সুন্দরের বন্ধন নিষ্ঠুরের হাতে

সমাজ

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯

জয়া ফারহানা

মানুষে মানুষে ভেদাভেদের পাহাড় তৈরিতে অবৈধ টাকার দাপট এবং আগ্রাসী পুঁজিবাদী অর্থনীতির যে ভূমিকা; সাংস্কৃতিক বিভাজনের ভূমিকা তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কখনও মনে হয়, সংস্কৃতির ভূমিকাটাই বেশি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক আমাদের আর মাতাল রাজ্জাক, জালালউদ্দিন খাঁ, বিজয় সরকার, বীরভদ্র তোমাদের; হামিদুর রহমানের 'পুনর্জাগরণ', দেবদাস চক্রবর্তীর 'হাসপাতালের সম্মুখে মৃত্যুর সারি', কামরুল হাসানের 'স্নান' কিংবা মুর্তজা বশিরের 'প্রাচীর আমাদের'- এই বোধও এক ধরনের বর্ণবাদ। কখনও সবচেয়ে বর্ণবাদ, যা শ্রেণির বিভক্তিকে জিইয়ে রেখেছে। কেউ বলতে পারেন, শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে সর্বজনীন সংস্কৃতি বা সর্বজনীন শিল্পাদর্শ বলে কিছু থাকবে কীভাবে? রবীন্দ্রনাথও হয়তো ওই একই ভাবনা থেকে বলেছেন, 'এমন কোন উপায় নাই যা দিয়ে একই পথে সমস্ত দেশকে অনুপ্রাণিত করা যায়। কিন্তু তা বলে মনের মধ্যে এমন ভাব রেখো না যে ওরা গ্রামের মানুষ, ওদের জন্য যে কোন একটা গেঁয়ো ব্যবস্থা করলেই চলবে।' প্রশ্ন উঠতে পারে, কে প্রান্তজন? ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মুশকিল। ঢাকা রাজধানী বলেই তা কেন্দ্র এবং এখানে যে সংস্কৃতির চর্চা হয়, সেটাই মূলধারার সংস্কৃতি এমন সরল ভাবনা ভাবা ঠিক হবে না। জীবনের শেষ কবিতায় মনোলগিং স্বরে আক্ষেপভরে লিখেছেন- 'মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছো নিপুণ হাতে সরল জীবনে।' খুব খাঁটি কথা। এই মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদে পড়েই ভাবি- আমাদের শোনা সঙ্গীত, দেখা নাটক-চলচ্চিত্র-নৃত্য এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ভাবনাই হচ্ছে মূলধারার সংস্কৃতি, পরিশীলিত, পরিমিত, উচ্চতর। এই মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদের কারণেই বন্ধ হয়ে গেল আমাদের নাট্যকলার প্রধান অনুষঙ্গ যাত্রাপালা।

এই আশ্বিন-কার্তিকের শুকনো মৌসুমে কী মাধুর্যময় দিন ছিল যাত্রার। থিয়েটারের আগ্রাসন ও শিক্ষিত সমাজের অবহেলায় গ্রামীণ জনপদের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতি যাত্রাপালা এখন বিলুপ্তির পথে। যাত্রার গায়ে অপবাদ রটেছে অশ্নীল নৃত্যগীত সংযোজনার। কখনও ভেবেছি, কেন অশ্নীল নৃত্যগীত সংযোজন করতে হলো যাত্রায়? যাত্রা-ঘেটুযাত্রাকে কেন প্রিন্সেস অমুক-তমুকের নাচ-গান পর্যায়ে আসতে হলো? আদিযাত্রায় যে নাচ ছিল, সেটা ছিল সখিনৃত্য, যার অধিকাংশই ছিল উচ্চাঙ্গ নৃত্য। জারি গান, গম্ভীরাও ছিল। অমলেন্দু বিশ্বাস যখন মধুসূদন যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন, তখন গণমানুষের কাছে সেই অভিনয়ের আবেদন থিয়েটার-টেলিভিশন এমনকি সিনেমার চেয়েও বেশি ছিল।

অশ্নীলতার অভিযোগে প্রশাসন যাত্রাপালার অনুমতি প্রায় দেয়ই না। আবার টাকা দিলে অনুমতি ঠিকই মেলে। প্রশাসন যাত্রাপালা বন্ধ করতে পেরেছে, অশ্নীলতা বন্ধ করতে পারেনি। কী কারণে ঝুমুর দল, ঘেটুযাত্রা, যাত্রা ইতরজনের সংস্কৃতি আর ক্যাসিনো উচ্চতমের সংস্কৃতি- তা কি কেউ বুঝিয়ে দেবেন? এ হলো আমাদের মনস্তত্ত্বের এক বাও কুমটা বাতাস। 'বাও কুমটা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে' আমাদের চিন্তাও তেমনি ভুল পথে ঘুরে ঘুরে মরছে। বিএমডব্লিউর মতো গাড়িয়াল ভাইদের গাড়ির ধাক্কায় 'রাজংপন্থ' থেকে হটে গেছে আমাদের সত্যিকার গাড়িয়াল ভাইদের গাড়ি।

ব্রিটিশ শাসকরা বেঙ্গল প্লেজ অব অ্যামিউজমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৩৩ আইন জারি করে সেই যে যাত্রার পায়ে শিকল পরাল, সেই অভিশাপ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে যাত্রাদল। পেশাদার যাত্রার নট এবং নির্দেশকরা প্রায় সবাই বেকার। কেউ কেউ চলে গেছেন ভিন্ন পেশায়। পেশাদার যাত্রাদলের করুণতম জীবনের কথা লেখা আছে সেলিম আল দীনের 'গ্রন্থিকগণ কহে'তে। হয়তো কোনোদিনই আর অমলেন্দু বিশ্বাসের চারণিক নাট্যগোষ্ঠীর মতো যাত্রাপালার দল আসবে না।

শুধু কি যাত্রা? আশ্বিনের শুকনো মৌসুমের শুরু থেকে অগ্রহায়ণ-পৌষ-মাঘ-ফাল্কগ্দুন প্রায় পাঁচ মাস বিশাল বাংলাজুড়ে চলেছে মাইজভাণ্ডারি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি গানের আসর, শনির পাঁচালি, মনসার ভাসান, গঙ্গা মাহাত্ম্যের মতো নাটক। স্থানীয়দের মধ্যে যারা লিখতে আগ্রহী, তারা এসব প্রাচীন পুঁথির নাট্যরূপ দিয়েছেন। যারা অভিনয় করতে ভালোবাসেন, তারা সেসবে অভিনয় করেছেন। স্বভাব কবিয়ালরা কবি গানের আসর মাত করে দিয়েছেন সহজিয়া সুরে। 'ব্রাত্যজনের ব্রাত্য কাণ্ডকারখানা' বলে কোনোমতেই নাক সিটকানোর কোনো সুযোগ নেই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, 'তখন আমার নবীন বয়স। শিলাইদহ অঞ্চলের কোন এক বাউল অন্তরে একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল আমি কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে।' এখন তো আর এটা কারও অজানা নয় যে, বাউল গগন হরকরার এই সহজ সুরের ভিত্তির ওপরই রচিত হয়েছে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। বাউল ফকিরদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সহজ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের টুকরো টুকরো নানা কথা, নানা ইতিহাস লেখা আছে বইয়ের পাতায় পাতায়। মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের 'হারামণি' গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদবাণীটি পড়ে দেখুন।

সুর সঙ্গীত নাটক-সিনেমার মাধ্যমে যত সহজে একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়, অন্য আর কিছু দিয়েই সেই মেলবন্ধন তৈরি করা সম্ভব নয়। এই মেলবন্ধন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের রাজনীতি, এমনকি বামধারার রাজনীতিও। গ্রাম তো বটেই, শহুরে জনসংস্কৃতির পালস্‌ ধরতেও ব্যর্থ হয়েছে বামধারা। ভেবে দেখুন মমতাজের 'লোকাল বাস' গানটির জনপ্রিয়তার কথা। যদিও মস্কোপন্থি বামদের অনেকে 'হারমোনিয়াম পার্টি' বলেন। কিন্তু সেই হারমোনিয়ামে যদি কেবল 'সংকটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ' জাতীয় সাধারণের জন্য দুর্গম সঙ্গীত বাজানো হয়, তবে তা জনমানুষের কাছে পৌঁছবে না। রবীন্দ্রনাথের গানের মর্মশাস গেলেও বিচিত্র পথে হয়নি সে সর্বত্রগামী। এর চেয়ে অনেক সহজ বার্তা নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির পক্ষে সাধারণের দরজায় পৌঁছানো সহজ হয়েছে। পাওনা উদ্দীপনার চেয়ে বেশি প্রণোদনা জাতীয় পার্টি পেয়েছে উত্তরাঞ্চল থেকে। 'নতুন বাংলাদেশ গড়বো মোরা'র সহজ কথা পৌঁছতে পেরেছে রংপুরবাসীর মনে।

সুন্দরের বন্ধন নিষ্ঠুরের হাতে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বন্ধন ঘোচাবে কে? বিশ্বায়নের দাপটে যে এক মেরুর দুনিয়া তৈরি হয়েছে, তাতে এরপর হারিকেন জ্বালিয়ে অফলাইনের বাসিন্দাদের খুঁজতে হবে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মধ্যে যে মহাদ্বন্দ্ব বিশ্বায়ন কি তা ঘোচাতে পেরেছে? মোটেই নয়। প্রাচ্যকে দাঁড়াতে হবে প্রাচ্যের শিকড়ের ওপর। স্থানীয় শিল্প-সংস্কৃতিকে বিলীন করে দিয়ে নয়। আমাদের প্রত্যেক জেলার রয়েছে নিজস্ব সঙ্গী, রান্না, উচ্চারণ ভঙ্গি। দেওয়ান গাজীর কিসসা নাটকটিতে খুলনার কথ্য ভাষা প্রাধান্য। গুনাইবিবির উপাখ্যান লেখা হয়েছে বরিশালের কথ্য ভাষায়। তা বলে কি এর শিল্পমান কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ হয়েছে? ফকনারের উপন্যাসে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন উঠে এসেছে বলে কি কেউ ফকনারকে আঞ্চলিক কথাকার বলেন? বিদেশিরা বাংলাদেশে আসবে বাংলাদেশকে দেখতেই। এসে দেখছে, আমরা তাদের মতো হওয়ার জন্য মরণপণ চেষ্টা চালাচ্ছি। বেসরকারি চ্যানেলগুলো বিদেশি সিরিয়াল চালাতে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আমরা শুধু অন্যেরটা নিচ্ছি, দিতে পারছি না কিছুই। অন্যেরা আমাদের কী গ্রহণ করছে? কিছুই না। এভাবেও কি দেশ ডাম্পিং গ্রাউন্ড হয়ে যায় না?

কলাম লেখক