সুনসান নীরবতা

রাজনীতি

প্রকাশ: ১১ জুন ২০১৯      

আহমদ রফিক

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতির মন্দাবস্থা নিয়ে একটি নিবন্ধ পড়ে ভালো লাগল। নিবন্ধকারের বক্তব্য আমাদেরও চিন্তাভাবনার চৌহদ্দির অন্তর্গত বলেই মনে হলো। সত্যি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির সরোবর যেন স্তব্ধ, শীতল, ঢেউহীন, আলোড়নহীন। গত ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের অভাবিত ফলাফল ঘোষণার পর থেকে এ অভাবিত স্তব্ধতা। এ নিয়ে লেখকের আক্ষেপ।

এর অর্থ- রাজনীতি আছে, অথচ আন্দোলন নেই, আলোড়ন নেই- এ কেমন কথা? আমাদের প্রশ্ন :তাতে অসুবিধা কোথায়? রাজনৈতিক অঙ্গন শান্ত, স্থির থাকুক, এটাই তো দেখি সবার কাম্য। বৃথা হৈ-হুল্লোড়ের কী দরকার? তাতে তো সামাজিক শান্তি নষ্ট হয়, উন্নয়ন ব্যাহত হয়, দেশের অগ্রগতিতে ছেদ পড়ে।

তাতে তর্কবাগীশ মাত্রেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, একনায়কী বা সমরতন্ত্রী শাসনের স্তব্ধতার বিরুদ্ধে তাহলে প্রতিবাদ তোলা হয় কেন? জবাব :সংসদীয় গণতন্ত্রী শাসন আর একনায়কী শাসন তো এক কথা নয়। সে কথা ঠিক। তবু প্রশ্ন থাকে, সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল কথা তো শক্তিশালী বিরোধী দল এবং শাসনযন্ত্রের পক্ষে জনসাধারণ্যে জবাবদিহি। তা না হলে কিসের গণতন্ত্র?

এ দুটি সুশাসনের পূর্বশর্ত। সংসদে যদি প্রতিবাদই উচ্চারিত না হলো, ক্ষমতাসীনদের একচেটিয়া তৎপরতার মূল্যায়ন ও ব্যবচ্ছেদ তথা পোস্টমর্টেমই না করা গেল, তাহলে তারা যে সঠিক পথে চলছে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? এসব দিক বিচারে বাস্তব সত্য হলো, বাংলাদেশে সংসদ ঠিকই শক্তিশালী বিরোধী দলহীন একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে। সবই নির্ভর করছে তাদের সদিচ্ছার ওপর।

পাঁচ-সাতজন দুর্বল সাংসদ যারা উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে নন, তাদের আর যাই হোক শক্তিশালী বিরোধী দল বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে পেছনে ফিরে তাকাতে হয় ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের দিকে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিবিসি এবং দু-একটি ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা। সে ঢেউ অচিরেই মিলিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির উচ্চমহল বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি, নিঃশব্দে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো ধামাচাপা দিয়েছে।

দুই

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুনসান নীরবতা কারও মনে বিস্ময়, কারও মনে প্রশ্নের উদ্ভব ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে যারা গণতন্ত্র নিয়ে ভাবেন, সত্যি কি গণতন্ত্র নিয়ে ভাবনার কোনো কারণ আছে? থাকলে আন্তর্জাতিক মহল চুপ করে থাকবে কেন? তারা তো সর্বদাই 'গণতন্ত্র গণতন্ত্র' করে উচ্চকিত হয়ে থাকে।

তা যখন তারা করছে না তাহলে বুঝতে হবে, হয় বাংলাদেশে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, অন্যথায় বাংলাদেশের বিদেশনীতি সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা সব প্রশ্নের কুশলী মীমাংসায় সক্ষম। তবে ওই যে শক্তিশালী বিরোধী দল ও জবাবদিহি- এ দুটি বিষয় নিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু বস্তুত বিরোধী দল যদি নিজ শক্তিতে না দাঁড়ায়, সংঘবদ্ধ না হয়, তাহলে কার কী করার আছে বা করার থাকে?

কেউ কেউ মনে করেন, বিরোধী দলের বর্তমান ছন্নছাড়া অবস্থার কৃতিত্ব আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের; সে অর্জন নীতিসম্মত পথে হোক বা না হোক। রাজনীতিতে কৌশলটাই বড় কথা। তার প্রয়োগ পদ্ধতি বড় বিচার্য বিষয় নয়। আবার কেউ ভাবতে পারেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিরোধীদলীয় জোটের ভেতরে অন্তর্বিরোধ, এমনকি যে অন্তর্বিরোধ গোপনে সক্রিয় বিএনপির মধ্যেও।

বিএনপি সত্যি বলতে একনায়কী ধারায় শাসিত দল। শুরুতে জিয়াউর রহমান। তার সামনে কথা বলা, ভিন্ন ধারার মতপ্রকাশের সাহস দলীয় নেতা কারোই ছিল না। আশ্চর্য, জিয়া হত্যার পর একদা গৃহকর্ত্রী খালেদা জিয়া একই ধারায় দল শাসন করেছেন। তার কথাই দলে শেষ কথা। তিনি পরিবারতন্ত্র চালুর উদ্দেশ্যে পুত্র তারেক রহমানকে দলে একের পর এক পদ ডিঙিয়ে সর্বোচ্চ দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে গেছেন। সেখানেও তার চরম স্বেচ্ছাচারিতা। তার কথাই শেষ কথা। দলে অন্য কোনো নেতা-নেত্রী আছেন, তার আচরণে তা মনে হয় না। দলে মহাসচিবের অবস্থান নামকাওয়াস্তে। সত্যি বলতে তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাই মহাসচিবের কাজ। গত নির্বাচনে বিএনপি বা জোটের বিজয়ী জনাকয় প্রার্থীর সংসদে যোগ দিতে শপথ গ্রহণ নিয়ে যে নাটক অনুষ্ঠিত হলো, তা দেখে এমনটাই মনে হয়।

মহাসচিবের হুমকি-হুঁশিয়ারি অগ্রাহ্য করে এক-আধজন বিজয়ী প্রার্থী শপথ গ্রহণ করে সংসদে যোগ দিতে উদ্যোগ নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে হঠাৎ করে তারেকের নির্দেশে সবার সংসদে যোগদান করার পর বিস্ময়কর ঘটনা হলো, মহাসচিবের হঠাৎ করে অবস্থান পরিবর্তন- চোখ-মুখ বুজে বলে ফেললেন, এটা সর্বসম্মত দলীয় সিদ্ধান্ত; ব্যক্তিবিশেষের

একার নয়।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো, ড. কামাল হোসেন এগিয়ে এসে নির্বাচনভিত্তিক ঐক্যফ্রন্ট গঠন না করলে মহাসচিব মির্জা ফখরুল এবারও নির্বাচন বয়কট করতেন বলে মনে হয়। সে ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান কি শক্তিশালী হতো? কিন্তু অনিচ্ছুক ঘোড়ায় সওয়ার হলে যা হয়- পরস্পরবিরোধী মতামত ও অবস্থান নিয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালাতে পারেনি ঐক্যফ্রন্ট-বিএনপি। ফলে নির্বাচনী বিপর্যয়। এটাও একটা কারণ।

দলে এবং জোটে এখনও সে অবস্থাই বিরাজমান। বুঝতে কষ্ট হয় না যে, দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মওদুদ-মোশাররফরা কামাল হোসেনের সঙ্গে নির্বাচনী মেলবন্ধন পছন্দ করেননি। এখনও করছেন না। তারা হয়তো ভাবছেন, ওটা ছিল নির্বাচনী ঐক্য। নির্বাচন শেষ তো, ঐক্যও শেষ। তাদের বর্তমান আচরণে সেটা প্রকট।

তাই নির্বাচনে দলের ভরাডুবি হওয়ার পরও তারা অঘটনের কার্যকারণ নিয়ে পোস্টমর্টেম করতে বসেননি। এমনকি ঐক্যফ্রন্টের ডাকা বৈঠকে যোগ দেওয়া দরকার মনে করেননি। এখনও তাদের অভিমত একই রকম। অর্থাৎ ঐক্যফ্রন্টের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ড. কামাল হোসেনকে মেনে নিতে বোধ হয় তাদের আপত্তি। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা নিজেরাও শক্তিশালী যৌথ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেননি; কি বিএনপিতে, কি ঐক্যফ্রন্টে।

আমার ধারণা, এ দুই নেতা ঐক্যফ্রন্টকে অকার্যকর করতেই ফ্রন্টের তৎপরতায় নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছেন। আর মহাসচিব নীরব, নির্বিকার। বিএনপির এই অন্তর্গত মনোভাব ড. কামাল হোসেনের মতো মেধাবী ইন্টেলেকচুয়ালের না বোঝার কথা নয়। কিন্তু তার আচরণ দেখে মনে হয়, তিনি বুঝতে পারছেন না কিংবা বুঝেও অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিন

এবার তার নিজ ঘরেই ভিন্ন মতের অনৈক্য দেখা দিতে শুরু করেছে। গত ৮ জুনের একটি দৈনিকে খবর- 'ড. কামালের বক্তব্য নিয়ে নানা জল্পনা'। ড. কামাল হোসেন নাকি 'আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আন্দোলনের ফল আনতে হবে' বলে বক্তব্য দিয়েছেন। আর তাই নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক মহলে কিছুটা নড়েচড়ে বসা, কিছু মন্তব্য এবং

মজার ঘটনা হলো ঐক্যফ্রন্টেরই দু-একজন নেতার ভিন্ন মত।

মনে হচ্ছে, কামাল হোসেন ফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনা না করেই এ ধরনের বক্তব্য বাজারে ছেড়েছেন কিছুটা তাপ ছড়াতে। কিন্তু এভাবে কি ইতিবাচক কিছু ঘটানো যায়? তার ঘনিষ্ঠজন মাহমুদুর রহমান মান্না এ সম্বন্ধে তার অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন, 'তার (ড. কামাল) মনে কী আছে, তা তিনিই জানেন।' এতেই বোঝা যায়, ফ্রন্ট নেতারা পরস্পর-বিচ্ছিন্ন।

কী নিয়ে আন্দোলন, যা সরকারকে বাধ্য করবে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে, তা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। ড. কামাল হোসেন তো বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন। এ বিষয়ে বিএনপি নীরব। তাদের সম্মিলিত শক্তি দিয়েও এ ইস্যু নিয়ে তারা মাঠ কাঁপানোর মতো আন্দোলন তৈরি করতে পারবেন বলে মনে হয় না। বিএনপি যেখানে নিজস্ব ইস্যুতেই আন্দোলন তৈরি করতে পারছে না, সেখানে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার তো অনেক দূরের কথা। এগুলো নিছক কথার কথা।

বিএনপির অভিযোগ, কামাল হোসেন কেন নির্বাচনে প্রার্থী হননি? এ বিষয়ে ড. কামালের নিজস্ব বক্তব্য যাই থাক, এ সত্যও অনস্বীকার্য যে, পরাজয়ের আশঙ্কায় তিনি প্রার্থী হননি। এ ক্ষেত্রে তার রেকর্ড এমনই বলে। এমনকি গণফোরামকেও তিনি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে পারেননি। তিনি একজন বিদ্বান, মেধাবী আইনজ্ঞ হলেও রাজনৈতিক জননেতার দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। আসলে এটা তার সাফল্যের ক্ষেত্র নয়।

ফ্রন্টের বাকি নেতারাও কি খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছেন, তাদের ছাত্র জীবনের সাফল্য পার হয়ে এসে? কিংবা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা? তারা বোধ হয় খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং কোনো সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিংবা তারেক রহমানের নির্দেশের। দলের এমন ছন্নছাড়া অবস্থায় আন্দোলনের কথা ভাবা যায় কি? বৃথাই ড. কামাল হোসেন একটি অসার বক্তব্য দিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছেন।

আওয়ামী লীগ বিষয়টা বোঝে, তাদের কুশলী শক্তি সম্বন্ধে তারা সচেতন। তাই এসব বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত কারণে তাদের কাছে অর্থহীন। নির্বাচন যেমনই হোক তারা শাসনকার্য ঠিকই চালিয়ে যাবে। রাজনীতি আপাতত ঠাণ্ডা সরোবরের স্থির জলের নিস্তরঙ্গ চরিত্র নিয়ে অবস্থান করবে, যতদিন না কোনো বিস্ম্ফোরক ইস্যু তৈরি হয় বা বিপুল সংখ্যায় ছাত্র সমাজ জনবান্ধব দাবিতে জনতাকে নিয়ে রাজপথে নেমে আসে- ততদিন আওয়ামী রাজনীতি নিরাপদ বলেই মনে হয়।

ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক, কবি, রবীন্দ্র গবেষক