এবারের বন্যায় বিপদ ও বিলাপ

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ১৯ জুলাই ২০১৯      

শেখ রোকন

প্রকৃতির দিক থেকে দেখলে এবারের বন্যা 'সময়োচিত'। আগাম নয়, বিলম্বিতও নয়। আষাঢ় ও শ্রাবণ, বর্ষাকালের দুই মাসের একেবারে মাঝামাঝি এসেছে। আরও সপ্তাহ দুই-তিন আগে এলে দেশের অনেক অঞ্চলে বোরো ধান বিনষ্ট হতো। আর সপ্তাহ দুয়েক পরে এলে ক্ষতিগ্রস্ত হতো আমন ধান। বছরের এই সময়টায় মাঠে অন্যান্য ফসলও কম থাকে। কোথাও কোথাও আমন ধানের বীজতলা বোনা শুরু হয়েছিল। বন্যায় সেই ক্ষতি ততটা ধর্তব্য নয়। পানি নেমে গেলেই বরং আমন চাষের ভরা মৌসুম শুরু হবে। অনেক এলাকায় বন্যাভেজা জমি বীজতলা তৈরির জন্য সুবিধাজনক হবে।

বানভাসি মানুষের দিক থেকে অবশ্য এভাবে দেখার অবকাশ নেই। রাতারাতি যখন নিজের ঘরদোর পানির দখলে যায়, তখন 'বৃহৎ চিত্র' দেখার অবকাশ কোথায়? প্রায় একই সময়ে দেশের তিনটি অববাহিকায় বন্যা দেখা দিয়েছে :সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকা বা সিলেট অঞ্চল, কর্ণফুলী-শঙ্খ অববাহিকা বা চট্টগ্রাম অঞ্চল, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকা বা রংপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চল। বন্যাক্রান্ত এলাকায় বাড়িঘর ছেড়ে অনেককে আশ্রয় নিতে হয়েছে উঁচু বাঁধে বা স্থাপনায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাণও হারিয়েছেন বেশ কিছু মানুষ।

সন্দেহ নেই, আগেও এভাবেই বন্যা এসেছে। বস্তুত বন্যা বাংলাদেশের প্রায় বাৎসরিক 'ইভেন্ট'। কিন্তু অন্যান্যবারের চেয়ে এবারের পার্থক্য বন্যার খবরাখবরে। কয়েক বছর আগেও অন্যরা বন্যার খবর পেত সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের মাধ্যমে। এবার যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বন্যার পানি কোথায় কতটা গড়াল, কোন কোন বাঁধ বা সড়ক ভাঙল- বন্যাক্রান্তদের ফোনে ফোনেই ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। একটি দৈনিকের অনলাইনে প্রকাশিত ছবি এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। এক নারী পানিওঠা বাড়িতে বসে আছেন ফোন কানে দিয়ে। ক্যাপশন : মুঠোফোনে আপনজনকে জানানো হচ্ছে বানভাসি জীবনের কথা।

এক অর্থে আমি নিজেও বানভাসি। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে আমার পৈতৃক বাড়িতে পানি উঠেছে। আমার মা মোবাইল ফোনে তার ঢাকা-পড়ূয়া মেয়ের কাছে নিয়মিত বিরতিতে বন্যার ধারাবিবরণী দেন: এই সুপারিবাগানে পানি এলো, এই কাঁঠালতলা পেরোলো। ফেসবুকে গিয়ে তো রৌমারীর বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে 'লাইভ' খবরাখবর মিলছে। বৃহস্পতিবার সকালে ফেসবুকে বন্যা নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছি; কিছুক্ষণ পরেই সেখানে আমার এক চাচা এসে বলছেন, 'ভাতিজা, এইমাত্র আমার বাড়িতে পানি উঠল।'

নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তত্ত্ব দিয়েছিলেন, অবাধ তথ্যপ্রবাহ থাকলে কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না। এবারের বন্যায় মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন ও তাতে ইন্টারনেট সংযোগ আশঙ্কার মধ্যেও আশা জাগায় যে, কেউ বেখবর বিপন্ন হবে না। কেবল খবর ও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েও সাধারণ মানুষ বসে নেই। ফেসবুকে দেখছি, বন্যার্তদের সহায়তায় 'ইভেন্ট' খোলা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের কী করণীয়, সে ব্যাপারে নেটিজেনরা আলোচনা করছে। ডিসি বা ইউএনও অফিসের নিজস্ব ফেসবুক পেজ বা অ্যাকাউন্টে স্থানীয় বন্যা পরিস্থিতি ও ত্রাণ কার্যক্রমের 'আপডেট' দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়রা চাইলে তৎক্ষণাৎ 'ফিডব্যাক' দিতে পারছেন।

তাহলে কি এবারের বন্যার সবই 'স্বাভাবিক'? শিরোনামে তাহলে 'বিপদ' লিখছি কেন? এবারের বন্যার প্রথম বিপদ হচ্ছে, একযোগে তিন অববাহিকায় বন্যা দেখা দেওয়া। সাধারণত ব্রহ্মপুত্র, বরাক বা সুরমা-কুশিয়ারা ও গঙ্গা অববাহিকার এক একটিতে বন্যা দেখা দেয়। এতে করে সরকার ও সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ দেওয়া, ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা চালানো সুবিধা হয়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার কথা যদি বলি, এসব বৃহৎ নদীর একটির অববাহিকায় বন্যা দেখা দিলে এবং অন্য দুই নদী অববাহিকা বন্যামুক্ত থাকলে পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে। তিন অববাহিকায় যখন একযোগে বন্যা দেখা দেয়, তখন দক্ষিণের এক মেঘনা সব পানি পাস করে দিতে পারে না। পানির চাপে একপর্যায়ে গোটা দেশেই দেখা দেয় বন্যা।

অতীতে যখনই তিন অববাহিকায় একযোগে বন্যা দেখা দিয়েছে, তখনই আমরা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছি। নিকট অতীতে ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৮, ২০১৭ সালে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। এবার গঙ্গা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশে এখনও বন্যা নেই। কিন্তু নেপালে দেখা দেওয়া বন্যা কোশি নদী বেয়ে গঙ্গায় নেমেছে। ভারতের বিহারে ইতিমধ্যে বন্যা দেখা দিয়েছে। সেটা পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে আসতে এক সপ্তাহের বেশি লাগবে না। বাড়তি যোগ হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্ণফুলী-শঙ্খ অববাহিকা। উত্তর-পূর্ব ভারতে ও বাংলাদেশে যদি আবারও গত সপ্তাহের মতো ভারি বর্ষণ হয়, তাহলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।

এবারের বন্যার দ্বিতীয় বিপদ এর গতি। উজানে-ভাটিতে একযোগে বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যার পানির গতি ছিল অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি। ফলে বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ অঞ্চলে আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ছোবল হেনেছে রেলপথেও। বন্যার পানি যত নেমে যেতে থাকবে, ভেঙেচুরে মুখব্যাদান করে থাকা ক্ষতগুলো তত স্পষ্ট হবে। বলা বাহুল্য, সহজে সংস্কার সম্ভব হবে না। আমার আশঙ্কা, গত কয়েক বছরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সম্প্রসারিত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এই বন্যা বড় ধাক্কা হয়ে আসছে।

অভিজ্ঞরা জানেন, বন্যায় সড়ক ভাঙা মানে নিছক সড়ক সংস্কারের ব্যয়ের ব্যাপার নয়। শাখের করাতের মতো। আশপাশের জমিতেও খাদ তৈরি হয়। সেই বালু আবার অন্য জমিতে পরবর্তী কয়েক বছর ফসল জন্মানো কঠিন করে তোলে। অনেকটা নিয়তির পরিহাসের মতো হলেও সত্য- প্রকৃতির প্রবণতা উপেক্ষা করে নির্মিত এই সড়কগুলোই আমাদের আবহমান বন্যাকে বিপর্যয়কর করে তোলে। হাজার বছর ধরে এ দেশের মানুষ বন্যার সঙ্গে বসবাস করেছে। অপরিকল্পিত সড়কের কারণে যেমন বন্যার পানি নেমে যেতে দেরি হয়, তেমনই বিপর্যয় কয়েকগুণ হয়ে ওঠে। সীমান্তের এপাশ-ওপাশে নানা স্থাপনা নদনদীর ধারণক্ষমতাও কমিয়ে দিয়েছে। বন্যা নিয়ে বিলাপের বড় কারণ এটাই।

লেখক ও গবেষক
[email protected]