জীবন থেকে নেওয়া

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ০৫ জুলাই ২০১৯

কাজী ছাইদুল হালিম

স্ত্রী আর ছোট ছোট তিন সন্তানকে রেখে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান বাবা। মা অনেক কষ্টে আমাদের তিন ভাইকে নিয়ে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের একদম শেষ পর্যায়ে এসে বাবা যুদ্ধে শহীদ হন। মা আমাদের তিন ভাইকে নিয়ে একা স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। আর তাই স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসা অনেকের জন্য খুব আনন্দের হলেও আমাদের জন্য তা ছিল একদম বিপরীত। ১৯৭২ সালের কোনো এক সময়ে, সম্ভবত বছরের শেষ দিকে এক সকালে আমার মা আমাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের 'ছোট ওয়ানে' ভর্তি করে দেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আমাদের গ্রামেই অবস্থিত, আত্রাই নদীর তীরে। সেই সকালটার কথা আজও আমার মনে পড়ে- এক স্যার রেজিস্টার খাতায় আমার নাম লিখলেন; আমি স্কুলে থেকে গেলাম, মা বাড়ি ফিরে গেলেন! জাতীয় সঙ্গীতের পর ক্লাস শুরু হলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, শ্রেণিকক্ষে আমাদের বসার জন্য কোনো বেঞ্চ ছিল না। মাটির ঘরে বিছানায় বসে আমাদের ক্লাস শুরু হলো। শেখার আগ্রহে আমি শিক্ষকের পাঠদানে ডুবে গেলাম। সবাইকে বলব, যখন কিছু শিখবেন সম্পূর্ণ হৃদয় দিয়ে শিখুন, জীবনে অনেক দূর যেতে পারবেন।

আর দশটা শিশুর তুলনায় আমার শৈশব একটু ভিন্ন ধরনের ছিল। স্কুল জীবন আর বাস্তব জীবন দুটিই আমাকে একসঙ্গে শুরু করতে হয়েছিল। বাবার অনুপস্থিতি এবং পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হওয়ায় স্কুলের পাশাপাশি দৈনন্দিন পারিবারিক কাজকর্মও আমাকে নিজ হাতে নিয়মিত করতে হতো। এ জন্যই আমি জমিতে চাষসহ ধান রোপণ থেকে শুরু করে গাভীর দুগ্ধ দোহনে পর্যন্ত পারদর্শিতা অর্জন করি। আর শৈশবের সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা আজও আমার জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি সন্তানকে পরিবারের দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে দিলে ও শেখালে ওরা জীবন চলার পথে অনেক বাস্তবমুখী ও সংবেদনশীল হবে।

আমার শিক্ষাজীবনে কিছু শিক্ষকের অবদান কোনোদিনই ভুলতে পারব না। মিহির স্যার তাদের মধ্যে একজন, যিনি আমার প্রথম গৃহশিক্ষক ছিলেন। মিহির স্যার আমার বাবার ছাত্র ছিলেন। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, আমার বাবা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও ছিলেন হাই স্কুল শিক্ষক। আজ আমরা তিন ভাইও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষক। আমার নানা, মামাও শিক্ষক ছিলেন। মিহির স্যার ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাড়িতে এসে আমাদের পড়িয়ে যেতেন। কান্তি স্যারের ইংলিশ শিক্ষা আজও আমাকে ইংলিশ লিখতে ও বলতে সাহস জোগায়। আর নাসির স্যার তো সাধারণ শিক্ষা ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। নাসির স্যার শিক্ষকতার পাশাপাশি হোমিও চিকিৎসা করতেন। বাবা স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হওয়ায় স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে আমাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ খারাপ ছিল। আর তাই নাসির স্যার আমাদের চিকিৎসা করতেন বিনা পয়সায়। একদিন তিনি ওষুধ দেওয়ার সময় আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে পানি পান এবং বাইরে কিছু সময় মুক্ত বাতাসে হাঁটার জন্য। স্যারের সে উপদেশ দুটি আজও আমি নিয়মিত পালন করে যাচ্ছি। আমি নিজেকে সব সময় বেশ সুস্থবোধ করি। সুস্থ থাকার জন্য সকালে নিয়মিত খালি পেটে পানি পান এবং কিছুটা সময় বাইরে হাঁটলে সবাই ভালো থাকবেন।

আমাদের বাড়ি গ্রামে (ছোট চাঁদপুর, নাজিপুর, পত্নীতলা, নওগাঁ) হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে থেকেই বেগম ও ইত্তেফাক পত্রিকা দুটি নিয়মিত আমাদের বাড়িতে আসত। মা পড়তেন বেগম আর বাবা ইত্তেফাক। আজও মনে আছে, দুই বা কখনও কখনও তিন দিন পরপর পত্রিকা আসত আমাদের বাজারের একটা দোকানে এবং সেখানে গিয়ে পত্রিকা নিয়ে আসতে হতো। পরে বেগমের বদলে সাপ্তাহিক বিচিত্রা আসত। শৈশবের সেই পত্রিকা ও খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস এখনও রয়ে গেছে। খবরের কাগজ যেদিন বের হয় না, সেদিনই শুধু পড়া হয় না। তা ছাড়া খবরের কাগজ আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। পরিবারের সবাই মিলে খবরের কাগজ পড়লে বিশ্ব সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এই বিশ্বায়নের যুগে এগিয়ে যেতে হলে তথ্যের প্রয়োজন; আর খবরের কাগজ তথ্য সরবরাহের এক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

আমি তখন সবেমাত্র পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। স্কুল, খেলাধুলা এবং পারিবারিক কাজকর্ম নিয়ে সময় কাটছিল। সে সময় আজকের মতো এমন ইন্টারনেটের যুগ ছিল না যে আঙুল টিপলেই তথ্যজগৎ খুলে যাবে চোখের সমনে। মা, মামা-খালাদের কাছে ঢাকা, রাজশাহী ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনেছিলাম। সে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নের শুরু। ছাত্র হিসেবে ক্লাস রোল নম্বরের দিক দিয়ে তেমন ভালো না থাকায় অনেক সময় উচ্চশিক্ষার সাহস না থাকলেও স্বপ্ন দেখতে ভুলতাম না। সেই যে স্বপ্ন আর পড়াশোনার পেছনে লেগে থাকা, যা আমাকে নিয়ে গেছে উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রাম থেকে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরিশেষে তামপেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বপ্ন দেখতে ভোলা যাবে না, আর লক্ষ্যের পেছনে নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকতে হবে- লক্ষ্যে পৌঁছানো দুরূহ হবে না।

আমাদের জীবন একটা প্রবহমান অস্তিত্ব, যার দুটি প্রান্ত আছে- ১. জন্ম ২. মৃত্যু। জীবনের এই দুটি প্রান্তের মাঝে শৈশব, কৈশোর আর বার্ধক্য বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, তা আমাদের কর্মজীবন। আমাদের প্রত্যেকের কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন ঘটে শৈশব-কৈশোরে অর্জিত গুণাবলি, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার। এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বলিষ্ঠ। পরিবারে যখন সততার অনুশীলন হবে, সে পরিবারে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে সততার পরিচয় দেবে; অন্যথায় না। পরিবারে সততা অনুশীলনের মূল দায়িত্ব অভিভাবকদের হাতে। সন্তানকে সততা শিক্ষা দিয়ে দেশকে সুনাগরিক উপহার দিলে দেশ এগিয়ে যাবে, তার সঙ্গে আমরাও এগিয়ে যাব। ফিনল্যান্ডে এই দীর্ঘ সময়ে বসবাসকালে আমি যা দেখেছি তা হচ্ছে, কীভাবে এরা সততা শিক্ষা দেয় জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে। তাই ফিনরা সব সময় বলে, সততা হচ্ছে তাদের সংস্কৃতির প্রধান এবং প্রথম স্তম্ভ।

ফিনল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষক ও গবেষক