নিরাপদ হোক শারদোৎসব

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯

কামাল লোহানী

ব্রিটিশ আমলে দেশের লোকসংখ্যা কম ছিল; তবুও শারদীয় উৎসব আয়োজন ছিল নিরাপদ ও আন্তরিকতাপূর্ণ। সৌভ্রাতৃত্বের মিলন মেলা বসত উৎসব ঘিরে। আবালবৃদ্ধবনিতা ছুটত প্রতিমা দর্শনে। আবার উৎসবের মেলা প্রাঙ্গণে পসরা সাজিয়ে বসা নানা দোকানির কাছ থেকে নিজেদের চাহিদা পূরণের মতো কিছু কিনত। দেশ হলো বিভক্ত, বাংলাও দ্বিখণ্ডিত হলো। আমরা পূর্ববঙ্গের মানুষ- হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান চাইলাম এক হয়ে বাস করতে আনন্দ-উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে। পাকিস্তানি দুঃশাসনের বৈরী মনোভাব দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের 'সংখ্যালঘু' বলে চিহ্নিত করল। তবু দুর্গোৎসবের ঐতিহ্যকে ম্লান করতে পারেনি। বাংলা এখন সাড়ে চার কোটি নয়, সাড়ে সাত কোটিও নয়, ১৬ কোটি গণমানুষের দেশ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের কালে আমরা দখলদার পাকিস্তানিদের পরাজিত করে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করেছি ৩০ লাখ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীর রক্তে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং মুক্তিফৌজ তথা মিত্রবাহিনী বিজয় অর্জন করেছে। আর তাই আমরা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের স্লোগানে অর্জন করেছি 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ'। এ অর্জনের আগে ও পরে কত না চক্রান্ত একে ম্লান করতে চেয়েছে। দেশি-বিদেশি হাত খর্ব করতে চেয়েছে মুক্তিসংগ্রামকে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে সে অপপ্রয়াস।

আমরা বিজয়ী বাংলার মানুষ মুক্ত স্বদেশে বসবাস করছি আজ প্রায় ৫০ বছর। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার যে স্লোগান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শানিত করেছিলাম শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে, তা আজ যেন কেমন ফিকে হয়ে গেছে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর ওপর নানা ধরনের অত্যাচার, ভূমিগ্রাস, সম্পদ লুট, লুণ্ঠন, ধর্ষণ এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটাল- এক নয়, একাধিকবার। এই তিন আমলে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বাড়াবাড়িতে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতায় মন্দিরে, গির্জায় এমনকি প্যাগোডাতেও হামলা করতে দ্বিধাবোধ করল না। একের পর এক এ ধরনের সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের ফলে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক ও আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ল। ফলে দেশত্যাগ করতে থাকলেন তারা। উল্লেখ্য, শারদীয় দুর্গোৎসব আয়োজনের পরিমাণ অনেক কমে গেল। যারা এ দেশেই থেকে গেছেন, তারা সাহসে ভর করে পূজামণ্ডপ নির্মাণ ও দেবী প্রতিমার উদ্বোধন ঘটিয়ে পূজা অর্চনা করতে চেষ্টা করেছেন। সরকার তাদের যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তারপরও বেশ কিছু জায়গায় দুর্বৃত্ত ও ভূমিগ্রাসী লুণ্ঠনকারীর দল রাতের অন্ধকারে মন্দিরে সাজানো দেবী প্রতিমাকে ভেঙে পূজার আয়োজনকে তছনছ করে দিয়েছে। আবার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হিন্দু বাড়িঘর, দোকানপাট যেমন লুট করেছে, তেমনি গির্জার ধর্মযাজককে হত্যা করেছে অথবা হত্যার হুমকি দিয়েছে। ফলে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে শঙ্কা সবসময় বিরাজ করেছে। কিন্তু আজ যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ সরকার ক্ষমতাসীন এবং তাদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রতি 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণের পর অমুসলিম জনগণের অনেকেই স্বদেশে ফিরে এসেছেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের অজুহাতে হিন্দুদের বিষয়-সম্পত্তি 'শত্রু সম্পত্তি' হিসেবে আইয়ুব সরকার দখল করে নিয়েছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন মন্ত্রিসভা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিজয়ের পর দখলকৃত এসব সম্পত্তি তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। দেশে অর্পিত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার যে নির্বাচনী ওয়াদা ১৪ দল করেছিল, শেখ হাসিনার আমলে তার খানিকটা বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এখনও অর্পিত সম্পত্তি বিষয়টি আদালতে ফয়সালা হওয়ার পরও প্রশাসন থেকে নানা ধরনের বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকে অর্পিত সম্পত্তি অর্থাৎ আইয়ুবী আমলের 'শত্রু সম্পত্তি' মামলা করে ফেরত পেয়েছেন। আর সেই সুবাদে যে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে, তার কারণে অনেকে আবার দেশে ফিরে এসেছেন। ইতিপূর্বে পূজা-পার্বণে যে ধরনের সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, আজ তা অনেকটাই কমে গেছে। এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, সনাতন ধর্মের মানুষ নতুন নিরাপদ পরিবেশে আগের চেয়ে অনেক বেশি পূজা-পার্বণে মনোনিবেশ করেছে। তাই তো এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা ৩১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীরা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য যেভাবে অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। তবু দেশের মানুষকে ভালোবেসে যে শান্তির পরিবেশ আজ সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের স্বস্তি দেয়। সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি সুদৃঢ় হয়েছে বলেই এমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

তবু সরকারকে বলব সাবধান থাকতে। আমরা তো ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোবিন্দগঞ্জের কথা ভুলে যাইনি, ভুলে যাইনি সাঁথিয়ার কথাও। এমনিভাবে ভোলা কি সম্ভব এ ধরনের কুৎসিত অপতৎপরতাকে? তাই সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তার জন্য সাধুবাদ জানাই। তারপরও অনুরোধ জানাব মণ্ডপে মণ্ডপে নজরদারিটা বাড়ানোর জন্য। আর সেই সঙ্গে পূজা বা উৎসব কমিটির কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও অনুরাধ করব স্থানীয় জনগণের সহায়তা নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এত সব শঙ্কা ও আতঙ্কের মধ্যেও যারা পূজা-পার্বণের আয়োজন করেছেন, তাদের জানাই শারদীয় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব