কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের চ্যালেঞ্জ

সমাজ

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০১৯      

গোলাম মোরশেদ

গত কয়েক দশকে নারী শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানে বেশ সুনাম অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৮ অনুযায়ী দেশে নারী শিক্ষার হার ৬৩.৪ শতাংশ। ২০১৮ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিট ভর্তির হার ছিল ৯৮.৭ শতাংশ, যেখানে নিট ছাত্রীর হার ছিল ৯৯.৪ শতাংশ। ২০১২ সালের দিকে প্রাথমিকে মেয়েদের পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার হার ছিল ২৪.২০ শতাংশ, যা ২০১৫ সালে হ্রাস পেয়ে ১৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১০ সালের পর কারিগরি শিক্ষাতেও নারীদের ৪৪ শতাংশ উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে কর্মক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের 'জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্স-২০১৮' অনুযায়ী লিঙ্গীয় সমতায় বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে এবং সব দেশের মধ্যে ৪৮তম। গত তিন বছর ধরেই বাংলাদেশ এই অবস্থান ধরে রেখেছে। গত কয়েক দশকে সব ক্ষেত্রে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ, প্রচেষ্টা ও সফলতা এই অগ্রগতি সম্ভব করেছে। ফলত বাংলাদেশ এখন বিশ্ব নারী ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। সরকার এ লক্ষ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষত গত এক যুগে বাংলাদেশ সরকার নারীর উন্নয়নে বেশ কিছু নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ সব কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণকে পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। গত দশকে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত গুরুত্ব পেয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের পদায়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীর ২৭ শতাংশ নারী। উদ্যোক্তা হিসেবেও নারীদের উপস্থিতি নজর কেড়েছে বিশেষত অনলাইন ব্যবসায়। কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষতাতেও পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বিভিন্ন খাতে নারীর উপস্থিতি বাড়ছে। ১৯৭৪ সালে যেখানে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, সেখানে ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৬.৩ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের (৩৫ শতাংশ) চেয়ে তা বেশি এবং এই পরিবর্তন কর্মসংস্থানে পুরুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত। তবে নারীর অংশগ্রহণের হার নগরের (৩০.৮) তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় (৩৭.৬) বেশি। শুধু পোশাক শিল্পে নয়, সমসাময়িক বিভিন্ন পেশা, যেমন- হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, রিয়েল এস্টেট সার্ভিস, টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্সসহ বিভিন্ন খাতে নারীদের দেখা যাচ্ছে। মোটর ড্রাইভিং থেকে বিমান পরিচালনা পর্যন্ত সব খাতে নারীদের উপস্থিতি বাড়ছে।

তবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও অপ্রতুল। এখনও নারীদের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত কৃষি। আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বর্তমানে ৮.২ শতাংশ, যা পুরুষের তুলনায় অর্ধেকেরও কম, আর অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের হার ৯১.৮ শতাংশ, যা পুরুষের চেয়ে সামান্য বেশি। আবার অল্প মজুরিতে কাজ করছে এমন পরিসংখ্যানে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি। এছাড়া ২৯.৮ শতাংশ কর্মক্ষম ব্যক্তি শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছে (যারা শিক্ষা, কাজ কিংবা প্রশিক্ষণ কোথাও নেই), যার ৮৭ শতাংশই নারী। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজেরিয়াল পর্যায়ে এখনও নারীদের উপস্থিতি অনেক কম। বিআইএসআরের সাম্প্রতিক আরেক গবেষণায় দেখা যায় যে, শিল্প কারখানায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় এমন পদগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও পুরুষের তুলনায় এখনও অনেক কম। শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও ফলাফলে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নারীরা পুরুষের তুলনায় এগিয়ে। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় চিত্রটা বিপরীত দেখা যায়। উচ্চ মাধ্যমিকের পর শিক্ষার হার কমে নারীরা পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। আর সবচেয়ে বেশি ভিন্ন চিত্র রয়েছে কর্মসংস্থানে।

বাংলাদেশে নারীদের কর্মসংস্থানের অন্যতম খাত হলো তৈরি পোশাক শিল্প। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ নারী কর্মী রয়েছে, যেখানে পুরুষের সংখ্যা মোট শ্রমিকের ১০ শতাংশের কম। উল্লেখ্য, এই বিশাল সংখ্যক নারীর বেশিরভাগ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে এবং স্বল্প পরিমাণে সুপারভাইজর কিংবা ঊর্ধ্বতন পদে রয়েছে। অথচ ঊর্ধ্বতন পদে পুরুষের হার অনেক বেশি। আবার এসব শিল্পে যেখানে নারী উদ্যোক্তা রয়েছে, সেখানে নারীদের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। আবার সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে, প্রযুক্তিচালিত পেশাগুলোতে এখনও নারীর হার পুরুষের তুলনায় কম। তবে যেটি যাচাই করা দরকার তা হচ্ছে, প্রযুক্তি শ্রমিকের স্থান দখল করে নিলেও নারী শ্রমিকের স্থান দখল করে কি-না। শিক্ষিত বেকারত্বের হারেও পুরুষের তুলনায় নারী বেশি। বাল্যবিয়ের কারণে অনেক নারী যোগ্যতা সত্ত্বেও শ্রমবাজারে আসতে পারছে না। অনেকে পারিবারিক চাপে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সন্তানধারণের জন্য শ্রমবাজার থেকে সরে যাচ্ছে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এখনও বাল্যবিয়ের হার ৫৯ শতাংশ এবং ৩৩ শতাংশ নারী ১৯ বছর বয়সের আগে সন্তান জন্মদান করছে, যা শুধু নারীদের শ্রমবাজার থেকে দূরে ঠেলছে তা নয়, একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতাও বাড়িয়ে দিতে পারে। একজন পুরুষকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য পরিবার ও সমাজ যতটুকু সমর্থন করে, একজন নারীকে করে না। জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা দাবি করে যে, দেশে উদ্যোক্তাদের মাত্র ১০ শতাংশ নারী।

[email protected]

গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ (বিআইএসআর) ট্রাস্ট