জনসংখ্যা হোক জনসম্পদ

দিবস

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯      

আসিফ

বিশ্ব আজ জনসংখ্যায় ভারাক্রান্ত। অত্যধিক জনসংখ্যার চাপ পৃথিবীর পরিবেশকে রীতিমতো বিষাক্ত করে ফেলেছে। সৃষ্টি হয়েছে সমাজে মারাত্মক সব বৈষম্য:একদিকে প্রবল স্বাচ্ছন্দ্য, আরেকদিকে হতদরিদ্র। অথচ একসময় জনসংখ্যার স্বল্পতা মানব সমাজের অস্তিত্বকে ভীষণভাবে অনিশ্চিত করে তুলেছিল। এক লাখ বছর আগে মাত্র একশ'জন স্যাপিয়েন্স আফ্রিকা থেকে পৃথিবীর পথে যাত্রা শুরু করেছিল, ছড়িয়ে পড়েছিল পথে-প্রান্তরে। খাদ্যের জন্য পাগলের মতোই ঘুরে বেরিয়েছিল। অবশেষে কৃষির উদ্ভাবন মানুষকে স্বস্তি দিয়েছিল। এক ধরনের আগামীকালের খাদ্য অনিশ্চয়তা থেকে কিছুটা রেহাই পেয়েছিল মানুষ। শিকারি জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিল, ঘর বেঁধেছিল মানুষ। জনসংখ্যার বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়েছিল এ উদ্ভাবনে। এটা নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল স্বল্প জনসংখ্যার কারণে পৃথিবী থেকে মানবজাতির বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে।

কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কর্মসংস্থান, তার সামাজিকীকরণ, সাংস্কৃতিক বিকাশ, শিক্ষার ব্যাপারে যথার্থভাবে মনোযোগ না দেওয়া, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পৃথিবীর সামনে বড় একটা সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশও এই সমস্যার মুখোমুখি। পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বলা হয় বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় যে, ১৮৬০ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ছিল মাত্র দুই কোটি। বর্তমানে এই জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দ্বিগুণেরও বেশি জনসংখ্যা বেড়েছে গত তিন যুগে। বিবিএস ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় যে, বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং এ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৫০ সালে জনসংখ্যা ২২ কোটি ২৫ লাখে পৌঁছবে। এ রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও বাংলাদেশ তার জনসংখ্যাকে কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বার্ষিক আয় মাথাপিছু দুই হাজার ডলার হয়েছে, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলার অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিকল্পনার অভাবে পুরো জনসংখ্যাকে ঠিকমতো কার্যকর করা যাচ্ছে না। এ জন্য অনেক ক্ষেত্রেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে বৈষম্য।

রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম একটি মূল উপাদান হলো জনসংখ্যা। সক্রিয় জনসংখ্যার ওপরই নির্ভর করে একটি দেশের অগ্রগতি। এই জনসংখ্যার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করে আসছে প্রতি বছর। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটিতে উন্নীত হয়। পরবর্তীকালে ইউএনডিপির গভর্ন্যান্স কাউন্সিল প্রতি বছর এই দিনটিকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করে আসছে। ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই প্রথমবার ৯০টি দেশে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বছর বাংলাদেশ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করতে যাচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে- 'জনসংখ্যা ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ২৫ বছর : প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন'। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, জনসংখ্যা বিষয়ক সমস্যাগুলো সবাইকে জানানো এবং তা গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা।

একটি হিসাব বলছে, পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ৮ দশমিক ৩ কোটি হারে বাড়ছে। এই হার আগামী দিনেও চলতে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। জনসংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ, মাদকাসক্তি, শিক্ষার অভাব ইত্যাদি। বেকারত্ব থেকে পরিবেশ দূষণ, মাদকাসক্তি থেকে জঙ্গিবাদের উত্থান- এসবের মূলে রয়েছে জনসংখ্যার আধিক্য। অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়বহুল শিক্ষাব্যবস্থা, পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্রের সুযোগ না থাকা ও সীমিত সম্পদের কারণে বাংলাদেশেও এই বিপুল জনসংখ্যা বোঝা হয়ে পড়ছে। সুতরাং সচেতনতা ও শিক্ষিত জনসম্পদ তৈরি করা এবং পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জনসংখ্যা সমস্যার সমাধান অন্যতম উপায়  হতে পারে।