আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

মোহাম্মদ আলী শিকদার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় উদ্যোগটিও ব্যর্থ হলো। যে কারণে ব্যর্থ হলো তাতে বলা যায়, প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এক প্রকার দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার মধ্যে পড়ে গেল। তাই এর পরিণতি কী হতে পারে তা নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চল এবং বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে ভাবতে হবে। কথায় আছে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গা সংকটের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর গভীরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও এই সমস্যাটি অনেক অনেক পুরনো। তবে বাংলাদেশ এর সঙ্গে ১৯৭৮ সাল থেকে জড়িয়ে পড়েছে। ১৯৭৮ থেকে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সরকার যখন ছিল তারা সমস্যাটি এত বড় সংকটে পরিণত হবে তা আঁচ করতে পেরেছিল কি-না সে প্রশ্নটি সবসময় আমার মনে জাগ্রত হয়। তবে এই সমস্যা মোকাবেলায় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগের যথার্থতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু এর আগে জোরালো উদ্যোগের যেমন অভাব ছিল, তেমনি সরকারভেদে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও ছিল অনেক।

১৯৭৮ সাল থেকে জিয়া, এরশাদ এবং পরবর্তীকালে বিএনপি-জামায়াত সরকার সমস্যাটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার কারণে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বাংলাদেশের ওপর এসে পড়ে, যার সুযোগ নেয় রোহিঙ্গারা এবং এর জের ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার পূর্বের সরকারের তৈরি তুষের আগুনকে ২০১৭ সালের আগে গুরুত্ব না দিলেও পরে সমস্যাটিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ জাতিগত বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে এবং মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে মাত্র। ফলে পুরো বিশ্ব বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছে। সমস্যা সমাধানে সফল হতে হলে আত্মপর্যালোচনা ও আত্মসমালোচনা দরকার। আমাদের বোঝা উচিত ছিল এবং এখনও বুঝতে হবে, মিয়ানমার রাষ্ট্র চালায় সে দেশের সেনাবাহিনী। তাদের কাছে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা ও উন্নতির চেয়ে ক্ষমতায় থাকা জরুরি।

দ্বিতীয় উদ্যোগটি ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে সমস্যাটি যেদিকে ধাবিত হতে পারে তাতে যে ধরনের নিরাপত্তার সংকট সৃষ্টি হবে, তার প্রথম ও প্রধান শিকার হবে মিয়ানমার। মিয়ানমারকে উপলব্ধি করতে হবে বাংলাদেশে অবস্থানকারী প্রায় ১২ লাখ এবং আরও প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠীকে অন্যায়ভাবে সামরিক শক্তির দ্বারা উৎখাত করে সেই রাষ্ট্র শান্তিতে থাকবে তা ভাববার কোনো কারণ নেই, উদাহরণও নেই। পূর্বে যা ঘটেছে তা একটি অন্য অধ্যায়। গত ১০ বছরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বাংলাদেশের ভূমি থেকে সমূলে উৎখাত করে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের মাটিতে অন্য কোনো দেশের সশস্ত্র বিদ্রোহী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়া হবে না।

রাখাইন অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারের যেসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে, তার সবকিছুর একটা স্থায়ী সমাধান মিয়ানমার করতে পারত এবং এখনও পারে, যদি তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর সেই আস্থা রাখে। ১২ লাখ নিপীড়িত, নির্যাতিত চৌদ্দপুরুষের ভিটামাটি থেকে উৎখাত হওয়া ক্ষুব্ধ মানুষ, যার মধ্যে উঠতি বয়সী ও যুবক শ্রেণির সংখ্যা হবে এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ প্রায় আড়াই-তিন লাখ। বিপর্যয়ের পরিণতিতে এরা প্রত্যেকেই হয়ে উঠতে পারে একেকটি স্বতন্ত্র বোমা। হতাশ ও সর্বহারা মানুষের পক্ষে অনেক কিছুই করে ফেলা সম্ভব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যত যাই হোক, বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থেই কখনও জঙ্গি, সন্ত্রাসী বা অন্য দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না। এ ব্যাপারে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। কিন্তু এত বিশালসংখ্যক উদ্বাস্তু জনসংখ্যা, যেখানে দেশ-বিদেশের অসংখ্য এনজিও এবং বহু পক্ষ সঙ্গত কারণেই জড়িত, সেখানে বাংলাদেশ সরকারের শতভাগ সদিচ্ছা থাকলেও সব অপতৎপরতা ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, সম্ভব নয়। সুতরাং মিয়ানমারের যদি শুভবুদ্ধির উদয় না হয় তাহলে কোনো দিনও মিয়ানমারে শান্তি আসবে না, আসতে পারে না। মিয়ানমারের পরেই সঙ্গত কারণে বাংলাদেশ আজ বহুমুখী নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

প্রত্যাবাসন নিয়ে তোড়জোড়ের মধ্যে ২২ আগস্টেই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা কক্সবাজারের এক যুবলীগ নেতাকে হত্যা করেছে। রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে বাংলাদেশের ওপর অভিঘাতের স্বরূপ বহুমুখী। ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে মানব পাচারসহ ড্রাগ ও অস্ত্র চোরাচালানের বিস্তার ঘটছে ভয়াবহভাবে। বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো ধর্মীয় উন্মাদনায় উদ্বুদ্ধ করে রোহিঙ্গা যুবকদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা সবাই জানেন। ক্যাম্পের ভেতরে স্বার্থান্বেষী এনজিও, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ড্রাগ, মানব ও অস্ত্র পাচারের গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিতে পারলে এক সময়ে সেটি বাংলাদেশের জন্য আরও বড় নিরাপত্তার সংকট সৃষ্টি করবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, চীন ও ভারত ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে, তারা রাখাইন অঞ্চলে যেসব অবকাঠামো তৈরি করছে তার নিরাপত্তা সবসময় হুমকির মধ্যে থাকবে। চীন তো ইতিমধ্যেই তার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং প্রদেশে ইসলামিস্ট উগ্রবাদীদের নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় আছে। ধর্মীয় উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের তৎপরতার ডমিনো প্রভাবে রোহিঙ্গা সংকট চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও বর্ধিত নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে ফেলবে। তাছাড়া সব পক্ষের মধ্যে একটা ধারণা জন্মেছে, এই সমস্যা সমাধানে চীন যথেষ্ট করছে না। ভারতের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

ভারত এমনিতেই কাশ্মীর ও পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সন্ত্রাসীদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের মধ্য থেকে জঙ্গি-সন্ত্রাসী জন্ম হওয়া এবং তাদের কাশ্মীর ও পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়, ডমিনো প্রভাবের কথা আগেই বলেছি। তাছাড়া কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো থেকে সন্ত্রাসীর উৎপত্তি ঘটলে তার থাবা থেকে চীন-ভারত কেউ-ই মুক্ত থাকবে না। সুতরাং রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো অঞ্চল ভয়াবহ নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল; রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্নেষক
sikder52@gmail.com