শিল্প-বাণিজ্য বিকাশে পথিকৃৎ

স্মরণ

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০১৯      

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

পথিকৃৎ হিসেবে দেশের শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন আবুল কাশেম খান (১৯০৫-১৯৯১), যিনি এ.কে. খান নামে ছিলেন খ্যাত। ব্রিটিশ আমলে পূর্ববঙ্গ ছিল শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তখনকার সমুদয় শিল্প-কারখানাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতাকে কেন্দ্র করে। ১৮২৯ সালে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কর্তৃক ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ১৮৩০ সালে কলকাতা ডকিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, ১৮৫৪ সালে হুগলিতে বাষ্পীয় ইঞ্জিনে প্রথম পাটকল ও ১৮৬৭ সালে শিবপুর আয়রন ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠা, ১৮৯৩ সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কর্তৃক বেঙ্গল কেমিক্যাল, ১৯০৬ সালে বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল, কলকাতা পটারি ওয়ার্কস, ন্যাশনাল সোপ ফ্যাক্টরি, ১৯০৭ সালে নড়াইল ম্যাচ ফ্যাক্টরি, রংপুর টোবাকো, মনোরমা ক্যান্ডল ফ্যাক্টরি এবং বেঙ্গল বাটন ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়ায় মোহিনী মিল, বেঙ্গল হোসিয়ারি কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান আমলেও (১৯৪৭-১৯৭০) শিল্প-কারখানা পশ্চিম পাকিস্তানি অবাঙালিদেরই অধিগত হতে থাকে। এ অবস্থায় এ.কে. খানই প্রথম বাংলাদেশি মুসলমান, যিনি এতদঞ্চলে শিল্প-বাণিজ্যের প্রসারে এগিয়ে আসেন। বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে বিচার বিভাগের অতি  সম্মানীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এ.কে. খান কোম্পানি লিমিটেড। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সময়ে টেক্সটাইল, শিপিং, পাট, ইলেকট্রনিক মটরস, ম্যাচ ও পলিউড, প্রথম বাঙালি মালিকানাধীন ব্যাংকসহ বহুসংখ্যক শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করে জাতীয় শিল্পায়নের ক্ষেত্রে তিনি রাখেন অনন্য অবদান।

দেশের শিল্পায়নে তিনি যে পথ প্রদর্শন করে গেছেন, সেই পথে বাংলাদেশের অসংখ্য উদ্যোক্তা শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে। তার প্রতিষ্ঠিত কল-কারখানায় হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানের পথ সুগম হয়েছে, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হয়েছে এবং ভাবীকালে তারা নিজেরাও শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

মুসলমানদের জন্য স্বাধীন আবাসভূমির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অবতীর্ণ হন আবুল কাশেম খান। ১৯৪৫ সালে তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করেন। তৎকালে চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের কার্যকরী কমিটির সদস্য জনাব খান পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ প্রার্থী হিসেবে ভারতীয় আইনসভার সদস্য এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আইনসভার সদস্য হন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন এবং শিল্প, পূর্ত, সেচ, বিদ্যুৎ ও খনিজ বিভাগের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের উপেক্ষা ও পক্ষপাতিত্বের প্রতিবাদে ১৯৬২ সালে পদত্যাগ করেন। আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভার অন্যতম বাঙালি সদস্য কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী বিচারপতি মুহাম্মদ ইবরাহিম তার ডায়েরিতে লিখেছেন, ১৯৬২ সালের সংবিধান রচনা ও মূল্যায়ন এবং দেশের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের প্রয়াসে রাখেন বিশেষ অবদান। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধীদলীয় সদস্য ছিলেন।

বিদ্যুৎমন্ত্রী হিসেবে এ.কে. খানের সময়ে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়। শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বস্ত্র ও পাট শিল্পের দ্রুত প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম ইস্পাত কারখানা, কর্ণফুলী রেয়ন মিল স্থাপন এবং পশ্চিম পাকিস্তানেও অনুরূপ শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দেশের প্রতি জেলায় শিল্প এলাকা প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় পুঁজি ও শ্রমিক আকর্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং ছোট ও মাঝারি শিল্প স্থাপনে বিশেষ গুরুত্ব ছিল তার। তৎকালীন সরকারের বৈষম্য নীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সদা সোচ্চার। করাচির পর রাওয়ালপিন্ডিতে নিখিল পাকিস্তানের রাজধানী স্থানান্তরিত হলে ঢাকায় পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপনের প্রস্তাব দেন এ.কে. খান। এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় শেরেবাংলানগর স্থাপিত হয়। এ.কে. খান মন্ত্রী থাকাকালে পূর্ব পাকিস্তান শিল্প গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা, বন শিল্প করপোরেশন ও পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক স্থাপিত হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে এ.কে. খান সমর্থন দান করেন। তার শিল্প-কারখানায় শ্রমিক-মালিক  সুসম্পর্ক আদর্শস্থানীয়। শ্রমিক অসন্তোষ দূরীকরণে শিল্পে শ্রমিকদের শেয়ার প্রদানের পক্ষপাতী তিনি। বিশেষত তিনি শিল্পোদ্যোক্তা, শ্রমিক ও অর্থ জোগানদার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ত্রিমুখী অংশীদারিত্বের কথা বিবেচনা করতেন। বাঙালি মালিকানাধীন প্রথম ব্যাংক ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক (বর্তমান পূবালী ব্যাংক) প্রতিষ্ঠা হয়।

বাংলাদেশের মতো এমন সুফলা জমি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এ দেশের মানুষের চরিত্রের প্রধান দিক হলো জমির প্রতি মমত্ব। তার এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হবে। মানুষের গ্রাম ছেড়ে শহরের পথ ধরার প্রবণতা; এ.কে. খান এ প্রবণতাকে অত্যন্ত ভয়াবহ মনে করেন। এর ফলে বহু নতুন সমস্যা, নতুন সংকটের সৃষ্টি হবে। প্রাচ্যের জীবন-দর্শনের প্রতি এটি একটি মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। এ সবকিছুর উত্তর হলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট। প্রত্যেক জেলা ও মহকুমায় এ রূপ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট স্থাপনই আবুল কাসেমের লক্ষ্য ছিল। তিনি বলতেন, কয়েকজন বৃহৎ পুঁজিপতি শিল্পকে কেন্দ্রীভূত করলে সমস্যার সমাধান হবে না। শিল্পকে প্রসারিত করে সাধারণ মানুষকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তিনি মনে করতেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে বহু ক্ষুুদ্র ও কুটির শিল্পের সমাবেশ করা যাবে। এখানে শিল্পের মালিকদের জমি, বাড়িঘর, কারখানা, বিদ্যুৎ, ব্যাংক, কাঁচামালের সরবরাহ, উৎপন্ন মালের বিক্রয় ব্যবস্থা, সবকিছুর সুবিধা দেওয়া হবে। বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, স্কুুল; সব মিলিয়ে এস্টেটগুলো হবে স্ব্বয়ংসম্পূর্ণ এলাকা। তিনি বলতেন. সাধারণ মানুষের উপকার করতে পারব- এ আশাতেই আমি মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছিলাম।

বৈদেশিক বাণিজ্যে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ ছিল ৫৯ শতাংশ। কিন্তু ওই আয় থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় করা হতো ৩০ শতাংশ। পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১৭ শতাংশ আর পশ্চিম পাকিস্তানে তার পরিমাণ ছিল ৮৩ শতাংশ। এই ক্রান্তিলগ্নে এ.কে. খানের কার্যকালে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এ পরিকল্পনায় শিল্প খাতে বহুলাংশে তার ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়। তার পরও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এ.কে. খানকে ভীষণ ব্যথিত করে। ১৯৬০ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এ.কে. খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। তিনি এক সভায় বলেন, পূর্ব পাকিস্তান শিল্পে অনুন্নত। এখানে বিনিয়োগ সুবিধা প্রচুর এবং মূলধনের বিশেষ প্রয়োজন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন জেনারেল আযম খান। আজ ৩১ মার্চ এ.কে. খানের মৃত্যু দিবস। তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের
সাবেক চেয়ারম্যান