সর্বত্র চলছে হীন প্রতিযোগিতা

রাষ্ট্র ও সমাজ

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯      

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দুটি অত্যাবশ্যকীয় ভিত্তি। এ দুই বস্তু আমাদের দেশে আগে ছিল না, এখনও নেই। পৃথিবীর যেসব দেশ গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, সেখানে তো আছে বলে বলা হয়। কিন্তু খুব যখন প্রয়োজন পড়ে তখন দেখা যায় নেই। আমেরিকার নেতৃত্বে যখন পুঁজিবাদী বিশ্বের ইরাক ও আফগানিস্তান দখল চলল, তখন সে ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছিল- এমন কথা কেউ বলতে পারবেন না। দাবি করা হয়েছিল, ইরাকে এমন সব ওয়েপন্‌স অব মাস ডেস্ট্রাকশন রয়েছে, যেগুলোর একটি মাত্র আঘাত অসংখ্য মানুষকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পইপই করে খোঁজা হলো, কিন্তু আক্রমণ-উন্মাদেরা তেমন কোনো অস্ত্রের খবর বিশ্ববাসীকে দিতে পারল না। তবু দখল করা হলো, হত্যা ও রক্তপাতের কোনো সীমা-পরিসীমা রইল না। কিন্তু না দেখা গেল স্বচ্ছতা, না দায় রইল জবাবদিহির। আফগানিস্তান দখলের অজুহাত ছিল তালেবানদের হটানো, যে তালেবানরা একদা মার্কিনিদের হাতেই তৈরি হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ব থেকে আফগানিস্তানকে 'মুক্ত' করার জন্য। সে দেশে মানুষ ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে বিপুল; তালেবানরা নিশ্চিহ্ন হয়নি। তারা নানা উপায়ে ফিরে এসেছে। আফগানিস্তানের ধ্বংসকাণ্ডের জন্য আমেরিকাকে জবাবদিহির কাঠগড়াতে দাঁড়াতে হয়নি- না বিশ্ববাসীর কাছে, না নিজ দেশের জনগণের কাছে।

স্বচ্ছতা থাকলে ধরা পড়ত যে, উভয় ক্ষেত্রেই আসল উদ্দেশ্য ছিল দেশ দুটির জ্বালানি তেল ও খনিজসম্পদ হস্তগত করা; সেই সঙ্গে ছিল সমরাস্ত্র তৈরি এবং সেনাবাহিনীতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। আমেরিকা এটাও দেখাতে চেয়েছে- তারা দুর্ধর্ষ; যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা করছে। সে জন্য কারও কাছে জবাবদিহির প্রয়োজন নেই। কোন যুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে তাদের বাসভূমি দখল করে বসে আছে, তার জবাবও ইসরায়েল কখনও দেয়নি, দেবেও না। মিয়ানমারে কী ঘটছে, সে ব্যাপারে স্বচ্ছতা নেই দেখে 'গণতান্ত্রিক' বিশ্ব বেশ ক্ষুব্ধ ছিল। সে দেশের নিষ্ঠুর সামরিক জান্তার ওপর নানাবিধ চাপও প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে তারা 'উদার' হয়। শেষ পর্যন্ত নাকি খানিকটা উদারতা প্রকাশে সম্মত হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কেন নাগরিক অধিকার দেওয়া হচ্ছে না; কেন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে; তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। তাদের ঘরবাড়ি কেন জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে; হত্যা করে এবং হত্যার হুমকি দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে কেন পাহাড়ে জঙ্গলে নৌকায় পালিয়ে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে; তার কোনো ব্যাখ্যা উদারতা প্রদর্শনকারী শাসকরা উপস্থিত করছে না। গণতান্ত্রিক বিশ্ব থেকেও এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ উঠছে না। অং সান সু চি মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করেছেন, বিশ্ব তার প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছে। কিন্তু তিনি নিজে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা লাঘবের পক্ষে প্রথমে কোনো কথাই বলেননি। পরে যা বলেছেন, তা হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের পক্ষে যায়নি।

দৃষ্টি দিই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের কয়েকটি দিকে। আমাদের দেশেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিলক্ষণ অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা মানা হয় না। সংসদের কার্যক্রমের দিকে তাকালে দেশে কোনো বিরোধী দলের উপস্থিতি আছে বলে টের পাওয়া যায় না। শেয়ারবাজারে কেলেঙ্কারি হয়, অপরাধীরা ধরা পড়ে না। সরকারি ব্যাংক থেকে হলমার্কওয়ালারা কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করল, সেটা রহস্যই রয়ে যায়। সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতিকে কারা, কেন হত্যা করল, তা পরিস্কার হয় না। ইলিয়াস আলী ঢাকা থেকে উধাও হয়ে কোথায় চলে গেল, তার কোনো হদিস নেই। এ ধরনের বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রেই যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চিহ্ন পাওয়া যায় না, তখন ছোটখাটো অপরাধের যারা ভুক্তভোগী তারা ন্যায়বিচার পাবেন- এমন আশা নিশ্চয় বাস্তবসম্মত নয়। বাস্তবেও তেমনটা দেখা যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে; খুন, ধর্ষণ, আত্মহত্যা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব দিক দিয়ে দেশ এখন ঘটনাবহুল। অভাব কেবল ওই দুই বস্তুর- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির, যেগুলোর অভাব ঘটলে গণতন্ত্র আছে, এমনটা বলা মুস্কিল। কিন্তু গণতন্ত্র তো এমনি এমনি আসে না; তার জন্য চাপের দরকার পড়ে। সেই চাপটা দিতে পারে অন্য কেউ নয়; জনসাধারণই। যে জন্য প্রত্যেক দেশেই জনগণের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় শাসক শ্রেণিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অনুশীলনে বাধ্য করা। নিজের দেশে গণতন্ত্র এলে তবেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা সম্ভব। সুখের বিষয় এইটুকুই, বোধটা পৃথিবীব্যাপী এখন পরিস্কারভাবে ফুটে উঠেছে। আমাদের দেশেও এই বোধের বিকাশ ও দৃঢ়তা প্রয়োজন। নইলে যতই গণতন্ত্রের কথা বলি, গণতন্ত্র আকাশকুসুমই রয়ে যাবে।

২. নানা প্রত্যাশা আর স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষা আমরা করে থাকি। এখনও তেমন প্রত্যাশা করছি বৈকি। তবে দেশের সার্বিক অবস্থা আমাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় দুই প্রধান দলের মধ্যে বিবাদ কম হতে দেখিনি। পথচারী নিরপরাধ বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার নৃশংস দৃশ্য বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেশবাসী দেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বরগুনার ঘটনা তারই ধারাবাহিক। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়াতেই সমাজে অপরাধীরা বেড়ে ওঠার আস্কারা পায়। পাঁচ বছরান্তে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পর্যায়ক্রমে একবার এই দল, আরেকবার ওই দল ক্ষমতায় বসছে। কিন্তু জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। দুই প্রধান দল যে একে অপরের বিকল্প নয়- এই সত্যটি বারবার প্রমাণিত। প্রকৃত বিকল্পের অভাবে জনগণ এই দুই দলের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশে এ যাবৎকালের একটি নির্বাচনও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বোঝা যাচ্ছে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় জনগণের মুক্তি অসম্ভব। এ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া জনগণের ভাগ্য বদল হবে না। বিদ্যমান জনবিরোধী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে প্রধান দুই দলের মধ্যে নূ্যনতম বিরোধ নেই; নেই মতপার্থক্য। বরং উভয়েই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে একমত।

দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নিম্নগামী। অথচ সরকার আইএমএফ-এর চাপে বারবার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে জনগণকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ের সর্বস্তরে পড়বে। বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের অঙ্গীকারে সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম দুই বছর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে নূ্যনতম ভূমিকা পালন করেনি। তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের সুযোগ নিয়ে কুইক রেন্টাল পদ্ধতির বাতাবরণে ব্যক্তিমালিকানাধীন কতিপয় প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি করেছে; আর চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের আর্থিক বোঝা চাপানো হয়েছে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর। কয়েক দফায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে সরকার ইতিহাস গড়েছে। আবারও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা চলছে। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর স্লাব পদ্ধতি আরোপ করে ব্যবহূত বিদ্যুতের ইউনিট ছয়টি স্লাবে বিভক্ত করে ভিন্ন ভিন্ন দরে বিদ্যুৎ বিল আদায় করছে। কুইক রেন্টালের নেতিবাচক প্রভাবে বিদ্যুৎ গ্রাহকমাত্রই চড়া মাশুল গুনছে। সম্প্রতি গ্যাসের মূল্য আরেক দফা বাড়িয়ে জনজীবনে ঘোর দুর্ভোগের ছায়া ফেলা হলো।

দেশে ধর্ষণ আগেও ছিল, কিন্তু এখন তা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাঁচ-সাত বছরের শিশু পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। গণধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। ভারতের দিল্লিতে বাসে গণধর্ষণের একটি ঘটনা সারা ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমাদের দেশে গণধর্ষণ, শিশুধর্ষণ ও নারীহত্যা অহরহ ঘটছে, কিন্তু প্রতিবাদের আলোড়ন সৃষ্টি হচ্ছে না। পুলিশ ও আইনের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে এবং সামাজিক বিড়ম্বনার ভয়ে আক্রান্তরা বেশিরভাগই বিষয়টি চেপে যায়, প্রকাশ করে না। যে কয়টি প্রকাশ পায়, সেগুলোর নগণ্য সংখ্যকই বিচার হয়। ধর্ষকরা প্রধানত বোধ-বিবেচনা বিবর্জিত এবং সংস্কৃতিহীন। বিদ্যমান ব্যবস্থা সুস্থ মানসিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করছে। যার নেতিবাচক প্রভাবে আশাহীন ও আত্মসুখপরায়ণ তরুণ-যুবকেরা অসুস্থ, অমানবিক পন্থায় নিজেদের বিকার জাহির করছে। ট্রেনে ডাকাতি নতুন নয়। এখন যেটা যুক্ত হয়েছে তা হচ্ছে, ডাকাতি করে চলন্ত মানুষকে নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করা। এমনটা আগে দেখিনি। সহিংসতা এখন সর্বসীমা লঙ্ঘন করে চলেছে। একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানিরা যা করেছে, তা ছিল শত্রুপক্ষের কাজ। এখন দেশের বলবান গোষ্ঠী স্বদেশিদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। ওদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনাও ঘটছে।

সমাজের সর্বত্র চলছে হীন প্রতিযোগিতা। কে কাকে ডিঙিয়ে এগিয়ে যাবে, কাকে ধাক্কা দিলে নিজের অর্জন নিশ্চিত হবে; সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান ঘটনা। ব্যক্তির উন্নতির এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সমষ্টি ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, যা নির্বাচনের মাধ্যমে আসবে না। আসবে সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের পথে। আমরা এমন ব্যবস্থা চাই, যা মানুষকে আশাহীন ও ভবিষ্যৎহীন করবে না। সবার জন্য অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করবে। সে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া আমাদের পরিত্রাণ নেই। এটা বললে অন্যায় হবে না, যাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলি, আসলে তা সমাজ বিপ্লবেরই চেতনা। এই চেতনাটুকু পুষ্ট করতেই হবে।

শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক