পরিবেশের জন্য বিপর্যয়

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

মো. সাহেদ মাহবুব চৌধুরী

রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের কারণে ২০১৭ সালের পরে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানকার পরিবেশ। উখিয়া ও টেকনাফের এক সময়ের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ সংরক্ষিত পাহাড়ি বনাঞ্চল আজ পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রধান কারণগুলো হলো- রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল ও জ্বালানির জন্য নির্বিচারে বন উজাড়; গাছপালা ও অন্যান্য বনজ সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত আহরণ ও পাহাড় কেটে বাড়িঘর নির্মাণ। যার ফলে এখানকার অনন্য জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্ব আজ বিলীন হতে চলেছে। অতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে সার্বিক প্রতিবেশ। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে মূলত দু'ধরনের। প্রথমত, ক্ষতি হচ্ছে এলাকার ভৌত পরিবেশের। যেমন- মাটি, পানি, বাতাস ইত্যাদি। আর দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য, যেমন- বনভূমি, বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ইউএনডিপি প্রকাশিত পরিবেশের ওপর প্রভাব বিষয়ক এক গবেষণায় রোহিঙ্গা সমস্যার জন্য উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় মোট ১১ ধরনের ক্ষতি হচ্ছে বলে জানা যায়। যার মধ্যে আছে অতিরিক্ত সংখ্যক টিউবওয়েল স্থাপনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির আধার কমে যাওয়া, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির আধার দূষিত হওয়া। সুপেয় পানির অন্যান্য উৎস, যেমন- সীমিত সংখ্যক নদী ও খাল ইতিমধ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া অতিরিক্ত গাছ কাটা ও পাহাড় ধ্বংসের কারণে বেশিরভাগ পাহাড়ি ছড়া এখন সারাবছর থাকে পানিশূন্য। যার ফলে, এ এলাকায় বসবাসকারী স্থানীয় জনগণ দীর্ঘমেয়াদে সুপেয় প্রাকৃতিক খাবার পানির অভাবে পড়তে যাচ্ছে। তা ছাড়া অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাসহ ১৭ লাখ অধিবাসীর এ অঞ্চল পরিণত হচ্ছে এক কঠিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাগাড়ে। যার ক্ষতিকর প্রভাবে অচিরেই এ জনপদ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। জমে থাকা এসব বর্জ্যের বেশিরভাগই বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়ার বন্যার পানির স্রোতের সঙ্গে মিশে গিয়ে পড়ছে পার্শ্ববর্তী নাফ নদসহ অন্যান্য প্রধান সংযোগ খালে। যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে মৎস্য সম্পদসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপর।

উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে যদি কেউ প্রথমবারের মতো যায়, তার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন, এসব পাহাড়ে মাত্র দুই বছর আগেও বনভূমি ছিল। রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত এ অঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার ৩শ' একর বনভূমি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। তা ছাড়া আরও তিন থেকে চার হাজার একর বনভূমির গাছপালা উজাড় করা হয়েছে শুধু রোহিঙ্গাদের জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করার জন্য। কক্সবাজার ও টেকনাফ উপদ্বীপের অন্তর্গত বিশাল পাহাড়ি বনভূমি অঞ্চলে ৫২৫ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। যার মধ্যে অতি সংকটাপন্ন এশিয়ান হাতিও রয়েছে। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের অন্তর্গত টেকনাফ ও উখিয়ার বিশাল পাহাড়ি বনভূমি বন অধিদপ্তরের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। টেকনাফ উপদ্বীপের অংশে বন্যপ্রাণীর আধিক্যের কারণে এক সময় দেশের একমাত্র গেম রিজার্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, যদিও পরে স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে জাতীয় উদ্যান করা হয়।

পাহাড়, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় এলাকাটি অনেক বন্যপ্রাণীর পরিযায়নের পথ (করিডোর) হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। এখানকার জলাভূমি ট্রান্স-অস্ট্রেলেশিয়া ফ্লাইওয়ের অন্তর্গত হওয়ায় অনেক পরিযায়ী পাখির খণ্ডকালীন আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার হয়। এ ছাড়াও এই বনভূমি আরও কয়েকশ' দেশীয় পাখিসহ (রেসিডেন্ট বার্ড) অসংখ্য সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। রোহিঙ্গারা বনভূমি উজাড়ের কারণে এসব প্রাণী চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অবস্থান হাতি করিডোরের একেবারে মাঝখানে। যার ফলে পরিযায়নের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টেকনাফ অঞ্চলে প্রায় ৪০টি হাতি আটকা পড়েছে। তাদের অবস্থা খাবারের অভাবে খুবই শোচনীয় হয়ে পড়েছে। হাতির আক্রমণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এ পর্যন্ত ১৫ জন শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে।

অন্যদিকে পাহাড় কেটে ঘর বানানো ও উপরিভাগের মাটি সরিয়ে সমতল করার কারণে বিশাল এলাকার ভূ-প্রকৃতিগত পরিবর্তন হচ্ছে। যার ফলে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া ও মাটি আলগা হয়ে বর্ষাকালে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, যা প্রতি বছর বেড়ে চলেছে। পাহাড়ি ধসে ২০১৯ সালে ৩ সহস্রাধিক রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে ও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। বহুমাত্রিক প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মধ্যে অবস্থিত হওয়ার কারণে এই পাহাড়ি বন্য প্রতিবেশ ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ধস ও বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবেলা করে দীর্ঘকাল টিকে আছে। রোহিঙ্গাদের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবেলায় বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ কিছু দেশি-বিদেশি সংস্থা খালি ও পরিত্যক্ত জায়গায় গাছের চারা রোপণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমির তুলনায় অপ্রতুল।

উখিয়া ও টেকনাফ এলাকাকে জাতীয় প্রতিবেশ বিপর্যয়পূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

পরিবেশবিদ
shahadbd@yahoo.com