বঙ্গবন্ধুর ফটোগ্রাফার

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০১৯      

মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টু

সময়টা ছিল ব্রিটিশ ভারতের শেষ দিক। রয়্যাল এয়ারফোর্সে ছোট একটা চাকরির সুবাদে একদিন এক বৈমানিক বললেন, তোমার ধুতি-পাঞ্জাবিটা পরে একটা ছবি তুলতে চাই। আর ছবিটা তুলবে তুমি- বলে তার ১২৭ বেবি ব্রাউনি ক্যামেরাটা তুলে দিলেন ১৬ বছরের এক উদ্দাম যুবকের হাতে। কোনো ইংরেজ সাহেবকে সরাসরি না বলার দুঃসাহস কোনো বাঙালির ছিল না। অথচ দৃঢ়চেতা যুবকটি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, 'আমি আমার ধুতি-পাঞ্জাবি দিতে পারি; কিন্তু ক্যামেরা তো চালাতে জানি না। বৈমানিক তাকে ক্যামেরা চালানের কৌশল শিখিয়ে দিলেন। যুবকটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চমৎকার ছবি তুললেন। তখনকার অ্যানালগ ক্যামেরায় সাদা-কালো ছবি তোলার জন্য ক্রিটিক্যাল শার্পনেস ও ভালো কম্পোজিশন ছিল অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই যুবক ফটোগ্রাফিক নিজের ধ্যান ও জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্থানে ধারণ করে কিনে ফেলেন ১২০ আগফা বক্স ক্যামেরা। এ সময় তিনি রাজশাহী শহরে অবস্থান করেন। একই সঙ্গে স্টুডিও ফটোগ্রাফি ও প্রেস ফটো কাভারেজের কাজ করে প্রশংসিত হন। অসহায়-গরিব ছাত্রদের কাছ থেকে তিনি ছবির বিনিময়ে কোনো টাকা নিতেন না। রাজশাহী শহর কিংবা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বড় কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা হলেই ডাক পড়ত লুৎফর রহমানের। ষাটের দশকের প্রথমার্ধে তিনি রাজশাহীর বিশিষ্ট নাগরিকদের সান্নিধ্যে আসেন। তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। উত্তরবঙ্গের এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাকালীন দুর্লভ সব ছবির কারিগর ছিলেন এই প্রথিতযশা আলোকচিত্রশিল্পী। ১৯৫৪ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজশাহী সফরে এসে প্রথমবারের মতো লুৎফর রহমানের ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি হন। এভাবেই বাঙালি জাতির ইতিহাসের একেকটি কালজয়ী মুহূর্ত চিত্রিত করতে থাকেন এই গুণী শিল্পী। বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে গর্জে উঠেছে তার ক্যামেরা ফ্লাশ। ছয় দফা আন্দোলনের পর লুৎফর রহমানের ভাবনায় আসে জাতীয় পর্যায়ের সব ঘটনাকে তিনি চিত্রিত করবেন। এই মানসে তিনি রাজশাহী থেকে ঢাকা চলে আসেন। বঙ্গবন্ধুর তোলা ছবিগুলো নিয়ে সরাসরি হাজির হন বাঙালির স্বাধীনতা, স্বকীয়তা রচনার লেখক জাতির পিতার সামনে। বঙ্গবন্ধু সেদিন খুব খুশি হয়েছিলেন আর বলেছিলেন চালিয়ে যেতে। এর পর চালিয়ে গেলেন লুৎফর রহমান তার ক্যামেরা। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ৭ মার্চ ১৯৭১-এ ঐতিহাসিক ভাষণ, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান, ৭২-এ বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরাসহ অনেক দুর্লভ ও ঐতিহাসিক ছবি তুলে নিজেও ইতিহাসের অংশে হয়ে গেছেন এই ক্যামেরাম্যান। ১৯৭২ সালে ৫ টাকা, ১০ টাকার নোটে বঙ্গবন্ধুর ছবি সংযোজনের জন্য যে চিত্র গ্রহণ করা হয়েছিল, তাতে লুৎফর রহমান স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ৩২নং ধানমন্ডির বাড়িতে তোলা বঙ্গবন্ধুর ছবিটি শোভা পাচ্ছে এই মুদ্রাগুলোতে।

বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য জাতীয় নেতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক সংগঠকেরও ছবি তুলেছেন এই গুণী শিল্পী। এসব প্রদর্শিত হচ্ছে মিরপুরের টাকা জাদুঘরে। তার সৃষ্টিকর্ম এখনও উজ্জ্বল হয়ে শোভা পাচ্ছে ৩২নং ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে, বাংলাদেশ সচিবালয়ের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যালকনিতে। শুধু ক্যামেরাই নয়; কলম হাতেও সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করে লিখেছেন কবিতা 'চিরঞ্জীব'। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু খুশি হয়ে তাকে ম্যাট-১২৪ জি ক্যামেরা উপহার দেন।

সদা হাস্যোজ্জ্বল, বিনয়ী, সৎ এই মানুষটি আজীবন দেশের জন্য কাজ করেছেন। নির্লোভ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মুক্তিযুদ্ধকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন; মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন এই গুণী আলোকচিত্রী। জীবদ্দশায় কখনও কোনো অন্যায়, অসত্য ও সুবিধাবাদের সঙ্গে আপস করেননি। অনেকেই মনে করেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য তিনি তার উপযুক্ততা প্রমাণ করেছেন। এখন তার কাজের স্বীকৃতির প্রত্যাশা এই পরিবারের সদস্যদের।

ফটো সাংবাদিক