খেলাপি ঋণ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা

আর্থিক খাত

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০১৯      

এম হাফিজউদ্দিন খান

আমাদের দেশে আর্থিক খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে খেলাপি ঋণ। সঙ্গতকারণেই তা নানা মহলে বারবার আলোচনায় উঠে আসছে। সরকারের তরফেও এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হচ্ছে। কিন্তু তারপরও বিগত দুই দশকেরও বেশি সময়ে খেলাপি ঋণের উৎকটতা বাড়ছে বৈ কমছে না। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী বেসিক ব্যাংকে গিয়ে বলেছেন, 'বেসিক ব্যাংকে অনেক ঠিকানাবিহীন ঋণ আছে। আগামীতে কেউ আর ঠিকানাবিহীন থাকবে না। এদের খুঁজে বের করে প্রত্যেকের পেছনে একজন করে এজেন্সির লোক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যারা ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' নিঃসন্দেহে এমন উচ্চারণ সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের সামনে প্রতিকারের দৃষ্টান্ত ক'টি আছে?

আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রীতিকর নয়। যারা ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে টাকা নিয়ে পাচার করছেন কিংবা শিল্পে রুগ্‌ণতা দেখিয়ে বা অন্য কোনো ইচ্ছাকৃত কারণে খেলাপি হচ্ছেন, তাদের অর্থ বাজেয়াপ্ত করা উচিত বলে মনে করি। ইতিপূর্বে এই কলামেই এ বিষয়ে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে লিখেছিলাম। সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি রয়েছে। তাদের পক্ষে জানা মোটেও দুরূহ ব্যাপার নয় যে, অর্থ কীভাবে পাচার হয়েছে বা হচ্ছে, এমনকি কোন দেশে কোন ব্যাংকে পাচারকৃত কত অর্থ জমা হচ্ছে। বিষয়টি অনুসন্ধানক্রমেও জানা কঠিন নয়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বেসিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু কথার কথা বলে লাভ কী? এতে তো কোনো সুফল মিলবে না। যে পথে সুফল মিলবে সেই পথে হাঁটা হচ্ছে না কেন?

খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও বলা যায়, কারা ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হচ্ছে- তাও অনুসন্ধানক্রমে বের করা মোটেও কঠিন নয়। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে নানা মহলে কথাবার্তা হচ্ছে, সরকারের দায়িত্বশীলরাও বলছেন কিন্তু দৃশ্যমান প্রতিকার চিত্র কী আছে? উত্তরটা প্রীতিকর নয়। একজন সৎ উদ্যোক্তার ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে নাকি অনেক বেগ পেতে হয়, কিন্তু অসাধুদের কোনো ক্ষেত্রেই অসুবিধা হয় না।

আমাদের আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক কারণটি অবশ্যই অন্যতম বড় কারণ বলে মনে করি। আমরা বারবার বলে আসছি, দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় ঠেকাতে এবং খেলাপি ঋণ আদায় করতে ও অর্থ পাচারকারীদের শিকড় উৎপাটনে যদি সর্বাগ্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে সুফলের আশা দুরাশায়ই নামান্তর। এ ক্ষেত্রে যেমন সরকারি দলকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, তেমনি প্রয়োজন রয়েছে বিরোধীদেরও সদিচ্ছার। এক কথায় রাজনৈতিক ঐকমত্য।

সরকারকে মনে রাখতে হবে- সামনে একমাত্র এজেন্ডা ব্যাংকের টাকা উদ্ধার করা, অনিয়ম-অনাচারের বিচার করা। যারা নীতি বিসর্জন দিয়ে শুধু অর্থ কামাইয়ের নানা ফাঁকফোকর খোঁজে তাদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বস্তুত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সংখ্যা কম নয়। এ ব্যাধি বড় জটিল। এ ব্যাধির উপসর্গও বহুবিধ। সরকারের সামনে এখন যেমন কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নেই, তেমনি নেই কোনো অস্থিরতাও। একতরফা রাজনীতি চলছে। সরকারই এককভাবে রয়েছে রাজনীতির মাঠে। সুশাসন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, বহু মতের প্রতিফলন- এসব ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত কোনো কিছুর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সরকারের দায়িত্বশীলরা বলছেন অনেক কিছুই, কিন্তু কাজ হচ্ছে কতটা?

খেলাপি ঋণের সমস্যা অনেক ব্যাংকের জন্যই জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আগে খেলাপি ঋণের সমস্যা মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে বেশি ছিল; এখন তা বিস্তৃত হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকেও। ব্যাংক খাতের কত রকম অনিয়ম-অনাচারের খবর ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হলো তবুও শৃঙ্খলা ফিরল না এ খাতে। আমি মনে করি, দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোর একত্রীকরণের বিষয়টি এখন খুবই গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের ঐকমত্যও দরকার। আর সরকারের দায়িত্বশীলরা যদি মনে করেন যে, ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়েই তাদের সব দায় শেষ তাহলে বলার আর কিছু নেই।


দুর্নীতি দমন কমিশনকেও এসব ব্যাপারে আরও সজাগ ও সতর্ক হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আগে দৃষ্টান্ত দাঁড় করাতে হবে। বড় বড় কথায় কাজ হবে না, লাজ্জা-ভয় অসাধুদের তাড়া করবে না। সমস্যার বৃত্তমুক্ত হতে হলে ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার। ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে অবস্থা এমনিতেই ভালো হবে। ব্যবস্থা দুর্বল কিংবা ব্যবস্থায় ছিদ্র রেখে সুফলের আশা করে লাভ নেই।

আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো এবার ক্ষমতায় এসে খেলাপি ঋণ কমানোর ঘোষণা দিয়েছিল। বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে 'দুষ্টের পালন' চলছে, এ কথা আমি এর আগের লেখায় লিখেছিলাম। এই যে ঋণখেলাপিদের দফায় দফায় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলো, এর তো কোনোই সুফল পরিলক্ষিত হয়নি। খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে কেন বের হতে পারছে না দেশের ব্যাংকগুলো- এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান দুরূহ কোনো ব্যাপার নয়। মূলত দুর্নীতি, অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ শিথিলতা ইত্যাদি কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

খেলাপি ঋণের স্টম্ফীত চিত্র দেশের ব্যাংক খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অশনি সংকেত। ঋণ যাতে কুঋণে পরিণত না হয়, এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর যতটুকু সতর্ক ও সজাগ থাকার কথা, তাতে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংক খাতে অসাধু কর্মকর্তাদের দাপট ও আধিপত্যের কারণে খেলাপি ঋণের চিত্র ক্রমেই স্টম্ফীত হচ্ছে। আমাদের সমাজে বস্তুত ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার প্রবণতা এক ধরনের অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি ও নজরদারির বিকল্প নেই।

খেলাপি ঋণের মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যুগোপযোগী আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিশেষ বেঞ্চ গঠনের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা অধিকতর গতিশীল করা। শুধু অর্থঋণ আদালতে এসব মামলার নিষ্পত্তি সময়মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত, জনগণের গচ্ছিত আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংক খাতকে আমাদের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করা। ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য, অনৈতিক কর্মকা বন্ধ করতে প্রয়োজন নির্মোহ অবস্থান নিয়ে আইনের কঠোর প্রয়োগ। খেলাপি ঋণের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। যদি দৃঢ়ভাবে এর মোকাবেলা করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ জন্য আমাদের বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন