দুঃখিত, এরশাদকে নিয়ে যে কথাটা লেখা গেল না

বাউন্ডুলে

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯      

সুমন্ত আসলাম

খুব যত্নের সঙ্গে আমরা রবীন্দ্রনাথকে বাঁচিয়েছি। প্রবল জলে ভাসতে ছিলেন তিনি। ডাঙ্গায় তুলে আমরা তার গা মুছে দিয়েছি, শুকনো নতুন কাপড় দিয়েছি, মগ বোঝাই গরম চা দিয়েছি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়েছি, তারপর পুষ্টিকর খাবার দিয়ে ধবধবে একটা বিছানা দিয়েছি।

পানিতে চার দিন একা একা খড়কুটো নিয়ে ভেসে থাকা রবীন্দ্রনাথ ঘুমালেন, সেই ঘুমের মাঝে যেন সামান্যক্ষণের জন্য দুঃস্বপ্ন না দেখেন, আচার-আচরণ-ব্যবহারে বুঝিয়েও দিয়েছি তা।

চোখ-মুখ ফুলানো প্রশান্তির ঘুম শেষে আরও এক কাপ চা দিয়েছি আমরা তার হাতে। তিনি সেই চায়ে অল্প অল্প করে চুমুক দিয়ে বললেন, 'ভারত থেকে মাছ ধরতে এসে উল্টে যায় আমাদের ট্রলার। পনেরজন ছিলাম সেখানে, চৌদ্দজন ডুবে গেছে। কেবল বেঁচে আছি আমি।' মুখ দিয়ে বলা কথার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার অবয়বে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন-বেঁচে ছিলেন না তিনি, তাকে আমরা বাঁচিয়েছি, আমাদের বাংলাদেশের মানুষরা বাঁচিয়েছে।

অথচ চার বছর আগে আমাদের কিছু জেলে ঝড়ের কবলে পড়ে ভারত সীমান্তে গিয়ে ঠেকেছিলেন। আট-নয় মাস জেল খেটে প্রত্যেককে ফিরতে হয়েছিল দেশে! আর কয়দিন আগে যে কুয়াকাটায় ধরা পড়লেন আরও বেশ কয়েকজন ভারতীয় জেলে, যারা এই মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে বাংলাদেশ সীমানায় ঢুকে মাছ ধরতে এসেছিলেন, ভালো রেখেছি আমরা তাদেরও। অথচ মমতা দিদি কয়দিন আগে বেশ আক্ষেপ করে বললেন, 'তিস্তার পানি দেইনি, তাই ইলিশ পাচ্ছি না।' কিন্তু দিদি বোধহয় এটা জানেন না-আমরা বাংলাদেশিরা আধা কিলো মিষ্টি নিয়ে কারও বাড়িতে বেড়ানোর মানুষ না। অন্তত তিন রকমের তিন কেজি মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার প্রশস্ত বুক আমাদের। সুতরাং নো চিন্তা দিদি, ইলিশ পাবেন। আপনি জাস্ট মরিচ-পেঁয়াজ-মসলাগুলো সাজিয়ে রাখুন। আপনি সামান্য ইলিশই তো চেয়েছেন, আর তো কিছু না!



দ্বিতীয় দফায় দুধের দশটি নমুনা পরীক্ষা করে সবগুলোতেই ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক এবং ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক ও তাঁর সহগবেষক দল। প্রথম দফার পরীক্ষার ফলাফলেও তিনি একই জিনিস পেয়েছিলেন। তারপর ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর। বিষণ্ন মুখে তিনি বলেন, 'দুধের মানবিষয়ক পরীক্ষার ফল নিয়ে কিছু সরকারি কর্মকর্তা ও কোম্পানির মালিক যে ভাষা আমার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছেন, তাতে আমি বিপন্ন।'

বিপন্ন আমরাও। এই দুধ খেয়েই আমাদের একটা প্রজন্ম বড় হচ্ছে। তারা যখন বাবা-মা হবে, দেখা যাবে-তাদের সেই সন্তানের কারও হাত নেই, কারও পা নেই, চোখ নেই, নাক নেই। কারও কারও মাথা নেই। মাথা ছাড়া একটা প্রজন্ম বেড়ে উঠবে আমাদের দেশে, আমরা তা চেয়ে চেয়ে দেখব!



শরীয়তপুরের জাজিরা পৌর এলাকার মেয়র ইউনুস ব্যাপারীর ছেলে মাসুদ ব্যাপারীর কথা লিখেছিলাম গত সপ্তাহে। অভাবী একটা মেয়েকে ঘরে আটকে রেখে দু'দফা শ্নীলতাহানি করার পর শ্বাসরোধ করে মারার চেষ্টা করেছিল সে তাকে। ধর্ষক সেই মেয়রপুত্রের জামিন হয়ে গেছে আট দিনের মাথায়। মামলায় ওই আসামির পক্ষে লড়েছেন আইনজীবী জয়নব আক্তার ইতি। জামিন আবেদন করেন তিনি আসামির পক্ষে। তা মঞ্জুর করেন জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মরিয়ম মুন মঞ্জুরী।

দু'জনই নারী!

প্রীতিলতা, দিদি আমার, একটা চিঠি লিখব আপনাকে। ঠিকানাটা দিন না, প্লিজ।



মানুষটা হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন, 'ইউ, নটি বয়।' মাথা নিচু করে ফেললাম আমি। সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ আমার হাতটা আরও একটু চাপ দিয়ে বললেন, 'একদিন আমার অফিসে এসো, গল্প করব তোমার সঙ্গে।'

আমার অফিসে এসে তিনি কথাটি বলেছিলেন একদিন, কিন্তু না, তার অফিসে আমার যাওয়া হয়নি। গল্পও করা হয়নি তাই।

সম্ভবত পনের-ষোল বছর আগের কথা। সাপ্তাহিক যে স্যাটায়ার ম্যাগাজিনটা বের হতো আমার হাত দিয়ে, প্রথম পৃষ্ঠার বাম পাশের কোনায় উপরের দিকে একটা বিদ্রূপাত্মক বা মজার লেখা থাকত। সেখানে একবার ছাপা হয়েছিল-চিড়িয়াখানায় গাধা নাই, এরশাদ আছে চিন্তা নাই। [ঢাবির দেয়াল থেকে নেওয়া]। ঢাকা ভার্সিটির দেয়ালে ছিল লেখাটা, জাস্ট তুলে দিয়েছিলাম সেখানে। তার কিছুদিন আগে নাকি একটা দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল-চিড়িয়াখানায় কোনো গাধা নেই।

মারা গেলেন এরশাদ। তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনামূলক বলতে চাই-আপনাকে নিয়ে ওই লেখার কথাটা পাল্টে দিতে চাই, পাল্টে দেব একদিন-অন্যভাবে, অন্য শব্দে। নিশ্চয়ই সেদিন আপনি প্রশান্তির একটা হাসি দিয়ে আবারও বলবেন-ইউ, নটি বয়।



বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ফাইনাল খেলা হলো ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ডের মধ্যে। পুরো দেশে আমরা ভাগ হয়ে গিয়েছিলাম দু'দেশে। কিন্তু তারা আমাদের কেউ না। ইংল্যান্ডের রানী আমাদের কোনো দিন নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়াননি, নিউজিল্যান্ডও কয়েক প্যাকেট দুধ আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেনি- আপনাদের দুধে ক্ষতিকারক অ্যান্টিবায়োটিক আছে, এখন থেকে আমাদের দেশের দুধ খাবেন। বরং কেউ কেউ ধুয়া তুলেছেন-ইংল্যান্ড ২০০ বছর শাসন করেছে আমাদের, তারা অনেক কিছু চুরি করে নিয়ে গেছে এখান থেকে। কেউ কেউ আবার বলেছেন-নিউজিল্যান্ডে মসজিদের ভেতর অনেক মুসলমান মেরে ফেলা হয়েছে কয়দিন আগে। নানাজনের নানা কথা। সব ভুলে গিয়ে আমরা দু'দেশকে সাপোর্ট করে গেছি আলাদা আলাদা।

আমরা এমনই। আমরা অন্যদের ভালোবাসি, অন্য মানুষদের মানুষের মতো সম্মান করি, অতিথির মতো সেবা করি তাদের।

কারণ পৃথিবীর গুটিকয়েক দেশের মতো আমরা যুদ্ধ করে, রক্ত ঝরিয়ে স্বাধীন হয়েছি। আর আমরাই পৃথিবীর একমাত্র জাতি, যারা নিজের মায়ের ভাষার জন্য, নিজের মুখের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি অকাতরে।

এমন একটা দেশের সঙ্গে, এমন একটা জাতির সঙ্গে অন্য দেশ-জাতির তুলনা!

আমরা এমনই। নৃশংসতা, বর্বরতা আর পশুত্বের চরম পরকাষ্ঠা দেখানোর পরও পাকিস্তানিদের বলি-ভাই!

লেখক ও সাংবাদিক