কে নেভাবে কৃষকের বুকের আগুন?

বলা না-বলা

প্রকাশ: ২৩ মে ২০১৯      

আবু সাঈদ খান

কৃষিমন্ত্রীর এলাকা টাঙ্গাইলের কালিহাতীর একজন কৃষক ক্ষোভে, কষ্টে ক্ষেতের ফসলে আগুন লাগিয়েছিলেন। প্রতিবেশীরা এসে সে আগুন নিভিয়েছেন। কিন্তু লাখ লাখ কৃষকের বুকে যে আগুন জ্বলছে, তা কে নেভাবে?

কৃষকের ক্ষেতের আগুন, বুকের আগুনের কারণ কারও অজানা নয়। এক মণ ধান ফলাতে এবার ৯০০ থেকে ৯৬০ টাকা ব্যয় হয়েছে। সেখানে বাজারমূল্য প্রতি মণ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। বাধ্য হয়ে কৃষককে লোকসানে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। বিশ্বয়কর ব্যাপার, ধান-চালের দাম যখন নিম্নগামী, তখন বাইরে থেকে চাল আমদানিও করা হচ্ছে। তা করা হচ্ছে নাকি পাঁচতারা হোটেল ও ধনীদের জন্য। তাই যদি হয়, তবে তা কেন স্বল্প বা নামমাত্র শুল্ক্ক সুবিধার আওতায় আমদানি করা হবে?

সরকারের প্রতিমণ ধানের সংগ্রহমূল্য ১০৪০ টাকা, প্রতি কেজি চালের সংগ্রহমূল্য ৩৬ টাকা। এ দামে ফসল বেচতে পারলে কৃষকের কোনো দুঃখ থাকত না। সমস্যা হলো, সরকার মাত্র ১৩ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের সংগ্রহ অভিযানে কৃষকের ফসল দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এখন সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করি করি করেও করছে না। যখন ফসল কৃষকের হাত থেকে আড়তদার, মহাজন, মিল বা চাতাল মালিকের কাছে চলে যাবে, তখন সরকারের সংগ্রহ অভিযান শুরু হবে।

কেন মৌসুমের শুরুতে ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয় না- তা নিয়ে বাহানার শেষ নেই। কর্মকর্তারা যা বলেন বা বলছেন তা হলো- বরাদ্দের টাকা পেতে দেরি হয়েছে বা হচ্ছে, গুদাম এখনও খালি হয়নি, গুদামের সংস্কার চলছে, কৃষকের ধান ভেজা, গুদামজাত করলে পচে যাবে ইত্যাদি। এ যেন বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানো! সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব যথাসময়ে টাকার বরাদ্দ নিশ্চিত করা। টাকা তো এখন গরুর গাড়ি বা মালগাড়িতে আসে না। যেখানে গ্রাম পর্যায়ে অনলাইন ব্যাংকিং চালু রয়েছে, সেখানে এমন যুক্তি ধোপে টেকে না। আর গুদাম কেন সময়মতো খালি বা সংস্কার হয় না, এর দায় কি কৃষকের, না আপনাদের; যারা কৃষকের টাকায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। বলা বাহুল্য, ধান যদি চাতাল মালিকরা শুকিয়ে দিতে পারেন, কৃষকরা ওই কাজটি আরও ভালো পারেন।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, এখন দেশের ধান-চালের গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা ১৮ লাখ টন। গুদামে এখন মজুদ রয়েছে ১১ লাখ টন। তাই বাজার থেকে সর্বোচ্চ সাত লাখ টন ধান-চাল কেনা যেতে পারে। ঘোষিত সংগ্রহ অভিযানের চেয়ে এর পরিমাণ আরও ছয় লাখ টন কম। অথচ এবার ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন ধান উদ্বৃত্ত। এ ধান নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো ভাবনা নেই। এ যেন কৃষকের পাপ!

প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ধান উৎপাদন আমাদের চেয়ে কম। অথচ রাজ্যটির ২০১৮-১৯ বাণিজ্য বর্ষের ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৫২ লাখ টন। তারা কেবল ধান-চাল-গম সংগ্রহ করে না। গম, আলুসহ অন্যান্য ফসলও কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশ কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি খাদ্যপণ্য খরিদ করছে। ওসব দেশ পারলে আমাদের বাধা কোথায়! এর জন্য দরকার শুধু একটি সরকারি হুকুম। এতে থাকবে যে, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ফসল কিনতে হবে। আর সঙ্গত কারণেই গুদামের সংখ্যা বাড়াতে হবে। যখন বাংলাদেশ ঘাটতির দেশ ছিল, তখন গুদামের ধারণক্ষমতা যা ছিল, তা দিয়ে আজকের প্রয়োজন মিটবে না। কর্তৃপক্ষকে উৎপাদন-উদ্বৃত্ত দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা শিখতে হবে। কত বেশি ফসল ফলবে, তার ব্যবস্থাপনা আগেভাগেই করতে হবে। আমি বুঝতে পারি না, যে দেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করতে পারে, আরও মেগা প্রজেক্ট নিতে পারে, সে দেশ প্রয়োজনীয় গুদাম নির্মাণ বা কৃষকের ফসল কেনার জন্য বরাদ্দ বাড়াতে পারবে না কেন? আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। সদিচ্ছা থাকলে গুদাম কোনো সমস্যা নয়। গুদাম ভাড়াও করা যায়। এমনকি সরকারের ক্রয় করা ফসল কৃষকের বাড়িতে রাখা যেতে পারে। যে ঘরগুলো একাত্তরে ছিল মুক্তিযুদ্ধের দুর্গ, সে গৃহে ফসল আমানত রাখায় কোনো ঝুঁকি আছে বলে মনে হয় না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই কৃষকই দেশকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা আছে, সহায়তা আছে। তবে মূল কৃতিত্ব কৃষকেরই। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা বলা যায়। এক ভয়াবহ খাদ্য রাজনীতির শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ। সেদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাংলাদেশের কাছে খাদ্য বিক্রি করেনি। ফলে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। এর শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ। শিশুসহ অনেক নর-নারী অনাহারে, অর্ধাহারে, রোগ-ব্যাধিতে মারা যায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়েছে কৃষক। আশির দশকে কৃষকের সন্তানরা জমি-জিরাত বেচে মধ্যপ্রাচ্যে যায়। তাদের পাঠানো টাকায় কৃষির আধুনিকীকরণ হয়। শ্যালো মেশিন, পাওয়ার পাম্প, পাওয়ার টিলার ইত্যাদি কেনা হয়। কৃষিঋণ নিয়েও এসব কেনা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো অর্থই কৃষি উন্নয়নের মূল শক্তি। সে যাই হোক, আশির দশক থেকে শুরু হয় বাম্পার ফসল। তারপর বছরের পর বছর কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সোনালি ফসল ফলিয়ে চলেছে। এ স্বীকৃতির জন্য যখন কৃষকের ফুলেল শুভেচ্ছায় অভিষিক্ত হওয়ার কথা, তখন তারা আহাজারি করছেন। আমার বিবেচনায় এ সাফল্যে কৃষকের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষিত হতে পারত, পালিত হতে পারত 'কৃষক বর্ষ'।

আমরা জানি, কৃষকবান্ধব উদ্যোগে বাধা আছে। মধ্যস্বত্বভোগী অর্থাৎ আড়তদার-মহাজন-ফড়িয়া-মিল মালিকদের হাত শক্তিশালী। অনেক বড় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা এ ব্যবসা করছেন। আর মধ্যস্বত্বভোগীদের লভ্যাংশের বখরা একশ্রেণির বিপথগামী আমলা, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতাদেরও পকেটে যাচ্ছে। এই অশুভ আঁতাতই কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল না কেনার ক্ষেত্রে বাধা। কৃষক তথা দেশের সামগ্রিক স্বার্থেই এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। কৃষককে ফসলের ন্যায্য দাম দিতে হবে। কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে তারা ধান ফলাবেন না। আর তখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার গৌরব ধরে রাখা যাবে না। সেটি হবে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।

এ প্রসঙ্গে একটি যুক্তি শুনেছি। বলা হচ্ছে, চালের দাম অতিরিক্ত বাড়লে খাদ্যদ্রব্য সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। কথাটি সত্য। তাই বলে কি কৃষককে ন্যায্য দাম দেওয়া হবে না? আসলে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের (সংবিধানে বর্ণিত সমাজতন্ত্রের কথা বলছি না) কাজ কী হবে? কৃষককে ন্যায্য দাম দিতে হবে। গ্রাম ও শহরের গরিব মানুষ, শ্রমিক, বস্তিবাসী, তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ নিম্ন আয়ের মানুষকে কম দামে চাল সরবরাহ করতে হবে- এর কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য দরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা। রেশনিং ব্যবস্থা কমাতে কমাতে সৈনিক ও পুলিশ ছাড়া আর কোনো পেশার মানুষ রেশন পাচ্ছে না। অথচ ভারতে এখনও রেশনিং ব্যবস্থা ব্যাপকভাবেই চালু রয়েছে। আমরা চাই, যুক্তিসঙ্গতভাবে সব মানুষেরই সাধ্যের মধ্যে চাল পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এটি দয়াদাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার।

পরিশেষে বলতে চাই- কৃষক না বাঁচলে কৃষি বাঁচবে না, কৃষি না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না। খাদ্যশস্যের জন্য আবার বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

পুনশ্চ : যখন লেখাটি শেষ করেছি, তখন অনলাইনে দেখলাম, চাল আমদানিতে মোট করভার ৫৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ পদক্ষেপ সাধুবাদযোগ্য।

সাংবাদিক ও লেখক
[email protected]