রাজধানী স্থানান্তরেই সমাধান

যাপিত জীবন

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ড. হারুন রশীদ

একটি দেশকে যদি মানবদেহের সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে তার মুখ হচ্ছে রাজধানী। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- শরীরের সমস্ত মাংসপিণ্ড মুখে চলে আসার নাম স্বাস্থ্য নয়। তেমনি ঢাকাতেই সমস্ত উন্নয়ন হওয়ার নামও উন্নয়ন নয়। আসলে মুখই বলে দেয় সার্বিক অবস্থার কথা। রাজধানী শহর যদি অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠে, নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন থাকে, তাহলে সে দেশের অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। দুঃখজনক হচ্ছে, আমরা এমন একটি বাস্তবতার মধ্যে রয়েছি, যেখানে রাজধানী ঢাকার অবস্থা নানা দিক থেকেই সঙ্গিন। রাজধানীজুড়ে পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। ফলে দিন দিন মৃতপ্রায় শহরে পরিণত হচ্ছে প্রিয় ঢাকা।

বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর অন্যতম। দখল-দূষণে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর করুণ অবস্থা। এ ছাড়া যানজট, যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, ট্যানারির বর্জ্য, খাদ্যে ভেজাল, সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিম্নমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ এ শহরে নেই পয়ঃনিস্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। সে তুলনায় রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি ইত্যাদি নাগরিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ রাজধানী ঢাকাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।

দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ এখন শহরে বাস করছে। এ জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। বস্তুত এ শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। যত্রতত্র যে যেখানে পারছে, যে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এতে নগরী তার বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এক জগাখিচুড়ি অবস্থায় রাজধানীবাসী এখানে বাস করছে। ফলে অনেক নাগরিক সুবিধা থেকেই তারা বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এ নগরী নরকতুল্য। খেলার মাঠ নেই; নেই জলাশয়। সবুজ গাছগাছালির দেখা মেলাও ভার। অথচ ঢাকার রয়েছে চারশ' বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্য। ঢাকা শুধু একটি শহর নয়। এর রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। হারিয়ে যাওয়া সেসব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। ঢাকাকে বাসোপযোগী নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

দুই.

ঢাকা শহরের প্রায় সব এলাকায়ই শব্দ গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি। আর এ শব্দদূষণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি লোপ পেয়েছে, যার মধ্যে ২৬ শতাংশই শিশু। আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। শব্দদূষণ নিয়ে কম কথা হয়নি। বাস্তবতা হচ্ছে, দূষণ কমা দূরের কথা বরং দিন দিন তা বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় শব্দদূষণ বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই।

শব্দদূষণ বন্ধে ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- সরকারি ও বেসরকারি অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে যথাযথভাবে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ বাস্তবায়ন, বিধিমালার সংজ্ঞা অনুযায়ী চিহ্নিত জোনগুলোয় (নীরব, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও মিশ্র) সাইনপোস্ট স্থাপন, শব্দের মানমাত্র অনুযায়ী যানবাহনের ছাড়পত্র দেওয়া, হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধ, হর্ন বাজানোর শাস্তি বৃদ্ধি ও চালকদের শব্দ সচেতনতার স্তর যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান, গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি, জেনারেটর এবং সব ধরনের যন্ত্রপাতি ও মেশিনের মানমাত্রা নির্ধারণ, শব্দের মানমাত্রা হ্রাসে পদক্ষেপ গ্রহণ, শিল্প কারখানা স্থাপনে ছাড়পত্র প্রদান না করা, অনুমতি ছাড়া সভা-সমিতিসহ যে কোনো অনুষ্ঠানে মাইক বাজানো নিষিদ্ধ, কমিউনিটিভিত্তিক কমিটি করে শব্দদূষণ সংক্রান্ত আইন ভঙ্গের বিষয়ে তদারকির দায়িত্ব প্রদান, সর্বসাধারণের মাঝে শব্দদূষণের ক্ষতি-প্রতিকার এবং বিদ্যমান আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এদিকে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো হলে গাড়িসহ তা জব্দের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এর পরও হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো বন্ধ হচ্ছে না।

তিন.

রাজধানীকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়। আসলে সেটিই হওয়ার কথা। যেখান থেকে দেশ পরিচালনা করা হয়, প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা হবে সব দিক থেকেই রুচিশীল, উন্নততর, নান্দনিক, বাসোপযোগী। কিন্তু শহরের ব্যয় দিন দিন বাড়লেও সে অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না। বরং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলায় যানজটে স্থবির হয়ে থাকছে ঢাকা। মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটসহ নানামাত্রিক উন্নয়নকর্ম ঘিরে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। অথচ নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়ার মতো প্রশস্ত রাস্তা ও জায়গা নেই ঢাকায়। তাই ঢাকাকেন্দ্রিক আর কোনো প্রকল্প না নেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কথা ভাবা হচ্ছে জোর দিয়ে। পূর্বাচলের মতো বৃহৎ ও পরিকল্পিত নগরী দ্রুত বাস্তবায়ন করেও ঢাকার ওপর চাপ কমানো যায়। মালয়েশিয়া প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়াতে সরিয়ে নিয়েছে। আমরা কেন পারব না? আমরা তো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশও জয় করেছি।

সাংবাদিক, কলামিস্ট
harun_press@yahoo.com