নিউজিল্যান্ড থেকে অন্যরকম বার্তা

সন্ত্রাস

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০১৯      

ফরিদুল আলম

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন এই হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা এবং দেশের জন্য অন্যতম অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় বলে উল্লেখ করেছেন। হামলাকারীকে গ্রেফতারের পাশাপাশি আরও তিন সন্দেহভাজনকে পুলিশ আটক করেছে। প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এই হামলায় একজন অস্ট্রেলীয় জড়িত বলে স্বীকার করে বলেছেন, 'অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড কেবল প্রতিবেশই নয়, একটি পরিবারের মতো।'

নিউজিল্যান্ড সময় ১টা ৪০ মিনিটে ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি পার্কের পাশে আল নূর মসজিদ এবং লিনউডের অপর একটি মসজিদে প্রায় একই সময় হামলা চালানো হয়। শুক্রবারের জুমার নামাজ বিধায় সে সময় সেখানে কমপক্ষে তিন শতাধিক মুসলিম উপস্থিত ছিলেন। নিউজিল্যান্ডের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি রয়েছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ চিকিৎসাধীন অন্তত ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস না থাকায় অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশন এই বিষয়ে সার্বিক খোঁজখবর রাখছে। তাদের বরাতে জানা গেছে, আরও দু'জন বাংলাদেশি এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন এবং আহত দু'জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তাদের সিরিজের তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ খেলার জন্য বর্তমানে ক্রাইস্টচার্চে অবস্থান করছে। ১৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়ার কথা টেস্টটি এবং দলের সদস্যরা সে সময় মসজিদে জুমার নামাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। দলের অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ সংবাদ সম্মেলন করছিলেন এবং সেটা শেষ হতে একটু দেরি হওয়ায় তাদের মসজিদে পৌঁছতে কিছুটা দেরি হওয়ার কারণে বলা চলে, পরম ভাগ্যগুণে তারা এই ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে গেছেন। আর মাত্র কয়েক মিনিট আগেও যদি তারা মসজিদে গিয়ে পৌঁছতেন, তাহলে হয়তো বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য শোকাবহ কোনো ঘটনা ঘটে যেতে পারত। তা সত্ত্বেও আমাদের ক্রিকেটাররা সেখানে পৌঁছামাত্রই দেখতে পান রক্তাক্ত অবস্থায় অনেককে পড়ে থাকতে এবং অনেককে রক্তমাখা অবস্থায় বেরিয়ে আসতে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমাদের ক্রিকেট দলের সদস্যরা প্রথমে বাসে উঠে শুয়ে পড়েন। অতঃপর আতঙ্কে হ্যাগলে পার্ক দৌড়ে অতিক্রম করে স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে রক্ষা পান। এখানে বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কোনো নিরাপত্তা সদস্য তো দূরের কথা, নিউজিল্যান্ড বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো লিয়াজোঁ কর্মকর্তা পর্যন্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এ অবস্থায় সিরিজের সর্বশেষ টেস্ট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ দলের সদস্যরা খুব সহসা দেশে ফিরে আসবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান বলেছেন, ভবিষ্যতে স্ট্যান্ডার্ড নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে দেশের ক্রিকেট টিমকে আর বিদেশ সফরে পাঠানো হবে না।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের হামলার সঙ্গে জড়িত একমাত্র ব্যক্তির পরিচয় জানা গেছে। ২৮ বছর বয়সী ব্রেন্টন টারেন্ট নামক এই হামলাকারী নিজেকে একজন শ্বেতাঙ্গ এবং কর্মজীবী পরিবারের সন্তান দাবি করে তার মতো মানুষদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বার্থে এই হামলা চালিয়েছে বলে অনলাইনে পোস্ট করা ৭৩ পৃষ্ঠাব্যাপী এক ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করেছে। সে নিজেকে একজন অস্ট্রেলিয়ান বলে দাবি করেছে। শুধু তাই নয়, ১৬ মিনিটের হামলার সেই ভয়াবহ দৃশ্যও সে ভিডিওতে ধারণ করে খানিক বাদে অনলাইনে পোস্ট করে। তার এই ভিডিও ধারণ শুরু হয় গাড়িতে উঠে মসজিদের দিকে যাওয়ার সময় থেকে, যা সে 'পার্টি শুরু' বলে উল্লেখ করে। এই হামলার ধরন দেখে এটা খুব সহজে অনুমান করা যায় যে, হামলাকারী সহসা এমন হামলার সিদ্ধান্ত নেয়নি, বরং অনেক আগে থেকেই এই হামলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে। নিউজিল্যান্ডের পুলিশের বরাতে জানা গেছে, হামলাকারীর গাড়িতে দুটি আইইউডি পাওয়া গেছে, যা পরবর্তীকালে নিক্রিয় করা হয়েছে। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট জানিয়েছে, হামলাকারী তাদের তালিকাভুক্ত এবং সে ইউরোপে ব্যাপক মাইগ্রেশনের হার কমিয়ে আনতে আন্দোলন করে যাচ্ছিল। টারেন্টের টুইটার অ্যাকাউন্টে ২০১৬ সালে প্যারিসের নিস শহরে বাস্তিল দিবসে হামলায় একজন ভুক্তভোগীর ছবি সন্নিবেশিত রয়েছে। ওই হামলায় সে সময় ৮৪ জন নিহত হয়েছিল, যার জন্য মুসলিম জঙ্গিদের দায়ী করা হয়। সেখানে আরও উল্লেখ রয়েছে, সে এই হামলা পরিচালনার জন্য গত দুই বছর ধরে নিজেকে প্রস্তুত করছিল এবং ক্রাইস্টচার্চে হামলার বিষয়ে সে তিন মাস আগে মনস্থির করে। তার টুইটার থেকে আরও জানা যায়, সে একজন উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক এবং বাস্তিল হামলায় ৮৪ জন নিহত হওয়ার পর থেকে সে তার নিজ দেশে অপর দেশ থেকে বসবাসকারী অধিবাসীদের বিষয়ে প্রতিবাদপ্রবণ ছিল। তার বক্তব্য ছিল এ রকম, 'আমাদের মাতৃভূমি কখনও তাদের নয়, যে পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গরা থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের ভূমি তাদেরই থাকবে। অন্যরা কখনও আমাদের ভূমি দখল করতে পারবে না।'

শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডের এই মর্মান্তিক ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই হামলা করেছে ঘৃণাবাদি ভাবাদর্শধারীরা। এই হামলার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে তা হচ্ছে টারেন্টের নিজের টুইটারের বক্তব্যই। তার মতে, 'নিউজিল্যান্ড হামলার জন্য তার আসলে পছন্দ ছিল না; কিন্তু এই হামলার মধ্য দিয়ে সবাইকে এই মর্মে সচেতন করা যে, আমাদের সভ্যতা হুমকির মুখে, কোথাও আমরা নিরাপদ নই এবং আক্রমণকারীরা সুযোগ পেলেই আমাদের সভ্যতার ওপর আঘাত হানতে চেষ্টা করছে।' সে নিজেকে লাখ লাখ ইউরোপিয়ান এবং শ্বেতাঙ্গ জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি দাবি করে বলে, 'আমাদের অবশ্যই নিজেদের অস্তিত্ব এবং শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে।' এই ঘটনার সঙ্গে অনেকটা গত ২০১১ সালে নরওয়েতে একজন বন্দুকধারীর গুলির সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। সে সময় ব্রেইভিক নামক প্রায় একই বয়সী এক ব্যক্তি দুই স্থানে গিয়ে এ হামলা চালায় এবং তার এলোপাতাড়ি গুলিতে প্রাণ হারায় প্রায় ২শ' মানুষ।

তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালে জানা যায়, অনেকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছিল সেই ব্যক্তি। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিরিখে এ কথা খুব একটা যুক্তিযুক্ত মনে হবে না যে, সেখানে অস্ট্রেলীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জিইয়ে রাখা বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই হামলা হতে পারে। তবে ক্রাইস্টচার্চে হামলা এবং এই হামলার পরদিন সেখানে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ক্রিকেটকে ঘিরে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট ভেন্যু ভবিষ্যতে কমবেশি বিতর্কিত হতে পারে। এর আগে আমাদের মনে আছে, ২০০৯ সালে শ্রীলংকা দলের পাকিস্তান সফরের সময় একইভাবে সন্ত্রাসী হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পায় শ্রীলংকার ক্রিকেট দলের সদস্যরা। এই ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ রয়েছে এবং পাকিস্তান সরকারের অনেক অনুরোধেও কোনো দল সেখানে খেলতে যেতে সম্মতি জানায়নি।

ক্রাইস্টচার্চে যে হামলাটি সংঘটিত হয়ে গেল, তা নিউজিল্যান্ডের জাতীয় গৌরবের জন্য যতটুকু না কলঙ্কজনক, তার চেয়ে বেশি ভোগাবে দেশটির ক্রিকেটকে। যে কারণে পাকিস্তান কার্যত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভেন্যু হিসেবে নিষিদ্ধ হয়ে রয়েছে গত ১০ বছর ধরে। সেই একই কারণে নিউজিল্যান্ডেও যদি ভবিষ্যতে নিরাপত্তার শঙ্কায় অপর কোনো দল যেতে সম্মত না হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]