বর্জন-অংশগ্রহণ-অর্জন

রাজনীতি

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৯

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

দেশের রাজনীতিতে ফের নতুন করে মেরুকরণ শুরু হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয় (বলা ভালো ভূমিধস) বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সামনে যে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড় করায় এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ জোট ও ফ্রন্টের নেতারা নানাভাবে করেছেন। রাজনীতি সচেতন সাধারণ জনগোষ্ঠীর একাংশের আলোচনায়ও বিষয়টি কিছুদিন ভিন্ন মাত্রার খোরাক জুগিয়েছিল। কারও কারও মনে এ শঙ্কাও জেগেছিল- রাজনীতির মাঠ নতুন করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠে কি-না। জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলেছিলেন, 'ভোট ডাকাতি'র (তাদের ভাষায় শুধু ভোট ডাকাতিই নয়, ক্ষমতাসীন মহল স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে) ওই নির্বাচন তারা মানেন না এবং এর প্রতিবাদে তারা রাজনীতির মাঠে 'তুফান' তুলবেন। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যথাযথ প্রতিকারের পথ রচনা করে প্রতিবিধান করবেন। কিন্তু না, 'তুফান' তো দূরের কথা, তাদের কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচিই আলোচনাযোগ্য কিংবা দৃশ্যমান হয়নি।

ফ্রন্টের মনোনীত যারা ওই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন তারা শপথ নেবেন না- এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা দীর্ঘায়ু লাভ করেনি। প্রথমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দু'জন পর্যায়ক্রমে নানা রকম গুঞ্জন ছড়িয়ে শপথ নিয়ে জাতীয় সংসদে যোগ দিলেন। এরপর বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা (দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাদে) শপথ নিয়ে জাতীয় সংসদে বসলেন। তারপর ভাগে পাওয়া সংরক্ষিত নারী আসন থেকে প্রক্রিয়াগত কার্যাদি শেষে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার একাদশ জাতীয় সংসদে যোগদান রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় আবার নতুন মোড় নেয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আসনে (তিনি নির্দিষ্ট সময়ে শপথ না নেওয়ায় বিধি মোতাবেক তার আসনটি শূন্য ঘোষিত হয়) উপনির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জয়ী হয়ে সংসদে যোগ দেন। একাদশ জাতীয় সংসদকে যারা তারস্বরে 'অবৈধ' বলে আসছিলেন এবং সংসদ বর্জনের তর্জন-গর্জন করছিলেন তাদের এই পাশ ফেরা নিয়ে দুর্মুখেরা নানা রকম কথা বললেও সংসদে যোগদানকারীরা (গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দু'জন বাদে) বলেছিলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন বেগবান করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবেই তারা সংসদে যোগ দিয়েছেন। ভালো কথা। রাজনীতিতে কৌশল থাকবেই। কৌশলের মারপ্যাঁচেই তো রাজনীতি চলে আসছে। কিন্তু কৌশলের বদলে যদি অপকৌশল চলে তাহলে তা উদ্বেগের। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা একাদশ জাতীয় সংসদকে অবৈধ বলে আসছিলেন তাদের কি আর এ ব্যাপারে মুখ খোলার অবকাশ রইল? না, নেই। যদি এখনও তারা তা বলতেই থাকেন তাহলে তারা নিজেদেরই 'অবৈধ' বলে আখ্যায়িত করবেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর যে বিএনপি এ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে দলীয় সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই বিএনপিই গত ৫ জুলাই তাদের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সব স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ওই বৈঠকে এও সিদ্ধান্ত হয়, কাউকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে না। আসন্ন তিন সিটি নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা অংশ নেবেন। নিকট অতীতে স্থানীয় সরকার কাঠামোর উপজেলা নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল। যারা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ওই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের দল থেকে বহিস্কার করা হয়। ফলে দুই শতাধিক বিএনপির তৃণমূলের রাজনীতিক এখনও কাগজে-কলমে বহিস্কৃত রয়েছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গৃহীত নতুন সিদ্ধান্ত আর কোনো বাঁক নেয় কি-না এর জন্য তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সামনের দিকে। তবে সবই যেহেতু মেনে নেওয়া হয়েছে, সেহেতু বাগাড়ম্বরের পথ নিজেরাই রুদ্ধ করলেন- এই সত্য তাদের পক্ষে এড়ানো দুরূহ।

আমাদের রক্তস্নাত রাষ্ট্রটির বয়স পাঁচ দশক ছুঁই ছুঁই। এই পাঁচ দশকে রাজনীতিতে বর্জন-অংশগ্রহণের নানা রকম মেরুকরণই আমরা লক্ষ্য করেছি। এসবের অর্জনটা কী এ নিয়ে দুর্মুখেরা হাস্যরসের পাশাপাশি উদ্বেগান্বিত হয়ে ভ্রুও কুঁচকেছেন। এ দেশের রাজনীতি নষ্ট হয়ে গেছে, বিষের ছড়াছড়িতে রাজনীতির মাঠ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, নীতি-নৈতিকতা লোভের গ্রাসে পড়েছে- এসব কথা অনেক শোনা গেছে। স্ববিরোধিতা যে আমাদের রাজনীতিতে ক্রমেই প্রকট রূপ নিচ্ছে, এই দৃষ্টান্ত বিরল নয়। শুধু ২০ দলীয় জোটেই নয়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও টানাপড়েন চলছে। ইতিমধ্যে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টভুক্ত এলডিপিপ্রধান ড. অলি আহমদ কয়েকটি ছোট ছোট দল নিয়ে 'মুক্তি মঞ্চ' নামে পৃথক একটি প্ল্যাটফর্ম গড়েছেন। তার এই তৎপরতাকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানালেও তাদের ঘিরে বিএনপির সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। গুঞ্জন আছে জোট ও ফ্রন্টের আরও কেউ কেউ 'মুক্তি মঞ্চে' যোগ দিতে পারেন। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা এই সন্দেহে নড়েচড়ে বসেছেন। এদিকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কার্যকারিতা ও তৎপরতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তও হয়তো তারা দ্রুতই নেবেন, এমন ইঙ্গিত মিলেছে। ফ্রন্ট বর্জন করে অন্য কোনো ফ্রন্ট বা জোটে কাদের সিদ্দিকী অংশগ্রহণ করবেন কি-না তা ভবিতব্য। ২০ দলীয় জোট বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতির মাঠে এখন কোণঠাসা। নতুন করে আবার কারও কারও বর্জন-অংশগ্রহণে ভবিষ্যতে কী অর্জন হবে এ জন্যও তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সামনের দিকেই। আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে লোভ, আদর্শহীনতা, স্ববিরোধিতা, নীতি-নৈতিকতা লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়গুলো চায়ের টেবিলে আলোচনায় থাকলেও রাজনীতির মাঠে এই শব্দগুলোর মর্মার্থ যাদের উপলব্ধি করার কথা তারা কি সেভাবে করছেন? উল্লেখ্য, দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যে কোনো দল বা সংগঠনের জন্যই শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনে এমন কার্যক্রমের গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংযোজন কার্যক্রম চালানোর আগে দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কারও কারও ভাষায় 'কাউয়া' ও 'হাইব্রিড' নেতাকর্মীদের বিয়োজন কিংবা বর্জনের কথা কি দলটির নেতারা ভেবেছেন?

রাজনীতির ছত্রছায়ায় পেশিশক্তির দাপট শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতে নয়, উপমহাদেশের রাজনীতিতেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুর্ধর্ষ অনেক অপরাধীর বাড়বাড়ন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় হয়েছে- এ কথা অসত্য নয়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, রাজনীতিকদের কাছে রাজনীতি তিনি কঠিন করে তুলবেন। তার এই কথার বাস্তবে প্রতিফলন তিনি ঘটিয়েছিলেন নানাভাবেই। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি পথহারা হওয়ার প্রেক্ষাপট তখনই তৈরি হয়েছিল, এ অভিযোগও পুরনো। তারপর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জামানায়ও রাজনীতি নিয়ে নানা রকম কসরত হয়েছে। রাজনীতির মেরুকরণটা এখানে গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই বারবার হয়েছে- এমন অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। বর্জন-অংশগ্রহণের বিষয়ও অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত হয়েছে সেই নিরিখেই।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপির একটি বক্তব্য দিয়ে লেখাটি শেষ করি। ৫ জুলাই বরিশাল নগরীর অশ্বিনী কুমার টাউন হলে দলের জেলা শাখার আয়োজনে জেলা কমিটির সদস্য মরহুম মাহমুদুল আলম কালুর স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, 'রাজনীতিবিদদের হাতে এখন আর রাজনীতি

নেই'। এই কথাটিও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জন তো বটেই, আরও অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের রাজনীতির অর্জন ব্যাপক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের অর্জনের বিসর্জন ঘটলেও রাজনীতি নিয়ে যদি রাজনীতিকরাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন তাহলে গত্যন্তরটা কী? বর্জন-অংশগ্রহণ ও অর্জনের রাজনীতিতে এই যে মেরুকরণ এর সমীকরণ হতে পারে বহুভাবেই।
deba_bishnu@yahoo.com

সাংবাদিক