শুধু লভ্যাংশে চাঙ্গা হবে না

শেয়ারবাজার

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯      

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

বর্তমান বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানি যেন কোম্পানির লভ্যাংশ প্রদান করে, তার জন্য সরকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কোনো কোম্পানির রিজার্ভ বা রিটেইন্ড আর্নিং পেইডআপ ক্যাপিটালের ৭০ শতাংশের বেশি হলে বাড়তি টাকার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। ঘোষিত লভ্যাংশের ২০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড হিসেবে দেওয়া যাবে। এর বেশি যেটি থাকবে, তার ওপর অনুরূপ কর আরোপ করা হবে। এদিকে ব্যক্তিগত অর্জিত লভ্যাংশ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কর আরোপ করা হবে না। আগে এর পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার টাকা। একই মুনাফার ওপর বিভিন্ন স্তরে যেন কর প্রদান করতে না হয়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য কোম্পানি অধিক লভ্যাংশ ঘোষণা করবে এবং বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। লভ্যাংশ প্রদান করা হয় শেয়ারের ফেসভ্যালুর ওপর। ১০ টাকার শেয়ারের বাজারমূল্য ৪০ টাকা হোক বা ৪০০ টাকা হোক, লভ্যাংশ যদি শতভাগও দেওয়া হয়, শেয়ার হোল্ডার পাবেন ১০ টাকা। অতএব বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ উপার্জন করবেন- এ প্রত্যাশায় শেয়ার বাজারে আসেন না। কোনো কোম্পানির উচ্চহারে লভ্যাংশ প্রদান মানে তার আর্থিক অবস্থা ভালো মনে করা হয়। বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, এই কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে কিছু মুনাফা পাওয়া; আর সেই প্রত্যাশায় এগিয়ে আসতে পারেন। বরং বর্তমানে ফল বোধ হয় উল্টো হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, এভাবে রিজার্ভের ওপর হস্তক্ষেপ কোম্পানির আর্থিক ভিতকে দুর্বল করে দেবে। এ প্রসঙ্গে আরও বলা যায়, একটি কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার হস্তক্ষেপ করপোরেট প্রশাসনের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য। স্টক এক্সচেঞ্জের বিনিয়োগকারীরা যুগপৎ শেয়ার ব্যবসায়ী। সঞ্চয়পত্র যারা কেনেন, তারা সঞ্চয়পত্র থেকে মুনাফা নিয়ে থাকেন। তাদের একটা নির্দিষ্ট আয় নিশ্চিত করা থাকে। শেয়ারের বেলায় ব্যাপারটা ভিন্ন। শেয়ার মুনাফা কত আসবে, তা নিশ্চিত নয়। তাই সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের মতো নিশ্চিত বসে থাকতে পারেন না। অতএব তাদের লক্ষ্য থাকে শেয়ারের দাম ওঠানামার সঙ্গে নিজেদের কেনা শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করা। অতএব সেকেন্ডারি মার্কেটে অর্থাৎ স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই। লভ্যাংশ সম্বন্ধে তো আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে।

ব্যাংক থেকে নয়, পুঁজিবাজার থেকে প্রয়োজনীয় মূলধন তুলতে হবে; এ রকম ভালো ভালো কথা বলা হচ্ছে। এ নিয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। এ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না। কিন্তু বাস্তব অবস্থাটা কি ঠিকমতো বিচার-বিশ্নেষণ করে দেখা হচ্ছে? শেয়ার কেনাবেচা করতে হলে বিও একাউন্ট থাকতে হয়। শেয়ার ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠানে এসব একাউন্ট খোলা হয়। গত কয়েক বছর থেকে বিও একাউন্ট পরিসংখ্যান প্রায় একই রয়েছে। এতে মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশ শেয়ার ব্যবসায় নিয়োজিত বলে মনে করা যায়। অবশ্য এতে একদিকে ক্রস একাউন্ট, অপরদিকে নিষ্ফ্ক্রিয় একাউন্ট রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিশেষ কয়েকটি শহরে এ ধরনের একাউন্ট রয়েছে। ১৯৯৬ এবং ২০০৯-১০ সালে ব্যাপক সাড়া মিলেছিল জনগণের। কিন্তু এই সাধারণ নিরীহ বিনিয়োগকারীদের পুরো বিনিয়োগের অর্থ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তদন্ত হলো, কিন্তু কোনো বিচার হলো না। মার্চেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে সরকার থেকে কিছু অর্থ ধার দেওয়া হয়েছিল। সে সুযোগ সরল ও নিরীহ বিনিয়োগকারীরা ভোগ করতে পারেনি। যা হোক, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে বিক্ষিপ্ত কোনো ব্যবস্থা নিলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মার্কেটকে সমান তালে চলতে হবে। সাবেক অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত কয়েকবার নিশ্চয়তা দেওয়ার পরও একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে আসেনি। এক যুগেরও বেশি সময় আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হলো। অথচ আজও আইপিওর মাধ্যমে বাজারে শেয়ার ছাড়া হলো না।

অনেক দেশে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছে। এখানে এ রকম কোনো প্রচেষ্টা নেই। ধারণা করা হয়েছিল, পদ্মা সেতুর বিপরীতে প্রকল্প অর্থায়নের জন্য সরকার বন্ড ছাড়বে। তেমনটি হলো না। এখানে আরও একটি মজার ব্যাপার হলো, অনেক সেমিনার, আলোচনা সভায় কোম্পানি খাতের অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের কথা বলেন। অথচ তারা নিজেরা যে কাজটি করেন তা হলো, তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। তারা আইপিওর মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহ করতে আগ্রহী নন। আবার কেউ কেউ মনের মতো প্রিমিয়াম রেট না পেলে শেয়ার ছাড়তে আগ্রহী হন না। আবার জনগণের জন্য যে আইপিওতে শেয়ার ছাড়া হয়, সেখানে এত কোটা যে, জনগণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

পরিশেষে একটি কথা বলা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে তা সামগ্রিক বিবেচনায় করতে হবে। কোনো খেয়াল-খুশি বা অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ নেই। সেটা করলে দেশেরই অমঙ্গল।

ব্যাংক, বীমা খাত, শেয়ারবাজার বিশ্নেষক

ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা