ফারাক্কা লংমার্চ ও আজকের বাস্তবতা

দিবস

প্রকাশ: ১৬ মে ২০১৯      

ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল ভূভাগজুড়ে শুরু হয়েছে মরুকরণ প্রক্রিয়া। তাই ফারাক্কা বাঁধ শুধু এ দেশের মানুষের জীবন-মরণের সংকটই নয়; এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাভাবিক প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কও বিপন্ন। আজ থেকে ৪৩ বছর আগে এই পরিস্থিতি দিব্যদৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭৬ সালে অশীতিপর এ মানুষটি ভগ্ন শরীর নিয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে জাতিকে এক কাতারে সমবেত করতে ডাক দিয়েছিলেন। তার সে ডাকে লাখ লাখ মানুষ সাড়া দিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে তিনি এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন- আন্তর্জাতিক যাবতীয় আইন-কনভেনশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই বাঁধের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের অধিকারকে অস্বীকার করেছে।

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন ক্রমশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। জোয়ারের সময় সমুদ্রের লোনা পানি দেশের অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ করলে নদীর পানি ঠেলে সেই লোনা পানিকে সমুদ্রে ফেরত পাঠায়। কিন্তু ফারাক্কার কারণে নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত পদ্মা অববাহিকায়। এই লবণাক্ততার ফলে এ দেশের বিরাট অংশের ক্ষেত-ক্ষামার, শিল্প-কারখানা আজ মারাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। মৎস্য ও পশুসম্পদ বিলুপ্ত হওয়ার পথে। পদ্মার ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন পেশার লাখ লাখ মানুষ আজ জীবিকাহারা। ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই শুধু নয়; বাংলাদেশের ওপর আর্থ-সামাজিক একটি বড় বিপর্যয় ধেয়ে আসছে। সরকারি হিসাবমতে (১৯৯৭), ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুধু বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি হচ্ছে প্রতি বছর গড়ে এক হাজার কোটি টাকা। নৌপরিবহনের ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নৌবন্দরগুলোতে কর্মরত হাজার হাজার মানুষ পথে বসার উপক্রম। এ দেশের পাতাল পানিতে আর্সেনিক বিষের ঘনত্ব আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ফারাক্কা। দেশে খাদ্যে যে স্বয়ংসম্পূূর্ণতা অর্জিত হয়েছে, তা আজ হুমকির সম্মুখীন। ভারতের পানি আগ্রাসনের ফলে বাংলাদেশের প্রায় ২০০০ মাইল নৌপথ আজ এক-চতুর্থাংশ কমে প্রায় ৫০০ মাইলে সংকুচিত হয়েছে।

৪৩ বছরে ফারাক্কা সমস্যার মতো জাতীয় সংকটও যখন আমাদের জাগাতে পারেনি, তখন আরও বড় বিপর্যয় আসবে- এটাই তো স্বাভাবিক। এখন ভারত আন্তঃবেসিন নদী সংযোগ মহাপ্রকল্প নিয়ে মাঠে নেমেছে। এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদী-উপনদীর পানিই একতরফা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করেছে। ইতিমধ্যে বরাক নদীর উজানে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ভারতীয় পরিকল্পনাটি এখন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ মহা সংকটকালে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। এ ক্রান্তিকালে মওলানা ভাসানীর মতো একজন নেতার বড় প্রয়োজন ছিল।

নেতিবাচক রাজনীতি আমাদের জনগণের মন থেকে স্বাভাবিক অধিকারবোধটুকু যেন কেড়ে নিয়েছে। যার ফলে লড়াকু এ জাতি মুক্তিযুদ্ধের মতো আরেকটি লড়াই করে পানির ওপর তাদের ন্যায্য হিস্যার দাবি প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তাও যেন করতে অপারগ। মওলানা ভাসানীর সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করছি :'জনগণের সংগ্রাম পারমাণবিক মারণাস্ত্রের চাইতে শক্তিশালী।' আজ সময় এসেছে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশিদের এক কাতারে দাঁড়িয়ে দেশের স্বার্থের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হওয়ার। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এই ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত গঠনের লক্ষ্যে বিশাল লংমার্চের আয়োজন করেছিলেন ১৬ মে ১৯৭৬ সালে। ফারাক্কা দিবস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গণমানুষকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সোচ্চার হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে- ফারাক্কা দিবসের ৪৩তম বার্ষিকীতে এটাই গভীর প্রত্যাশা।

অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
masud197802@yahoo.com