এক অনন্য ব্যক্তিত্ব

স্মরণ

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

এক অনন্য ব্যক্তিত্ব

অধ্যাপক মোহাম্মদ নোমান [১৯২৮-১৯৯৬]

পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যাদেরকে চেনা-জানার জন্য প্রত্যক্ষ পরিচয়ের দরকার নেই। না, আমি কোনো দেশবরেণ্য নেতা, যশস্বী সাহিত্যিক বা দর্শক-শ্রোতানন্দিত শিল্পীর কথা বলছি না। আমি বলছি একজন শিক্ষিত ও শিক্ষানুরাগী নীতিনিষ্ঠ এবং আদর্শলগ্ন অধ্যাপকের কথা। শিক্ষিত হলেই যে শিক্ষানুরাগী হবেন- এমন কথা আমাদের সমাজের জন্য প্রযোজ্য হবে না। কারণ এখানে সিংহভাগ শিক্ষিতের জন্য বিদ্যা বিত্ত অর্জনের মাধ্যম মাত্র। আমি যে অধ্যাপকের কথা বলছি, তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও শিক্ষানুরাগী। উল্লেখ্য, হরহামেশা কাগজের খবর হওয়ার মতো অধ্যাপকও তিনি ছিলেন না। কিন্তু তিনি পরিচিত ছিলেন। পরিচিতজনের অন্তরে তিনি শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, প্রয়াণের পর আছেন এবং থাকবেন।

আমি বলছি অধ্যাপক মোহাম্মদ নোমানের কথা। তার সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল না। তবে তাকে আমি চিনতাম; জানতামও। খুব সম্ভব তিনি আমাকে চিনতেন না। চেনার কথাও নয়। কারণ প্রজন্মের ব্যবধান। উপরন্তু আমি চেনার মতো কেউ নই। তবে পরিচয়হীন হলেও তাকে যে চিনতাম, শ্রদ্ধা করতাম, তার বেশ কিছু  কারণ ছিল।

প্রথম কারণ বোধ হয় অধ্যাপক নোমান ও আমার পেশার মধ্যে অভিন্নতা। অভিন্ন পেশার খ্যাতিমান কারও প্রতি নৈকট্যের অনুভব সহজাত। তবে এই অনুভব সৃষ্টির পেছনে অধ্যাপক নোমানের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের কিছু স্বাতন্ত্র্য দায়ী ছিল। পেশায় শিক্ষক হলেই যে যথার্থ শিক্ষক পদবাচ্য কেউ হবেন, এমন ধারণায় আমি অবিশ্বাসী। কারণ, যারা শিক্ষকতাকে নিছক একটি চাকরি হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সেভাবেই পেশাজীবন অতিবাহিত করেন, তাদেরকে শিক্ষক বলতে আমি নারাজ। তারা শুধু চাকরিই করেন। অন্যদিকে যারা শিক্ষকতার সঙ্গে নিরন্তর জ্ঞানার্জন ও নীতিনিষ্ঠার সম্মিলন করেন, তারাই শিক্ষক পদবাচ্য। অধ্যাপক নোমান ছিলেন এই সংজ্ঞার অনুরূপ শিক্ষক। আর সে কারণেই তাকে চিনতে বাধ্য হয়েছিলাম। তবে তার সম্পর্কে জেনেছি তার যারা ছাত্র ছিলেন তাদের কাছ থেকে। এদের অনেকেই আবার আমার শিক্ষক। শিক্ষকতায় তার অভিজ্ঞতা ছিল বিচিত্র ও সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজে কেটেছে তার শিক্ষকতা জীবন। তবে তার পেশাগত জীবনের সূচনা ও সমাপ্তি দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে তার জীবন শুরু হয়েছিল; আর শেষ হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে। লক্ষণীয়, শিক্ষাদান পেশার সঙ্গে তার জীবনে যুক্ত হয়েছিল শিক্ষা-প্রশাসন পেশার। বলা বাহুল্য, এ দুটি সংলগ্ন পেশার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা ও সাফল্য ছিল অবিসংবাদিত। উপরন্তু বছরখানেকের মতো জাতির শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বলা বাহুল্য, এই দায়িত্ব বেশ জটিল ও কঠিন। বলতে গেলে, এমনি একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক প্রশাসনিক দায়িত্ব সচিবকেই পালন করতে হয়। শিক্ষাদানে এবং শিক্ষা প্রশাসনে সাফল্য ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। পুরস্কার স্বীকৃতির সূচক। কিন্তু আমাদের দেশে এমন স্বীকৃতি প্রায়শ যথার্থ হয় না বলে অভিমত চালু আছে বা সঠিক ব্যক্তিও পুরস্কৃত হন না। পুরস্কারের রাজনীতি-কূটনীতি আছে। তবে কিছু ব্যতিক্রম যে হয় না, তা নয়। এমনি একটি ব্যতিক্রম অধ্যাপক নোমানের ক্ষেত্রে হয়েছিল বলে আমার বিশ্বাস। তার জন্য পুরস্কার বা স্বীকৃতি উভয়ই যথার্থ ছিল। এ জন্য অবশ্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে  সাধুবাদ দিতেই হয়।

অধ্যাপক নোমানকে চেনার দ্বিতীয় কারণটি ছিল তার ন্যায়নিষ্ঠতা ও সততার মিশেল দিয়ে তৈরি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। এখানেও স্বীকার করছি যে, তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমার জানাশোনার উৎস তার প্রত্যক্ষ ছাত্রদের অভিজ্ঞতা। শিক্ষক যদি মানুষ গড়ার কারিগর হন, তবে তাকে শুধু জ্ঞানের আধার নয়, একজন যথার্থ মানুষও হতে হবে। যে মানুষের মধ্যে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতা নেই, তিনি বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত হলেও মানুষ গড়ার কারিগর হতে পারেন না। তার পরিচিতি শুধু মুদ্রিত হরফের মধ্যেই সীমিত থাকবে; তিনি মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারবেন না। অধ্যাপক নোমান যে যথার্থই শিক্ষক ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো আমি তার প্রত্যক্ষ ছাত্র বা ঘনিষ্ঠজন না হওয়া সত্ত্বেও তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এ লেখা লিখছি।

অধ্যাপক নোমানকে চেনার তৃতীয় কারণটি হলো তার ব্যক্তিত্বে পাণ্ডিত্য ও বিনয়ের সংমিশ্রণ। আমাদের বিদ্বৎ সমাজে পণ্ডিতম্মন্য ব্যক্তিত্বের ভিড়ে অধ্যাপক নোমান ছিলেন উজ্জ্বল এক ব্যতিক্রম। আমাদের সংসারে জ্ঞান, বিনয়, ন্যায়নিষ্ঠতা ও কর্তব্য-কর্মে দক্ষতার অপূর্ব সংমিশ্রণ সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্ব বিরল। কিন্তু অধ্যাপক নোমান সম্পর্কে আমার যতটুকু জানার সুযোগ হয়েছে তার ভিত্তিতে যথেষ্ট প্রতীতি নিয়ে বলতে পারি, তিনি ছিলেন এমন একটি বিরল ব্যক্তিত্ব। সুতরাং তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই বিরল সুযোগ গ্রহণ করতে পেরে আমি গর্ব বোধ করছি।

ইতিহাসবিদ ও সাবেক মহাপরিচালক
বাংলা একাডেমি