মিডিয়া জগতে এখনও এক বিস্ময়

ওয়াটারগেট রিপোর্টিং

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

নূর ইসলাম হাবিব

ছেচল্লিশ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট দুই সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড এবং কার্ল বার্নস্টেইন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটন করে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিলেন। তাদের অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের কারণে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম নিক্সন বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েও পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্টের বিচক্ষণ সাংবাদিকদ্বয়ের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, নিক্সন প্রশাসন ও হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা ওয়াটারগেট চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ নোংরা খেলায় তাদের অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন। এ অনুসন্ধানী রিপোর্টিং মিডিয়া জগতে চার দশকের অধিককাল পরেও এক ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। আজও এটি এক বিস্ময়-জাগানিয়া ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক দলের সদর দপ্তর ওয়াশিংটনের ওয়াটারগেট নামক হোটেলে অবস্থিত। ১৯৭২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ওই সদর দপ্তর থেকে ডেমোক্রেটিক দলের নির্বাচনী প্রচার, পরিকল্পনা এবং অন্যান্য আলাপ-আলোচনা করা হয়। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন রিচার্ড এম নিক্সন। ডেমোক্রেটিক দল কর্তৃক নির্বাচনে যেসব পরিকল্পনা করা হয়, তা জানার জন্য ক্ষমতাসীন দল ওয়াটারগেট হোটেলে আড়ি পাতে এবং সব জেনে নেয়। এ ঘটনা সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এবং মার্কিন জনমনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি। এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন বেআইনি ও অনৈতিক কার্যাবলি জড়িত ছিল, যা মূলত করা হয়েছিল ১৯৭২ সালের নির্বাচনে নিক্সনকে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার উদ্দেশ্যে। ওয়াটারগেট ঘটনা ঘটানো হয়েছিল ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ অর্জনে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কলুষিত করা হয়েছিল, অবাধ ও মুক্ত নির্বাচন পদ্ধতিকে আঘাত করা হয়েছিল। ওয়াটারগেট কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল সিঁধেল চুরি, টেলিফোনে আড়িপাতা, নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন, নাশকতামূলক কার্যক্রম এবং উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার। ওয়াটারগেট ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আবার মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। এটিও ছিল আইনের দৃষ্টিতে আরেকটি অপরাধ।

নিক্সনের প্রেস সেক্রেটারি বারবার ঘোষণা করেছিলেন, ওয়াটারগেট ঘটনার সঙ্গে হোয়াইট হাউসের কোনো কর্মকর্তা জড়িত নেই। ১৯৭৩ সালের ৩০ এপ্রিল নিক্সন ঘোষণা করেন, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পরিকল্পনা এবং এ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকদ্বয় আবিস্কার করেন, হোয়াইট হাউস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডে সিআইএ ও এফবিআইকে ব্যবহার করেছে এবং নাশকতার কাজে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অপরাধে ৪০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়েছিল। এদের অনেকেই ছিলেন নিক্সন প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও পরামর্শক। আদালতে এদের অধিকাংশের অপরাধ প্রমাণিত হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল জন এন মিশেল, নিক্সনের দুই শীর্ষ সহযোগী জন ডি এহরিকম্যান ও এইচআর হলডেম্যান দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং আদালত তাদেরকে এক থেকে চার বছর মেয়াদের কারাদণ্ড দেন। ১৯৭৫ সালে নিক্সনের বাণিজ্যমন্ত্রী ও নির্বাচনী কমিটির নেতা মরিস এইচ স্ট্যানসও দোষী সাব্যস্ত হন এবং আদালত তাকে ৫ হাজার ডলার জরিমানা করেন।

১৯৭২ সালের ১৭ জুন পুলিশ ডেমোক্রেটিক পার্টির সদর দপ্তর ওয়াটারগেট হোটেল থেকে পাঁচজন সিঁধেল চোর আটক করলে হোয়াইট হাউস এটিকে একটি ছিঁচকে চুরির ঘটনা হিসেবে সাংবাদিকদের কাছে বর্ণনা করে। অথচ এ পাঁচজনের মধ্যে একজন ছিলেন নিক্সনের নির্বাচনী কমিটির নিরাপত্তা সমন্বয়ক, যা সুচতুরতার সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। নির্বাচনে নিক্সন বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ায় সাংবাদিকরা ওয়াটারগেট ঘটনাকে নিছক একটি চুরির ঘটনা হিসেবেই গ্রহণ করেন, যেমনটি হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছিল। অনেকের কাছেই এটি ছিল রাজনৈতিক তাৎপর্যহীন ঘটনা ও তারা এ ঘটনা তদন্তে তেমন সময় ব্যয় করেননি এবং উৎসাহীও ছিলেন না। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন উডওয়ার্ড ও বার্নস্টেইন। তারা এ ঘটনার সঙ্গে ধৈর্য সহকারে লেগে থাকেন এবং হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষের বর্ণনাকে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ বলে মেনে নেননি। ক্রমান্বয়ে তারা আবিস্কার করেন ঘটনার পেছনের খবর। প্রথম থেকেই তারা সন্দেহ দ্বারা তড়িত হয়েছিলেন, যা একজন সাংবাদিকের স্বাভাবিক প্রবণতা। তারা তাদের লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল এবং শেষ পর্যন্ত তারা সফল হলেন। তারা সামান্য ঘটনার মধ্যে অসামান্য কিছু অনুমান করছিলেন। ওয়াটারগেট ঘটনার সময় ওয়াশিংটন ডিসিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। বার্নস্টেইন পরবর্তীকালে বলেছেন, এদের মধ্যে ১৪ জন সাংবাদিক ওয়াটারগেট স্টোরি কভার করার কাজে তাদের সংস্থা কর্তৃক নিয়োজিত হয়ে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছিলেন। এদের মধ্যে আবার অর্ধডজন ছিলেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নিয়োজিত। এদের প্রায় সবাই গতানুগতিক ধারায় তাদের রিপোর্ট করছিলেন। হোয়াইট হাউস মুখপাত্রের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তারা তাদের প্রতিবেদন তৈরি করতেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হেলেন টমাস। তিনি বলেন, আমরা আসলে বাজেভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করেছিলাম। আমরা শুধু হোয়াইট হাউসে বসে হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের প্রদত্ত তথ্য অসাংবাদিকসুলভভাবে বিশ্বাস করেছিলাম, আসলে যা একদম ঠিক হয়নি।

ওয়াটারগেট ঘটনায় সমসাময়িককালে মার্কিন ওয়ার্কার্স সোশালিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে সরকার পরিচালিত নানা রকম হয়রানিমূলক আচরণের চিত্রও ফুটে ওঠে। নিবন্ধে বলা হয়, বিগত ৩৮ বছর ধরে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-এফবিআই ট্রটস্কিপন্থি ছোট রাজনৈতিক সংগঠন সোশালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে নানা রকম হয়রানিমূলক অভিযান পরিচালনা করেছে। এফবিআই সিঁধেল চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে, মিথ্যা সংবাদ প্রচার করেছে এবং দলটি ও তার সদস্যদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটিয়েছে। যদিও দলটির কর্মসূচি ছিল বৈপ্লবিক রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা করা; তথাপি এটি শান্তিপূর্ণভাবে এবং আইনসঙ্গত রাজনৈতিক আচরণই করত। এ সময় এই ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়নি। সরকারের অনৈতিক আচরণটি অনুদ্ঘাটিতই থেকে যায়।

ওয়াটারগেট ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সে দেশের একটি সল্ফ্ভ্রান্ত শ্রেণি আরেকটি সল্ফ্ভ্রান্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে নোংরা আচরণ করেছিল। বিষয়টি মার্কিন জনগণকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল। এ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একাধিক কমিটি গঠিত হয়। ফলে কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং তারা সবাই বিচারের সম্মুখীন হন। ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে সিনেট কমিটি তথ্য উদ্ঘাটন করে যে, নিক্সন শুধু ওয়াটারগেট ঘটনা জানতেনই না; তিনি ১৯৭১ সাল থেকে ওয়াটারগেটে অবস্থিত ডেমোক্রেটিক পার্টি অফিসে গোপনে আড়ি পেতে তাদের কথোপকথনও শুনে আসছিলেন। নিক্সন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির দায় এড়াতে পারেননি। এক পর্যায়ে তিনি ইমপিচমেন্ট এড়াতে ১৯৭৪ সালের ৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন। এ সময় ক্ষমতায় আসেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড আর ফোর্ড। তিনি ক্ষমতায় এসে নিক্সনের ওয়াটারগেট সংক্রান্ত সব অপরাধ ক্ষমা করে দেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের অনেক রাজনৈতিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও ওয়াটারগেট ঘটনা তার জন্য এক কলঙ্কতিলক হয়েই থাকল। মিডিয়া জগতে এটি আজও আলোচিত বিষয়।

সহকারী পরিচালক, আইএসপিআর
[email protected]