অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার

অন্যদৃষ্টি

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০১৯      

সাহাদাৎ রানা

দেশে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ডেঙ্গু। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর আসছে প্রায় প্রতিদিনই। কারণ এর চিকিৎসা বিষয়ে অনেক ডাক্তারও যথাযথভাবে অবগত নন। তাই অসচেতন রোগীরা অনেক ডাক্তারের পরামর্শে শুরুতে জ্বর কমাতে ব্যবহার করছেন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিবায়োটিক। অনেক সময় দেখা যায়, ডাক্তাররাও অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছেন রোগীকে। বুঝে না বুঝে এটা করছেন অনেকে, যা কোনোভাবে কাম্য নয়। অথচ ২৫ এপ্রিল ২০১৯-এ অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়া এ ধরনের ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। নির্দেশনায় আদালত বলেছেন, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এ ধরনের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে। নির্দেশ পাওয়ার দু'দিনের মধ্যে সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করতে বলেছেন হাইকোর্ট। পরিপত্রের আলোকে জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জন ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু আদালতের এমন নির্দেশনার পরও সারাদেশে মানা হচ্ছে না বিষয়টি। সবার চোখের সামনে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। যেখানে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও এভাবে দেদারসে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির কারণ অনুসন্ধানে একটু গভীরে প্রবেশ করা যাক। আমাদের দেশে চিকিৎসারত একজন রোগী দেশে নামিদামি হাসপাতালে বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন। সেই বড় ডাক্তার একই সঙ্গে দশ রকমের ওষুধ দিয়েছেন। বেঁচে থাকার আশায় সেই দশ রকমের ওষুধ সেবন করে লাখ লাখ টাকা খরচ করেও রোগ ভালো হচ্ছে না। অথচ ভারতে গিয়ে এক বা দুই প্রকার ওষুধ সেবন করে সেই রোগী সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। এমন উদাহরণ অসংখ্য। এর পেছনে রয়েছে অনেক কারণ।

অ্যান্টিবায়োটিক দামি ওষুধ হিসেবে পরিচিত। এতে দেখা যায়, ডাক্তার নিদিষ্ট কোনো কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দেওয়ার বিনিময়ে সেই কোম্পানি থেকে তারা পেয়ে থাকেন বিশেষ সুবিধা। অথচ যে রোগীর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন নেই, তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তা ভেবে দেখেন না। সবার আগে যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা হলো, অপ্রয়োজনে রোগীদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করার কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, যা নিতান্ত বিপজ্জনক। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে। আমাদের দেশের লোকজন সাধারণত ডাক্তার না দেখিয়ে ফার্মেসি থেকে নিজে গিয়ে ওষুধ কিনে আনেন। আর এই সুযোগে দেশের ফার্মেসিগুলোতে বিভিন্ন রোগের চাহিদা ছাড়াও রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। এটা আমাদের অজ্ঞতা।

দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে। দেশের প্রায় সব হাসপাতালে ৭০ শতাংশ রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়ে থাকে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি রোগী ডাক্তারের পরামর্শে অযৌক্তিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করানো হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয়, এ ধরনের বিপজ্জনক প্রবণতা দিন দিন বাড়ছেই। অথচ অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার রোধ করা সম্ভব না হলে একদিকে যেমন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসবে; অন্যদিকে যে কোনো ধরনের সংক্রামক ব্যাধি উপশমের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজেই আসবে না।

হাইকোর্ট অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। কিন্তু এখন সরকার ও সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে, হাইকোর্টের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না তা দেখা। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে যেসব ফার্মেসি রয়েছে, সেখানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা। যারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করছেন, তাদের আইনের আওতায় আনা। শুধু ফার্মেসি নয়, অভিযান চালাতে হবে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকের বিরুদ্ধেও। সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরি করে দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। তবেই অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার বন্ধ হবে।

সাংবাদিক