বিশ্ববাজারে বহুমুখী পাটপণ্য

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯      

রাশেদুল করীম মুন্না

সারাবিশ্বে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে আজ পরিবেশবান্ধব গ্রিন প্রোডাক্ট, ন্যাচারাল প্রোডাক্ট, ইকো-ফ্রেন্ডলি প্রোডাক্ট বা বায়োডিগ্রিবল প্রোডাক্টের চাহিদা বেড়ে চলছে। পরিবেশ সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশে পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধকরণসহ আইন পাস হচ্ছে।

১ জুলাই ২০১৮ থেকে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্স গভর্নর পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছে, যার মার্কেট সাইজ প্রায় ৯০০ মিলিয়ন পিস। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এ বছরে ৮০ শতাংশ প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণ আইন পাস করেছে এবং ২০২০ সাল থেকে সারা ইউরোপে একযোগে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগ ব্যবহূত হচ্ছে। প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এশিয়া প্যাসিফিক, আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশসহ অনেক দেশে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারে অধিক ট্যাক্স আরোপ, সীমিতকরণ ও নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বেশ কয়েকটি নামিদামি গাড়ি কোম্পানি যেমন মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, অডি ভক্সওয়াগন, ফোর্ড, টয়োটা, টেসলা, ক্রিসলার, ভলভো, মিৎসুবিসি পাটের ফাইবার ব্যবহার করে তাদের গাড়ির ইন্টেরিয়র কম্পোনেন্ট তৈরি করছে। জার্মান অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের মডেলে ন্যাচারাল ফাইবার অন্তর্ভুক্ত করার পথে এগিয়ে চলেছে। পাঁচ বছর আগে মার্সিডিজ ই-ক্লাস সিরিজে পাটভিত্তিক ডোর প্যানেল তৈরি করার ক্ষেত্রে জুট ফাইবার ব্যবহার করছে। ১৯৯৯ সালে তারা ন্যাচারাল ফাইবার ব্যবহার করে প্রায় ১৫ হাজার ৫শ' টন, যা প্রতি বছর বাড়ছে। বর্তমানে সব গাড়ি কোম্পানি প্রায় এক লাখ টন পাটের আঁশ ব্যবহার করছে। ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ইতিমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে কাঠ ও প্লাইউড ব্যবহার হ্রাস করে পাট থেকে জুট বোর্ড উৎপাদন ও ব্যবহার করছে।

বর্তমানে ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশ পাটের আঁশের সঙ্গে অন্যান্য ন্যাচারাল ফাইবার ও পলি প্রোপলিন যুক্ত করে আসবাবপত্র, ঢেউটিন ও অন্যান্য জিনিস তৈরি করছে। জুট ফাইবারের সঙ্গে কটন ব্লেন্ডিং করে তারা হোম ফার্নিশিং ও হোম টেক্সটাইল প্রোডাক্ট তৈরি করছে। সাবেক ইন্টারন্যাশনাল জুট স্টাডি গ্রুপের একটি রিসার্চ রিপোর্টে দেখা যায়, শপিং ব্যাগ, ফুডগ্রেড ব্যাগ, কম্পোজিট, জিওটেক্সটাইল, জুট পেপারসহ টেক্সটাইল ফাইবার হিসেবে পাট ব্যবহারের বাইরে টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের আওতায় জুট ফাইবার ব্যবহারের মাধ্যমে এ সেক্টরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে পারে। বিশ্ববাজারে পরিবেশ সুরক্ষায় ন্যাচারাল প্রোডাক্টের বাজার সম্প্রসারণের যে অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেখানে আমাদের পিছিয়ে পড়া পাট শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর অপূর্ব সুযোগ হাতে এসেছে।

বিশ্ববাজারের এই বিশাল অঞ্চলে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের এক দল ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে ২-৩টি বেসরকারি জুট মিল এই সেক্টরে বেশ ভালো কাজ করছে এবং বাজার উন্নয়ন করার চেষ্টা করছে। জেডিপিসির উদ্যোগে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কয়েকশ' ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে তারা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ কিছু পণ্য বাজারজাতের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা রফতানিমুখী বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রফতানি করছে। তার মধ্যে ফ্লোর কাভারিং, হাউসহোল্ড প্রোডাক্ট, গার্ডেনিং প্রোডাক্ট, শপিং ও ফ্যাশনেবল ব্যাগ, জুট ফেল্ট, জুট জিওটেক্সটাইল, জুট পেপার, হোম ফার্নিশিং, হোম টেক্সটাইল, জুট ব্রেইডের জুতা, পাটকাঠি থেকে তৈরি চারকল, পাট থেকে চা-পাতা, হ্যান্ডমেড প্রোডাক্ট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

আমরা বর্তমানে কাঁচাপাট রফতানি করলে প্রতি টন থেকে সম্ভাব্য আয় করি ৫৫০-৬৫০ ডলার। ট্র্যাডিশনাল পাটের সুতা রফতানি করে পাই প্রতি টনে ৮০০-১২৫০ ডলার। ট্র্যাডিশনাল জুট গুডস রফতানি করে পাই প্রতি টনে ১৫০০-১৮০০ ডলার। আর আমরা যদি ভ্যালু অ্যাডেট বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রফতানি করে থাকি, তাহলে প্রতি টনে আমরা ৩০০০ থেকে ১০০০০ ডলার আয় করতে পারি। তাহলে নীতিনির্ধারণী মহলে অবশ্যই চিন্তা করতে হবে পাটশিল্পকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। আমরা যারা বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রফতানির সঙ্গে যুক্ত; বিশ্বাস করি, পাটের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নির্ভর করছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের বহুমুখীকরণের বাণিজ্যিক সফলতার ওপর। বড় পরিসরে জায়গা দখল করতে হলে প্রয়োজন নতুন নতুন বিশ্বমানের পণ্য, যা বিশ্ববাজারের চাহিদামতো।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রত্যাশিত সুপারিশ :বিশ্ববাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা নিরূপণে মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি ভিত্তিতে মার্কেট অ্যানালাইসিস করা, যাতে উদ্যোক্তারা বাজার চাহিদাকে সামনে রেখে সঠিক পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়। দেশে বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন বিশ্বমানের পণ্য বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে, যদি সহায়ক রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়; সেখানে এক দল বিজ্ঞানী পাটভিত্তিক নতুন নতুন বাণিজ্যিক পণ্য উদ্ভাবনে কাজ করবেন। মনে রাখতে হবে, অন্যদের সঙ্গে পিছিয়ে পড়া এই শিল্প ইনোভেশন, ক্রিয়েটিভিটি, যুগোপযোগী নতুন নতুন পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতাই আমাদের উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করবে।

বিশ্বমানের প্রোডাক্ট ডেভেলপ করার সহায়ক ডিজাইন ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বহুমুখী পাটশিল্প স্থাপনে সরকার কর্তৃক বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা অতিদ্রুত ঘোষণা করতে হবে, যাতে সব ধরনের উদ্যোক্তা এ শিল্পে এগিয়ে আসতে আগ্রহী হন। গত প্রায় দুই যুগ ধরে এ শিল্পসংশ্নিষ্ট মানবসম্পদ ও দক্ষ জনবল উন্নয়নে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। তাই গুরুত্বের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ ও দক্ষ জনবল উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বহুমাত্রিক বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে প্রয়োজন বৈচিত্র্যময় ফেব্রিক, যেখানে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি জুট মিলগুলো একত্রে মিলে মাত্র ৬-৭ রকম ফেব্রিক উৎপাদন করছে। সেখানে ভারত ইতিমধ্যে ১০৬ রকম ফেব্রিক তৈরি করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত উন্নতমানের ফেব্রিকের দাম ভারত থেকে অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি। এ ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অতিদ্রুত আধুনিক টেক্সটাইল প্রযুক্তির বেশ কয়েকটি স্পেশালাইজড জুট মিল স্থাপন, যেখানে গ্যাসলাইন সুবিধাসহ উন্নতমানের ডাইং ও লেমিনেশন সুবিধা থাকবে, যা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের উন্নত ও চাহিদামাফিক ফেব্রিক সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং কাঁচামাল উৎপাদন খরচ কমাবে; পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বাজার প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াবে।

স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। বহুমুখী পাটপণ্যের প্রচার, ব্যবহার বৃদ্ধি ও সচেতনতা সৃষ্টিতে অধিক মনোযোগী হতে হবে। প্রয়োজনে আইন করা জরুরি, বিশেষ করে সরকারের প্রকিউরমেন্ট পলিসিতে বহুমুখী পাটপণ্য ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সরকারকে বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ, এ খাতের জন্য রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোকে আরও মনোযোগী হওয়া, জুট প্রডাক্ট আমদানিকারক যে যে দেশে ইমপোর্ট ট্যাক্স বেশি তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা এবং বিশ্ববাজারের সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং মজবুত করা। ঝঁংঃধরহধনষব ইঁংরহবংং চষধঃভড়ৎস এখন বিশ্ববাজারে এক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তাই এ ক্ষেত্রে এ শিল্পের সব কারখানাকে এখনই কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটধারী হওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মাথায় রাখতে হবে, বর্তমানে সব ধরনের বায়ার, গার্মেন্টসের বাইরে অন্যান্য প্রোডাক্টের ক্ষেত্রেও কমপ্লায়েন্স সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরি ছাড়া কোনো মাল আমদানি করতে চাচ্ছে না। বিশেষ করে বড় কোম্পানিগুলো একেবারেই করবে না। বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে প্রয়োজন উন্নতমানের পাট। তাই অধিক ফলনশীল ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন পাট চাষ ও পাটচাষিকে সুরক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেড