এমন স্বপ্ন ...

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৯

বিনয় চৌধুরী

হৈমন্তী শুক্লার একটি জনপ্রিয় গানের পঙ্‌ক্তি মনে পড়ছে- 'এমন স্বপ্ন কখনও দেখিনি আমি/মাটিতে যে আজ স্বর্গ এসেছে নামি/অস্ত সূর্য আকাশে এঁকেছে ছবি/কোন প্রেরণায় মন হয়ে গেছে কবি/মুগ্ধ দু'চোখ স্তব্ধ হৃদয়...'। এই গানের পঙ্‌ক্তির সঙ্গে বাস্তবের অনেক কিছুই মেলানো যায় যেন অনায়াসে। মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়। যদি তাই না হতো তাহলে মানুষ স্বপ্ন ধারণ করে সফলতার সিঁড়ি ডিঙাতে পারত না। ৬ জুলাই সমকালে প্রকাশিত একটি সচিত্র প্রতিবেদন আমাদের স্বপ্ন-আশার দিগন্ত আরও বিস্তৃত করেছে। 'এমন ধানের স্বপ্ন ছিল অনেক দিনের' শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা আমাদের কৃষিপ্রধান এই দেশটির জন্য বড় রকমের আনন্দবার্তা বৈকি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক দিন ধরেই দেশের কৃষকরা ঝড়-বৃষ্টিতে টিকে থাকতে সক্ষম ও উচ্চফলনশীল একটি ধানের স্বপ্ন দেখে আসছিলেন। অবশেষে সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। আমন মৌসুমে ফলন হবে হেক্টরপ্রতি ৭ টন এবং ঝড়-বৃষ্টিতেও গাছের কিছু হবে না- এমন একটি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন। নতুন আবিস্কৃত এই ধানটির নাম দেওয়া হয়েছে বিনা-২২। আমাদের কৃষিতে এমন আমন ধানের জাত সংযোজন নিঃসন্দেহে সুখকর বিষয়। দেশের কৃষি খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তাতে যেমন কৃষি গবেষক ও কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে, তেমনি অবদান রয়েছে জাতির মেরুদণ্ড বলে পরিচিত কৃষক শ্রেণিরও। তারা উদয়াস্ত শ্রম দিয়ে, ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদনের চাকা অধিকতর গতিশীল করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন ও উৎকণ্ঠা থেকেই যাচ্ছে- তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে। কৃষকের পেট খালি রেখে মধ্যস্বত্বভোগীরা পকেট স্ম্ফীত করে। কৃষি খাতকে যদি বলি জাতীয় রন্ধনশালা, তবে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। আমাদের খাদ্য ঘাটতি ঘুচিয়েছে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন। বিনা-২২ অন্যান্য ধানের চেয়ে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ দিন কম সময়ের মধ্যে ঘরে তোলা যাবে। জাতীয় বীজ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দেশে আমন মৌসুমে বিনা-২২-এর ফলন অন্য যে কোনো উচ্চফলনশীল ধানের চেয়ে বেশি হবে। এমন বার্তায় কৃষককুলে আনন্দের ঢেউ বইতেই পারে। কিন্তু তাদের এই আনন্দ উৎপাদনের পরই মিইয়ে যাবে না তো? কাগজে-কলমে নির্ধারিত সরকারি হিসাবে ধানের ন্যায্যমূল্য যদি কৃষকরা পেতেন, তাহলে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চয়ই আরও ব্যাপকভাবে হতো লক্ষণীয়। কাজেই কৃষির সম্প্রসারণই শুধু নয়, ভাবতে হবে উৎপাদকদের কথাও সমগুরুত্ব দিয়ে। পান্তা, পেঁয়াজ, ঝাল কাঁচামরিচ ও লবণ কিংবা ডালসিদ্ধ ভাত, আলু ভাজা আর ঘি কিংবা পোলাও-মাংস ইত্যাদি যাই হোক না কেন, আমাদের প্রধান খাদ্য উপকরণ চালের প্রয়োজন সব ক্ষেত্রে। ধান উৎপাদন, তা থেকে চাল তৈরি, নানা পদের রান্না ও পরিবেশন এসবই আমাদের শিল্পবোধ ও জীবনরসে জারিত। যে বা যারা ধান বুনছেন, চাষ করছেন, ধান থেকে চাল তৈরি করছেন, রান্না করছেন আর যে বা যারা খাচ্ছেন সবার মিলিত ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতির প্রেক্ষাপটটাও অনেক বিস্তৃত। আমাদের খাদ্য-সংস্কৃতির অভিন্ন অঙ্গ ধান-চাল। অথচ নানা জাতের ধান-চাল অজান্তেই 'স্মৃতি' হয়ে যাচ্ছে। নতুনকে যেমন আমরা স্বাগত জানাই, তেমনই পুরনোকে ধরে, টিকিয়ে রাখার সে রকম উদ্যোগ-আয়োজনও চাই। আবারও ফিরে যেতে হয় সেই কথায়। নতুন নতুন জাতের ধানের জাত উদ্ভাবনের বার্তা যেমন অত্যন্ত আনন্দের, তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারকরা যেন কৃষকের স্বপ্ন পূরণেও মনোযোগী থাকেন। কৃষকের স্বপ্ন যদি স্বপ্নই থেকে যায়, উৎপাদন যদি তাদের গলার ফাঁস হয় তাহলে উদ্ভাবনের সাফল্য তলিয়ে যাবে অন্তহীন দুঃখের গহ্বরে। এমন দুঃস্বপ্ন যাতে তাড়া না করে সে রকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবস্থা উন্নত করতে পারলে অবস্থা এমনিতেই ভালো হবে।