বন্যার পদধ্বনি নিয়ে বিভ্রান্তির পথরেখা

আলোর ইশারা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯      

ড. আইনুন নিশাত

খবরের কাগজের পাতায় বড় বড় করে লেখা হচ্ছে, দেশজুড়ে বন্যা চলছে। জলাবদ্ধতার কারণে নগরের মানুষ ভুগছে। আরও বড় বন্যার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আমি দেখছি আর বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছি। অবশ্য যে কেউই খুব সহজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে ঢুকে নিজেই বিষয়টি বুঝে নিতে পারবেন।

আমাকে গতকালই, সোমবারে যখন এই লেখা লিখব ভাবছিলাম, একজন সাংবাদিক বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তাকে বললাম, পাউবোর ওই ওয়েবসাইটে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। সেখানে নদনদীগুলোর বর্তমান প্রবাহ পরিস্থিতি, আগামী তিন দিনে কী হতে পারে তার বর্ণনা কিংবা তারও পরবর্তী পাঁচ বা দশ দিনের সম্ভাব্য অবস্থা দেখা যেতে পারে। তার প্রশ্ন ছিল, ওয়েবসাইটটি কবে হয়েছে। উত্তর দিয়েছিলাম, আমি অন্তত দুই দশক ধরে দেখছি। ক্রমান্বয়ে এর মান আরও উন্নত হচ্ছে। আরও দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের বন্যা পূর্বাভাসও দিতে সক্ষম হচ্ছে। আর তিন দিন আগে তো পূর্বাভাস প্রায় কাঁটায় কাঁটায় সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

সুতরাং দেশের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতিতে আমার প্রথম পরামর্শ হচ্ছে- যারা এ ব্যাপারে অনুসন্ধিৎসু বা আগ্রহী, তারা এই ওয়েবসাইটে যেতে পারেন। এর মাধ্যমে বন্যা পরিস্থিতির চিত্র অবলোকন ও অনুধাবন করতে পারবেন।

দ্বিতীয় যে কথাটি বলতে চাই, তা হলো বন্যা পরিস্থিতি বুঝতে গিয়ে পুরো বাংলাদেশকে একটা ইউনিটে ফেলা যাবে না। প্রত্যেক জনপদের ভৌগোলিক অবস্থান ও তার নিকটবর্তী নদীপ্রবাহের অবস্থা বুঝে বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। যেমন সোমবার পর্যন্ত কক্সবাজার অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করছিল একটি নদী কেন্দ্র করে, বোধকরি শঙ্খ। দেশে বন্যা আক্রান্ত দ্বিতীয় এলাকা আসামের বরাক অববাহিকা, বা বাংলাদেশে সুরমা ও কুশিয়ারা। সেখানে মেঘালয় থেকে আসা কিছু নদীও রয়েছে, যেমন যাদুকাটা। বন্যা আক্রান্ত তৃতীয় স্থানটি হচ্ছে- রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট এলাকা। সেখানে ভুটান থেকে ভারত হয়ে আসা ধরলা ও দুধকুমার নদী রয়েছে। ভারতের সিকিম দার্জিলিং হয়ে আসা তিস্তা নদী রয়েছে। আরও ভাটিতে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা নদী। দেখা যাচ্ছে, ঢলের আকারে ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়ায় ঢুকে চিলমারী, বাহাদুরাবাদ, সিরাজগঞ্জ, নগরবাড়ী হয়ে গোয়ালন্দ পর্যন্ত পৌঁছেছে। আগামী কয়েক দিনে সেটা মাওয়া হয়ে চাঁদপুর পৌঁছবে। এই তিন বন্যা আক্রান্ত এলাকার সঙ্গে রয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা এবং ঢাকা নগরীর কিছু কিছু স্থানে পানি জমে থাকার সমস্যা।

ওপরের প্রত্যেকটি স্থান সম্পর্কে আলাদা আলাদা বিশ্নেষণ করে বুঝতে হবে, সেখানকার বন্যা বা জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি কী এবং তা কোনদিকে যাচ্ছে। প্রথমে যদি শঙ্খ নদীর কথা বলি, বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এই সময়ে এমন বৃষ্টিপাতই স্বাভাবিক। ফলে শঙ্খ নদীর পানি বেড়েছে। নদীর দুই পাশের প্লাবনভূমি পানির তলায়; কিন্তু দু-একদিনেই তা নেমে যাবে। পাহাড়ি নদীর ধর্মই এমন। বৃষ্টি হলে হঠাৎ পানি বেড়ে যাবে আবার দ্রুতই নেমে যাবে।

সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকা তথা হাওর অঞ্চলে সবক'টি নদীর পানি এখন বিপদসীমার ওপরে। এই বিপদসীমা নির্ধারণ করা হয় সংশ্নিষ্ট এলাকায় নির্মিত বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধের উচ্চতার ওপর ভিত্তি করে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, জামালগঞ্জ কিংবা নেত্রকোনার কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বাঁধগুলোকে আমরা ডুবন্ত বাঁধ বলি। অর্থাৎ জুন মাসের শুরু থেকেই এগুলো ডুবে যাবে এবং চারদিকে থৈ থৈ পানি বিরাজ করবে। কেউ কেউ বলছেন, ওই এলাকার লোকজন 'পানিবন্দি' অবস্থায়। বিষয়টি মোটেও তা নয়। হাওরাঞ্চলের সাতটি জেলা অর্থাৎ নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বর্ষাকালে এ ধরনের উচ্চতায় পানি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এই পরিমাণ পানি জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশের জন্য কাঙ্ক্ষিত বলা যেতে পারে। তবে যেসব এলাকায় বন্যা নিরোধকারী বাঁধ রয়েছে, সেগুলো ডুবে গেলে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক ধরা যেতে পারে। সৌভাগ্যবশত, তেমন কোনো তথ্য আমার নজরে পড়েনি। বেশ কিছু এলাকায় রাস্তা ডুবে পানি এপাশ থেকে ওপাশ যাচ্ছে কিংবা রাস্তা ভেঙে গেছে। সেটি হয় নির্মাণের দুর্বলতা অথবা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। অথবা নির্মাণের সময় উচ্চতা সঠিকভাবে নিরূপিত হয়নি। এখন নির্মাণ ও কারিগরি কাজের এসব দুর্বলতার দায় প্রকৃতির ওপর চাপানো ঠিক?

তিস্তা ও ধরলার অববাহিকার কথা যদি বলি, এ বছর তিস্তা সত্যিই অত্যন্ত খারাপ অবস্থায়। গত দুই থেকে তিন দিন অত্যন্ত দ্রুতহারে পানির উচ্চতা বেড়েছে এবং এযাবৎকালের পানির উচ্চতা সংক্রান্ত যেসব রেকর্ড রয়েছে, তা অতিক্রম করে গেছে। যদিও খুব অল্প সময়ের জন্য। পানি ইতিমধ্যে নেমে যাওয়া শুরু করেছে। যদি রোববারও বাড়তে থাকত, তাহলে হয়তো তিস্তা ব্যারাজ রক্ষা করার জন্য বামতীরের একটি অবকাঠামো ভেঙে দিয়ে পানির স্তর নামাতে হতো। এতে করে লালমনিরহাট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা হতে পারত। গাইবান্ধা অঞ্চলেও পানির উচ্চতা বেশ বেশি। তবে এখানকার নদীগুলো 'ফ্লাশি' হওয়ার কারণে পানি দ্রুত নেমে যাবে। ব্রহ্মপুত্র তথা যমুনা দিয়ে আসাম অঞ্চলের বন্যার পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ঢোকার পর কোথাও কোথাও বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে বা অতিক্রম করছে। আগামী আট-দশদিন এ ধরনের অবস্থাই থাকবে। বৃষ্টিপাত যদি চলতে থাকে, তাহলে সহসা পানি নাও নেমে যেতে পারে। এতে করে চরাঞ্চল ডুবে যাবে এবং ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ে বন্যার ব্যবস্থাপনা বাঁধের বাইরে যাদের অবস্থান, তাদের বাড়িঘরও ডুবে যাবে। আর বাঁধের ভেতরে যারা বসবাস করেন, তাদের নিরাপত্তা বাঁধের স্থায়িত্বের ওপর নির্ভরশীল।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের জলাবদ্ধতার কথা বলি। এখন পূর্ণিমা চলছে। অন্যদিকে নিম্নচাপের কারণে বইছে ঝোড়ো বাতাস। দুই মিলে কর্ণফুলীর পানির স্তর এখন অনেক উঁচুতে। আবার চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ জোয়ারের পানি ওই এলাকার খালগুলো দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। আর ভেতরের বৃষ্টির পানি ভারি জোয়ারের কারণে বের হতে পারছে না। আবার খালগুলোর ধারণ ক্ষমতাও কমে গেছে। সবকিছু মিলে শহরে নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ঢাকা শহরেরও একই অবস্থা। ভেতরের বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। খালগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এটাই প্রধান কারণ।

সমাধানের কথা যদি বলি- প্রথমত, দায়িত্বশীল সবাইকে নিয়মিতভাবে বন্যা পূর্বাভাসগুলো দেখে নিতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত প্রতিবেদন যায় বলে জানি। কিন্তু এই প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। ওয়েবসাইটেই তথ্য দেওয়া আছে। দ্বিতীয়ত, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে পরামর্শ দিতে পারি, এই ওয়েবসাইটে কী কী তথ্য আছে, তা কীভাবে সহজেই পাওয়া যায়, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের নিয়ে 'অ্যাপ্রেসিয়েশন ওয়ার্কশপ' করা যেতে পারে। আমাদের প্রায় সবার পকেটেই এখন মোবাইল ফোন। এর মাধ্যমেই ওয়েবসাইটের তথ্য ডাউনলোড করা যায়। আর ডেস্কটপ কম্পিউটারে তো আরও ভালোভাবে দেখা যায়। অর্থাৎ পূর্বাভাস দেখে কোন এলাকায় নজর দিতে হবে, তা বোঝা যাবে। তৃতীয়ত, যেখানে বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ রয়েছে, সেগুলো যাতে পানির চাপ সহ্য করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমার জানামতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের এবং বিভিন্ন জেলার ডিসিদের এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার নির্দেশনা দিয়েছে। বহু জায়গায় নদী ভাঙন দেখা দিতে পারে, সে জন্য দ্রুত অর্থায়নের মাধ্যমে নদী ভাঙন ঠেকাতে হবে।

যেখানে বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ নেই, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ বন্যা আক্রান্ত হবে। এবং দেশের সবাইকে বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধের আওতায় আনা যাবে না। তাদের সংখ্যা হয়তো দেশের মোট জনসংখ্যার চার-পাঁচ ভাগ। তাদের বন্যার সঙ্গে সহাবস্থানের প্রক্রিয়া শেখাতে হবে। যেখানে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে কিন্তু বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ নেই, তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহূত হয়। এতে কিছুদিনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখতে হতে পারে।

আমার জানামতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতিমধ্যে কিছু ত্রাণ তৎপরতা চলছে। সাত বা দশ দিনের জন্য শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। এটি একটি আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনো জায়গায় পানি উঠলেই আমরা সরকারের কাছে ত্রাণ চাইব, খাবার চাইব- এটা কেন যেন আমার কাছে সঠিক মনে হয় না। আর ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনের ড্রেনগুলো পরিস্কার রাখতে হবে। নগরবাসীকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, যেখানে সেখানে পলিথিন ব্যাগ ফেলব না। তাহলেই ড্রেনগুলো পরিস্কার রাখা সম্ভব।

খবরের কাগজে পড়েছি, কিছু কিছু জায়গায় আমন ধানের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত। হয়তো অল্প ক'দিন আগে লাগানো চারা নষ্ট হয়েছে। এখনও পর্যাপ্ত সময় আছে, পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন করে চারা লাগানো যেতে পারে। বন্যার সময় পানিবাহিত রোগবালাইয়ের আশঙ্কা দেখা দেয়। এ জন্য খাবার পানির উৎসগুলো রক্ষা করা দরকার। যেমন টিউবওয়েল ডুবে গেলে তা উঁচু করা যেতে পারে।

শেষ করছি এ কথা বলে, শ্রাবণ মাসে প্লাবনভূমিতে পানি আসবে- এটা স্বাভাবিক। আমরা ধানের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বহু জায়গায় প্লাবনভূমিকে চাষযোগ্য জমিতে রূপান্তর করেছি। এই প্রক্রিয়ায় নির্মিত বাঁধগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখা প্রয়োজন। সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের এ কথা মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না। তবে বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে স্থানীয় জনসাধারণ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত আইন ও বিধিমালা আমাদের দেশে রয়েছে। এখন সেগুলো সক্রিয়ভাবে বাস্তবায়নের সময় এসেছে।

সবশেষে বলি- কোন এলাকা কেন পানিতে ডুবে যায়, তা বুঝতে হবে, সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে হবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যে এলাকায় বর্ষাকালে স্বাভাবিকভাবে পানি থাকার কথা, সেই এলাকাকে 'পানিবন্দি' বলে অহেতুক চিৎকার করা ঠিক নয়। বর্ষাকালে তো বর্ষার পানি আসবেই। এটাই স্বাভাবিক, এটাই প্রাকৃতিক।

পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ; ইমেরিটাস অধ্যাপক ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়