শ্রমে আবদ্ধ শিশুর স্বপ্ন

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৯      

সাবিরা নুপুর

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে, যাদের বয়স ৬-১১ বছরের মধ্যে এবং তারা বিভিন্ন ঝুঁকিপুর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় শিশু শ্রমিক নিরসন নীতিমালা ২০১০ অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে কোনো শিশু কাজ করতে পারবে না।

এর বাইরে ৩২ লাখ শিশু বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে, যাদের অনেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি শেষ করতে পারেনি। এই সংখ্যাটি কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে নেওয়া হয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বিবেচনায় আনা হয়নি, যেমন- কৃষি কাজে নিয়োজিত শিশু শ্রমিক এই সংখ্যার মধ্যে নেই। এসব কর্মরত শিশু কখনও কখনও ১০-১৫ ঘণ্টা কাজ করে। কাজের বাইরে হরহামেশাই এসব কর্মরত শিশু শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, যা আমরা প্রায়শই মিডিয়াতে দেখে থাকি।

গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকের কথা নাইবা বলি। সরকার গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলে বিবেচনায় ধরে না। যদিও ২০১৫ সালে এই বিষয়ে একটি নীতিমালা অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু আইন না হওয়া পর্যন্ত নীতিমালাটির তেমন কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এই নীতিমালা অনুসারে ১২ বছরের নিচে কোনো শিশু গৃহকর্মে কাজ করতে পারবে না। পরে অবশ্য শ্রম আইন ২০১৮ তে (সংশোধিত) বয়স ১৪ করা হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় বিবেচিত হওয়া অত্যাবশ্যকীয় আর সেটি হচ্ছে, শিশুর বয়স বিভিন্ন আইনে ভিন্ন ভিন্ন বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। যেটি খুবই বিভ্রান্তিকর। যেহেতু শিশু আইন ২০১৯ অনুযায়ী সরকার শিশুর বয়স বা ১৮ অনুমোদন করেছে, সে জন্য শিশু সম্পর্কিত সব আইনে শিশুর বয়স ১৮ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এটি সে সময়ের দাবি।

আমি গত ১০-১২ বছর ধরে শিশুশ্রম নিরসন সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত থাকার কল্যাণে যা দেখেছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মা দরিদ্রতার কারণে নিজের সন্তানদের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত করেছে। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে :স্কুলের পরিবেশ দারিদ্র্য এবং শিশুবান্ধব না হওয়া; বাবা-মায়ের আদি পেশা পরিবর্তন হয়ে যাওয়া; স্থানান্তরিত হওয়া; বাবা-মায়ের ঋণের বোঝা পরিশোধ করা; শিশু শ্রমিকদের চাহিদা থাকা বা শিশুরা কম পারিশ্রমিকে অনেক সময় কাজ করতে পারে। উল্লিখিত কারণে শিশুদের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত দেখা যাচ্ছে। টেকসহ উন্নয়ন অভীষ্টের আট (৮.৭) নম্বর অভীষ্টতে পরিস্কারভাবে একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেটি হচ্ছে, সব দেশ-রাষ্ট্র সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে, যাতে করে ২০২৫ সালের মধ্যে সব দেশ-রাষ্ট্র সব ধরনের শিশুশ্রম নির্মূল করে ফেলতে পারে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে শিশু শ্রমিক নির্মূলের চেষ্টা করা অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম খাত থেকে শিশু শ্রমিক শূন্যে নামিয়ে নিয়ে আসা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সরকারকে এখনই কিছু বড় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের আরও লক্ষ্য হলো, ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসন করা।

বছর দুয়েক আগে এক গবেষণায় দেখেছিলাম, ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম শূন্যে নিয়ে আসতে হলে প্রতি বছর সরকারকে ৩৫৬ কোটি অর্থ বরাদ্দ এবং খরচ করতে হবে। কিন্তু গত দুই বছরে জাতীয় বাজেটে শিশুশ্রম নিরসনে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ আমরা দেখিনি। অর্থ বরাদ্দ ব্যতীত ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসন লক্ষ্য অর্জন সুদূরপরাহত হতে পারে।

শিশুশ্রম নিরসনে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন- গ্রামগুলোতে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা। এ ক্ষেত্রে একটি বাড়ি একটি ব্যবসা উদ্যোগটি নিয়ে সরকার ভাবতে পারে। কলকারখানাগুলোতে তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে। সিটি করপোরেশন-পৌরসভায় প্রতিটি বাড়িতে একটি করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে এই মর্মে যে, 'এখানে কোনো শিশু শ্রমিক নেই'।

একটি জাতীয় শিশু উপাত্ত ভাণ্ডার (ডাটাবেজ) তৈরি করা। সেখানে কোন খাতে কত সংখ্যক শিশু কাজ করছে, তার সংখ্যা উল্লেখ থাকবে। এই উপাত্ত ভাণ্ডার শিশুশ্রম নিরসনে পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও দারিদ্র্য ও শিশুবান্ধব করতে হবে। কর্মরত শিশুদের কর্ম থেকে উঠিয়ে নিয়ে তার পরিবারের একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

উন্নয়ন কর্মী