শিল্প-সাহিত্যে ঈদ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৯      

সুপা সাদিয়া

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।

তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ

দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।

এই গানটি বেজে উঠলেই যেন ঈদ ঈদ মনে হয়। এমন কথা বুড়া-যুবা-শিশু সব বাঙালির। আর ঈদের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা এই একটি গান দিয়েই বোঝা যায়। গানটি ১৯৩১ সালে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিখ্যাত শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমেদের অনুরোধে রচনা ও সুরারোপ করেন। গানটি লেখার চার দিন পর শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমেদের গলায় গানটি রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড করার দু'মাস পর ঈদের ঠিক আগে আগে গানটি প্রচারিত হয়। গানটি প্রকাশ করে গ্রামোফোন কোম্পানি। সেই থেকে গানটি আজও প্রতি ঈদুল ফিতরের আগে প্রচারিত হয়। গানটি আজ আর কেবল গান নয়, একটি কালজয়ী ইতিহাস।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঈদ সংক্রান্ত কবিতা-গানে যেমন আনন্দ-উল্লাস ফুটে উঠেছে, তেমনি অসহায় গরিবদের জন্য তার সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। আবার তার ঈদের লেখায় জাতীয় চেতনাও ফুটে উঠেছে। তবে ঈদ নিয়ে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে, মাসিক নবনূর পত্রিকার ঈদ সংখ্যায়। এ ছাড়া পরের বছর অর্থাৎ ১৯০৪ সালে নবনূরের পৌষ ১৩১১ সংখ্যায় কায়কোবাদ রচিত ঈদের কবিতা, ফাল্কগ্দুন ১৩১১ সংখ্যায় ঐতিহাসিক রামপ্রাণ গুপ্তর লেখা ঈদজ্জোহা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। পরের সংখ্যায় অর্থাৎ পৌষ ১৩১২ সংখ্যায় সৈয়দ এমদাদ আলীর ঈদ কবিতা, জীবেন্দু কুমার দত্তের ঈদ সম্মিলন কবিতা, বেগম রোকেয়ার ঈদ সম্মিলন গদ্য প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী তার সম্পাদিত মাসিক আল ইসলাম পত্রিকার ভাদ্র ১৩২৩ সংখ্যায় কোরবানির যুক্তি দেখিয়ে ঈদুল আজহা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এগুলোকেই ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম লেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আশির দশকের পর দৈনিক পত্রিকাগুলো ম্যাগাজিন আকারে ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করছে। প্রথম দিকে বিচিত্রা, সচিত্র সন্ধানী, এরপরে সাপ্তাহিক রোববার, সিনেম্যাগাজিন তারকালোক ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে। তবে বিচিত্রা প্রথমে ঈদ ফ্যাশন সংখ্যা প্রকাশ শুরু করে। এরপর নিপুণ, সাপ্তাহিক ২০০০ ঈদ সংখ্যা প্রকাশ শুরু করে।

বর্তমানে প্রিন্ট মিডিয়ায় ঈদ আসার আগেই ঈদ উৎসব শুরু হয়ে যায় তাদের ঈদ সংখ্যার প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে। ঈদ সংখ্যায় সৃজনশীল লেখকদের পাশাপাশি তরুণ লেখকদের লেখা প্রকাশিত হয়। কেবল মুসলমান লেখকদের নয়, সব ধর্মাবলম্বীর লেখকরাই নিজ উৎসাহে অংশগ্রহণ করেন। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী কোনো কিছুই বাদ যায় না ঈদ সংখ্যা থেকে। কেবল প্রিন্ট মিডিয়ায় নয়, ঈদের আমেজ লেগে যায় ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়ও : রেডিও ও টেলিভিশনে। ৩ দিন, ৫ দিন, ৭ দিনব্যাপী চলে এ আয়োজন। চলচ্চিত্র, নাটক, সিনেমা, আলোচনা, টক শো, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান কোনো কিছুই বাদ যায় না। ইদানীং অনলাইন মিডিয়াগুলোও ঈদ সংখ্যা নিয়ে লেখা প্রকাশ করছে। প্রকাশিত হয় গানের সিডি বা ক্যাসেট। মূলত ঈদের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

ঈদ যেন আজ নতুন কাপড় আর সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি জড়িয়ে গেছে শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে। আর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ঈদ আজ সাম্যের কথা বলে। ঈদ উৎসবকে সাম্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি সুফিয়া কামাল বলেছেন :

'কাল ঈদগাহে ধনী-দরিদ্র মিলবে যে বুকে বুকে

কাল ঈদগাহে ধনীর ধনের দীনও হবে ভাগীদার

পুরাতে হইব কত দিবসের খালি অঞ্জলি তার।'

গবেষক-লেখক, সংগঠক ও

ঘোষক, বাংলাদেশ বেতার এবং

গণসংযোগ কর্মকর্তা,

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ