রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে থাকবে

চলমান রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে আসার দুই বছর হয়ে গেল দেখতে দেখতে। অবশ্য ২০১৭ সালের আগস্টে তারা প্রথম এসেছে, এমন নয়। সত্তরের দশক থেকেই বিভিন্ন সময়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম-সংলগ্ন ওই রাজ্য থেকে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পেরিয়ে এসেছে। সর্বশেষ দফায় যত সংখ্যক এসেছে, তা নিঃসন্দেহে আগের তুলনায় বেশি। সব মিলিয়ে কমবেশি ১১ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখনও বাংলাদেশে রয়ে গেছে।

শরণার্থী হিসেবে ১১ লাখ মোটেই কম নয়। সিরিয়া থেকে জার্মানিতে যাওয়া শরণার্থীদের নিয়ে বিশ্বব্যাপী এত আলোচনা, সেই সংখ্যা কিন্তু সব মিলিয়ে সাত লাখ। এ থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা কত বেশি। অন্য যে দিকটা বিবেচনা করা জরুরি, তা হচ্ছে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য। আমাদের সীমিত ভূমির কথাও মনে রাখতে হবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে জনসংখ্যা এত কম যে, অনেক ক্ষেত্রে তারা শরণার্থীদের আগমনকে 'আশীর্বাদ' হিসেবে গ্রহণ করে তাদের জনসংখ্যার ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য। কিন্তু আয়তনের দিক থেকে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই জনসংখ্যার ভারে নত। ঘনবসতির কারণে আমাদের বনভূমি ও কৃষিজমি ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। সেখানে নতুন করে ১১ লাখ মানুষের আশ্রয় দেওয়া সত্যিই কঠিন ব্যাপার। ভাবতে হবে আমাদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথাও।

এতসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে যে উদার মনোভাব দেখিয়েছেন, তা বিরল। তার এই মানবদরদি অবস্থান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। মুশকিল হচ্ছে, বাংলাদেশ চাইলেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনির্দিষ্টকালের জন্য আশ্রয় দিতে পারবে না। এই বিপুল মানুষের আশ্রয় ছাড়াও খাদ্য, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদা পূরণ আরও কঠিন ব্যাপার। এদিকে আমরা দেখছি, মিয়ানমার সরকার তাদের ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নিয়েছে। তৈরি করছে নানা জটিলতা। রোহিঙ্গারা বন্যার স্রোতের মতো এসেছিল, ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুনে গুনেও পাঠানো যাচ্ছে না।

মনে রাখতে হবে- যত দিন যাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ ততই বাড়তে থাকবে। ইতিমধ্যে আগে থেকে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা বৃহত্তর চট্টগ্রামের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বুনট নাজুক করে তুলেছে। তাদের বিরুদ্ধে উঠছে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত নানা অভিযোগ। এমনকি বিদেশেও বাংলাদেশের জনশক্তির বাজারে রোহিঙ্গারা পরিচয় গোপন করে ভাগ বসিয়েছে। তাদের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে আমাদের। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘায়িত হবে, এই পরিস্থিতি তত গুরুতর হতে থাকবে।


রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হয়তো রোহিঙ্গাদের সরাসরি ভোটার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ নেই। কিন্তু কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বা স্থানীয় নেতারা তাদের ভোটার তালিকাভুক্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে- এই খবর পত্রপত্রিকায় এসেছে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে 'লাঠিয়াল' হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। কেবল এখানে নয়, যে কোনো দেশেই শরণার্থীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে একটি মহল এমন নানা বেআইনি কাজে ব্যবহার করে থাকে। এমনকি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো রোহিঙ্গাদের দলে ভেড়াতে পারে- এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না।

স্বীকার করছি, একাত্তরে আমরাও এভাবে শরণার্থী হয়ে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা গিয়েছিলাম স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের শক্তি অর্জন করতে। প্রথম সুযোগেই তাই সবাই মুক্ত বাংলাদেশে ফিরে এসেছি। রোহিঙ্গারা তো লড়াই করতে সাময়িকভাবে আসেনি। সেই বাস্তবতাও নেই। কিন্তু তারা ফেরত যেতে চাইছে না এবং বাংলাদেশের জন্য সেটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছে, এটাই চরম বাস্তবতা।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কম নয়। কোনো একটি সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, গত দুই বছরের এই শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকারের ৭২ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। তার মানে, বছরে কমবেশি ৩৬ হাজার কোটি টাকা। খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই হিসাব দিয়েছেন। এই অঙ্ক কিন্তু মোটেও কম নয়। আমরা দেখেছি, হাতিয়ার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা আবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নির্মিত হয়েছিল অবকাঠামো। কিন্তু তারা সেখানে যেতে আগ্রহী নয়। এখন আরাকানে ফেরত যেতেও তারা কিছু শর্ত দিয়েছে। হতে পারে, এসব শর্ত যুক্তিযুক্ত। নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীর প্রতি আমাদের সহমর্মিতা ও সমর্থনও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি বছরে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচের সামর্থ্য রাখে?

এখনও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রাণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, যত দিন যাবে এই সহায়তা কমতে থাকবে। সীমিত হয়ে আসতে থাকবে প্রকল্প ও অনুদানের পরিধিও। এই দফার আগে যে রোহিঙ্গারা এসেছিল, তাদের ক্ষেত্রেও আমরা একই ঘটনা ঘটতে দেখেছি। ধীরে ধীরে ত্রাণ সহায়তা কমে এসেছে। আবার বেশি দিন চলে গেলে অস্থায়ী শিবির থেকে নানাভাবে বের হয়ে মূলধারার জনগোষ্ঠীর মধ্যে মিশেও গেছে অনেকে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে এমন সময় এসে আশ্রয় নিয়েছে, যখন আর্থসামাজিকভাবে আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তকমা ঝেড়ে ফেলতে যাচ্ছি, যখন আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উত্তরিত হতে পেরেছি। যখন আমাদের সামনে রয়েছে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা। এ অবস্থায় আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অন্তত ১১ লাখ মানুষের বাড়তি চাপ কোনোভাবেই সহনীয় হতে পারে না। এই চাপে যদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সূচকে পিছিয়ে যেতে হয়, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে?

অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, পিকেএসএফ