দশ নম্বর দখলে অযোগ্যদের দৌড়

যুক্তরাজ্যের নির্বাচন

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০১৯

অ্যান্ড্রু রন্সলি

আগামী কয়েক সপ্তাহের তুমুল প্রচার, মুখোমুখি টেলিভিশন বিতর্ক এবং অন্যান্য নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে দু'জনের মধ্যে অনেক পার্থক্য হয়তো দৃশ্যমান হবে; তারপরও বরিস জনসন এবং জেরেমি করবিনের মধ্যে অন্তত একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। তা হলো বিপুলসংখ্যক মানুষ মনে করে, প্রধানমন্ত্রী পদে বসার যোগ্যতা দু'জনের কারোরই নেই এবং এ রকম ধারণা পোষণকারী তাদের নিজের দলের মধ্যেই অনেকে রয়েছেন। এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সরকারি পদে বসার ব্যাপারে একজন আরেকজনের যোগ্যতা একেবারে না থাকার অভিযোগ তুলবেন- এটা কমবেশি প্রত্যাশিত। যে ব্যাপারটা আসন্ন নির্বাচনকে বিশেষত্ব দিয়েছে তা হলো, বড় দুই দল ১০ নম্বর ভবনে পাঠানোর জন্য যে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে তাদের উভয়ের চরিত্র, মনোভাব, মূলনীতি, আশপাশে থাকা চেহারা- সবকিছু দেখেশুনে অনেক ভোটার শুধু নয়, বরং তাদের পক্ষের অগণিত মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দানা বাঁধছে।

রক্ষণশীল দলে খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে, জনসন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো যোগ্য মানুষ নন- এ কথা প্রকাশ্যে যে বলবে। তেমন ক্ষুদ্র ব্যতিক্রমীদের একজন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল, গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা কমিটির সভাপতি- দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিকন্সফিল্ডের রক্ষণশীলদলীয় এমপি ডমিনিক গ্রিভ। তিনি জনসনের আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়বেন। যদিও মনে-প্রাণে তিনি রক্ষণশীল আদর্শের অনুসারী, তারপরও তিনি বরিস জনসনকে কয়েকটি কারণে ব্রিটেনের নেতা হওয়ার যোগ্য নন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। একটি কারণ হলো, বরিস আমাদের দেশের জন্য এমন কিছু করবেন বলে হুঙ্কার দিচ্ছেন, যা হবে 'অসাধারণ রকমের ক্ষতিকর'। আরেকটি হলো, ১০ নম্বর বাড়িটি 'মিথ্যার তুবড়ি ছোটানো অপপ্রচারের যন্ত্র' হয়ে দাঁড়াবে। এটা জোরালো বক্তব্য এবং তেতো হলেও মনে রাখতে হবে, গ্রিভ জোর গলায় যা বলছেন তার সাবেক সহকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ দলের জন্য ভোট প্রার্থনা করলেও আড়ালে-আবডালে তার মতোই ভাবছেন।

লেবার পার্টিতেও খুব অল্প মানুষ আছে, যারা খোলাখুলি মতপ্রকাশ করবে যে, করবিন ও তার কট্টর বাম সাঙ্গোপাঙ্গদের ১০ নম্বর ভবনের চৌকাঠ পার হতে দেওয়া ঠিক হবে না। আয়ান অস্টিন ও জন উডকক, যারা তাদের সাবালক জীবনের প্রায় পুরোটাই লেবার পার্টির হয়ে কাজ করতে ব্যয় করেছেন; করবিনকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার 'সম্পূর্ণ অযোগ্য' বলে আখ্যা দিয়েছেন। অস্টিনের মতে, পার্টি 'চরম পন্থা ও বর্ণবাদ'-এর বিষে আক্রান্ত। উডকক মনে করেন, লেবার দলের নেতা এতটাই বিপজ্জনক যে, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হাতল ধরা থেকে যেভাবে হোক তাকে বিরত রাখতে হবে। দু'জন রগচটা সাবেক লেবারদলীয় এমপির ব্যক্তিগত মন্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া গেলে তাদের অবস্থান এতটা গুরুত্ব বহন করত না। বরং দু'জনের কটু-কাটব্য অনেকটা ওজোগুণ লাভ করেছে, যেহেতু আমরা জানি লেবার দলনেতা সম্পর্কে তাদের প্রকাশ্য গঞ্জনাপূর্ণ মন্তব্যের সঙ্গে সাবেক সহকর্মীদের অনেকে একমত।

অন্যেরা প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার দুই প্রার্থী সম্পর্কে কী ভাবছেন, তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন দূরে সরে যাওয়ার মাধ্যমে। নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে কিছুটা মডারেট রক্ষণশীলদের গণবিদায় লক্ষ্য করা গেছে; এদের মধ্যে কয়েকজন সাবেক এবং অন্তত একজন বর্তমান মন্ত্রী, নিকি মর্গ্যান রয়েছেন। এসব প্রতিবাদীর মধ্যে আরেকজন জনসনও কিন্তু আছেন। জো ভ্রাতৃসুলভ গর্ব ও আস্থায় স্টম্ফীত হয়ে মাত্র ছয় সপ্তাহেরও কম ভাইয়ের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের পর নিজের প্রতিশ্রুতিশীল ভবিষ্যতের সমাপ্তি ঘটিয়ে মন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এবং পার্লামেন্ট সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। লেবারদলীয় মডারেটদের একটি বড় অংশ দলত্যাগ করে অন্য দলে যোগ দিতে যাচ্ছেন অথবা ঘষামাজা থেকে পিছু হটে যার ওপর বিশ্বাস নেই, এমন একজন মানুষের পক্ষে ওকালতির চেয়ে তাদের জীবনকে বরং আত্মিকভাবে কম বর্ণিল কাজে নিয়োজিত করতে চাচ্ছেন। দূরে সরে যাওয়াদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন টম ওয়াটসন। প্রচারণার প্রথম দিনই সন্ধ্যা নাগাদ তিনি পার্লামেন্টে দলীয় উপনেতা এবং সদস্য, উভয় পদ ছাড়ার কথা জানিয়ে দেন। তার পদত্যাগ হয়তো-বা সেরা আজগুবি ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। ইস্তফার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লেভেল টু ফিটনেস ইন্সট্রাক্টরের ট্রেনিং নিতে চান বলে উল্লেখ করেন। এমনতর ঘটনা এবারই প্রথম। এর আগে আর কাউকে কখনও সুতা পাকানোর ক্লাসে আরও বেশি সময় দিতে চান বলে প্রথম সারির রাজনৈতিক দায়িত্ব ছেড়ে দিতে শোনা যায়নি। তার বেখাপ্পা ইস্তফাপত্রে লেবার দলনেতা সম্পর্কে যদিও সমালোচনাপূর্ণ কিছু বলা হয়নি; তবে ওয়াটসনের সঙ্গে কিছুটা হলেও সময় কাটানো ব্যক্তিমাত্র জানেন, তিনি করবিনের প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত নয় বলে বিশ্বাস করেন। খুব সম্ভবত ১০ নম্বর ভবনে কখনও স্থান পাওয়া উচিত নয় এমন এক ব্যক্তির হয়ে প্রচারণা চালানোর বুদ্ধিবৃত্তিক কক্ষচ্যুতির দায় বহন করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না।

লেবার ও টোরি পক্ষের যারা মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, তাদেরকে আর কখনও নেতাদের সম্পর্কে তাদের সত্যিকার ধারণা কী- এ প্রশ্নে ভোটারদের কাছে মিথ্যা বলতে হবে না। জনসনে অবিশ্বাসী টোরিদের বেলায়, যারা পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে দাঁতে দাঁত চেপে ১০ নম্বর ভবনে তাকে ফিরিয়ে আনার কসরত চালিয়ে যাওয় চিন্তা করছেন যতক্ষণ না আক্কেল মাড়িতে যন্ত্রণা শুরু হয়, অবশ্য এমনটি ঘটবে না। একই কথা করবিনবিমুখ লেবার প্রার্থীদের বেলায়ও প্রযোজ্য, যারা তার প্রধানমন্ত্রিত্বের অনুকূলে সাফাই গাইবেন অথচ ব্যাকুলভাবে দুই হাতের আঙুল কচলে ভাবতে চাইবেন, আর যাই হোক এমনটি ঘটবে না; এমনকি যদি ব্যাপক সংখ্যক ভোটার তাদের পরামর্শ অনুসরণ করে লেবার পার্টিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েও ফেলে।

জনসনের মধ্যে আমরা এমন একজন মানুষকে পাই, যাকে তারই টোরি পূর্বসূরি প্রধানমন্ত্রী ১০ নম্বর ভবনের বাসিন্দা হিসেবে 'নৈতিকভাবে অযোগ্য' অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন। অ্যান্থনি সেলডন, তেরেসা মের প্রধানমন্ত্রিত্বকাল নিয়ে লেখা তার সুখপাঠ্য নতুন বইয়ে এ কথা বলেছেন এবং আমি এটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করি। কেননা, আগেও আমার নিজস্ব উৎস থেকে একই রকম কথা শুনেছি। মিসেস মে, মেইডেনহেড আসন থেকে আবারও পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার জন্য লড়বেন। সুতরাং তিনি আজ থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত টোরি দলের হয়ে এমন এক ব্যক্তিকে ১০ নম্বর ভবনে বহাল রাখার পক্ষে দেন-দরবার চালাবেন, যাকে তিনি ওই ঠিকানার অধিকার অর্জনে নৈতিকতার মানদণ্ডে অযোগ্য মনে করেন এবং এ রকম টোরি তিনি একা নন।

আত্মপ্রতারণার মাত্রা লেবার শিবিরে আরও প্রকট; সেখানে অনেকেই এবং সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রার্থী যাদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তারা করবিন ও তার দলবলকে ক্ষমতা কাঠামোর ধারেকাছে ভিড়তে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন না। তিন বছর আগে লেবারদলীয় এমপিরা একটি আস্থা ভোটে অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে মাত্র ৪০ জন তাকে নিজেদের নেতা হিসেবে যোগ্য বিবেচনা করেছিলেন, বাকি ১৭২ জন তাকে অপসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৭২ জন পার্লামেন্ট সদস্য ওই সময় যেসব যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন, তার কোনোটি সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়নি এবং লেবার নেতার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তি বরং আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। লেবারদলীয় এমপিদের অনেক মন্তব্য আমার সংগ্রহে রয়েছে, যেখানে তাদের নেতা প্রধানমন্ত্রী হলে কেমন বিপর্যয় ঘটবে অথবা তার নেতৃত্বাধীন সরকার পরিচালনায় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির কতটা সঙ্গিন দশা হতে পারে, তার বর্ণনায় পরিপূর্ণ। একই ব্যক্তিবর্গ এখন তাদের গোলাপি শিরস্ত্রাণের ওপর আস্থা স্থাপন করছেন এবং করবিনকে ১০ নম্বর ভবনে পাঠানোর পক্ষে ভোট চাইছেন; যদিও তারা বিশ্বাস করেন, তাদের নেতা ওই পদের জন্য একেবারে অনুপযুক্ত।

এবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী দু'জনই ভয়ংকর এবং নির্বাচনে শুধু অযোগ্যদের দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। জাতি অপছন্দের মধ্য থেকে বেছে নেওয়ার পরিস্থিতির সম্মূখীন। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় লেবারের বাক্সে (তবে করবিন নন) অথবা কনজারভেটিভের বাক্সে (কিন্তু জনসন নন) এমনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।

দুই প্রার্থীর যে কোনো একজন ১০ নম্বর ভবনে বসতে যাচ্ছেন- এমনটি ভাবতেও যাদের হূৎকম্প শুরু হয়, তাদের জন্য সবচেয়ে আশা-জাগানিয়া হতে পারে আরও একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট। তাতে যে কোনো একজনের কারণে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য অনাসৃষ্টি কিছুটা হলেও আটকে দেওয়া অন্তত সম্ভব হবে।

দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধ, ঈষৎ সংক্ষেপে ভাষান্তর আশরাফুল মকবুল
দ্য অবজারভারের রাজনীতিবিষয়ক বিশ্নেষক