শ্রমিক যায় দেশের নানা প্রান্তে? কিংবা লালমনিরহাট বা কুড়িগ্রাম জেলা থেকে? এই শ্রমিকদের মধ্যে তাহলে শিক্ষার্থীরাও আছে, যারা হয়তো একদিন সরকারের কর্মকর্তা হতো, বিচারক হতো, শিক্ষক হতো, উদ্যোক্তা হতো কিংবা শিক্ষিত বেকার হতো। আগে লেখাপড়া করতে যাওয়া কেউই শ্রমিক হওয়ার কথা ভাবতে পারত না। সে ট্যাবু ভেঙে গেছে। শ্রমিকের জন্য আসলে সাক্ষরতা-নিরক্ষরতায় ফারাক নেই। শ্রমিক শ্রমিকই। নিজ এলাকায় এদের জন্য কাজ নেই। কাজ থাকলেও মজুরি বৈষম্য আছে। তাই জন্মস্থান ছেড়ে দূরে যাওয়া।

বহুকাল ধরে শোনা যাচ্ছে, রংপুর অঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আরও কত বছর লাগবে সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে? রংপুর বিভাগের দিনমজুর সস্তায় কেনা যায় বলে দেশের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে তাদের বিরাট সুনাম। এই সুনাম নিয়ে তারা তো দেশের বাইরেও শ্রম বিক্রি করতে যেতে পারত। কিন্তু এ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের কাছে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া সম্পর্কে কোনো তথ্যই নেই। জনগণের দক্ষতা বাড়ানোর কত কর্মসূচিই না আছে সরকারের! আরেকটু সচ্ছল জীবনের জন্য হা-পিত্যেশ করা উত্তরবঙ্গের জনগণ সেসব কর্মসূচির খবরও পায় না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ আয় ও ব্যয় খানা জরিপ এবং দারিদ্র্য মানচিত্র প্রতিবেদনে (রিপোর্ট ২০১৮) দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য রংপুর বিভাগে। বলা হয়েছে, উত্তরবঙ্গের একটি অংশে নতুন করে দারিদ্র্যের তীব্রতা ফিরে এসেছে। ওদিকে, বিশ্বব্যাংক মন্তব্য করেছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি গরিব পরিবারের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে না। এও এক প্রতিউন্নয়ন ধাঁধা! মঙ্গা দূর হয়েছে, অথচ দারিদ্র্য বাড়ছে! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার এমনিতেই কম; উত্তরাঞ্চলে বিনিয়োগ একেবারেই নেই। তাই, ২০১০ সালে যেখানে রংপুর বিভাগে ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ গরিব ছিল; ২০১৬ সালেই সেটা পৌঁছায় ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে। কুড়িগ্রাম জেলার দারিদ্র্যের হার ৭১ শতাংশ। বিবিএস জানাচ্ছে, আয় বেড়েছে ধনীদের; দরিদ্রদের বাড়েনি, বরং কমেছে। সাধারণ মানুষ হতাশায় নুয়ে পড়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণে উত্তরবঙ্গের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে, কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেই, বিনিয়োগ নেই, গ্যাস নেই, শিল্পায়ন নেই, বাণিজ্যিক কৃষির সম্প্রসারণ নেই, এখানকার তারুণ্যকে দক্ষ করে তোলার বিশেষ কর্মসূচি নেই। ফলে, এরা শ্রম বিক্রি করতে দেশের উন্নত অংশে যাবে, এখানকার পারিবারিক শৃঙ্খলায় বিপর্যয় তৈরি হবে, এরা মরে গেলে বড়জোর পরিবারপ্রতি অর্থ সহায়তা পাবে, গরিবের মৃত্যু হলে সংশ্নিষ্ট পরিবার ছাড়া কেউ কাঁদবে না। পরিবারের সদস্যদের কান্নাতেও মৃতের প্রতি কোনো ভালোবাসা থাকবে না। কেবল এই অসহায় আর্তনাদটুকু থাকবে- 'হামার এলা সংসারের খরচ চালাবে কায়?'

এ পরিস্থিতিকে নীরব মঙ্গা ছাড়া আর কী বা বলা চলে! মঙ্গা মানে কি আসলে খাদ্যাভাব? আমাদের শৈশবে যখন ঈদের জামা কিনতে যেতাম, যে জামাটা পছন্দ হতো অথচ কিনতে পারতাম না, সেটাকেই খুব 'মঙ্গা' বলা হতো। মাংস কেনা হতো না, মাংস 'মঙ্গা' বলে। মঙ্গা অর্থ বাজারে আছে, কিন্তু ভোক্তার সামর্থ্যে নেই। উত্তরবঙ্গের গরিব মানুষের কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মর্যাদা- সবই খুব মঙ্গা। সস্তা কেবল জীবন। একটা জীবনের দাম মাত্র ২০ হাজার টাকা!

গল্পকার, অনুবাদক, উন্নয়নকর্মী