পেঁয়াজ পরিস্থিতি পুরোটাই হতাশার

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৯      

ড. সাখাওয়াৎ আনসারী

পেঁয়াজের দাম 'ডাবল সেঞ্চুরি' করে ফেলল! দুই মাস আগেও বাজারের এই পরিস্থিতি কেউ ভাবতে পেরেছিল? বাজারে কেবল নয়, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে পেঁয়াজের এমন প্রাসঙ্গিকতা আগে কখনও দেখা যায়নি।

কয়েক বছর আগের কথা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এক সেমিনার। উদ্বোধনী বক্তৃতা শুরু করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এক খ্যাতিমান অধ্যাপক। বিষয় :'পেঁয়াজের রাজনৈতিক অর্থনীতি'। শ্রোতৃমণ্ডলীতে ছিলেন নানা বিষয়ের ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে অর্থনীতির অধ্যাপকও। অনেকেই পারস্পরিক মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন; শুরু হয়ে গেল মৃদুস্বরে কথোপকথনও :বিষয় হলো পেঁয়াজ, তার আবার রাজনৈতিক অর্থনীতি! সোনা-দানা, চাল-ডাল, মাছ-পাটের অর্থনীতি হলেও না হয় মেনে নেওয়া যেত। সেদিনের কণ্ঠ ও দৃষ্টি শ্নেষাত্মক হলেও আজকে শতভাগ পরিস্কার, যে কোনো একটি তথাকথিত ক্ষুদ্রপণ্যও জাতীয় জীবনে গুরুত্বহীন নয়। মাসাধিককাল ধরে পেঁয়াজ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে তার নিজের গুরুত্ব যে কতটা, তা দেখিয়ে চলেছে।

নভেম্বরের গোড়ার দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের যৌথ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে চট্টগ্রাম এবং টেকনাফের একটি সিন্ডিকেট মিয়ানমার থেকে ৪২ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ আমদানি করে ৯০ থেকে ১১০ টাকায় পাইকারি বাজারে বিক্রি করে আসছে। অঞ্চল দুটি পরিদর্শন শেষে যৌথ দলটি মিয়ানমারের পেঁয়াজ পাইকারি বাজারে ৫৫-৬০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রির নির্দেশ দেয়। তদন্ত দল থেকে এই বক্তব্যও পাওয়া গেছে যে, যারা নির্দেশ অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে। তারপরও কেজিপ্রতি ২০০ টাকা পার হলো।

পেঁয়াজের আলোচনার সূত্রপাত ঘটে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে যখন ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি আকস্মিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষের হয়ে ওঠে নাভিশ্বাস অবস্থা।

অনুসন্ধান দল কেন ৩৫ দিনের আগে এই অনুসন্ধান করতে সক্ষম হলো না, তার কারণটিও আমরা আঁচ করতে পারি। কনসাস কনজ্যুমার্স সোসাইটি নামের একটি সংগঠন অনুসন্ধানী দলের অনুসন্ধানের ঠিক আগের দিন প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরে যে, ২ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৪ মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে মোট ২৪ বার। এর ফলে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ৩২শ' কোটি টাকা। 'সরবরাহ কম এবং আমদানি ব্যয় বেশি'- এই অজুহাত তুলে বাড়ানো হয়েছে দাম, যাতে জড়িত একটি সিন্ডিকেট। আমাদের প্রশ্ন, একটি বেসরকারি সংগঠন যদি এই তথ্য তুলে ধরতে পারে, তাহলে মন্ত্রণালয় এতদিন কী করছিল? তারা কেন এই সিন্ডিকেট চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হলো?

অক্টোবর মাসজুড়ে পত্রপত্রিকায় পেঁয়াজ নিয়ে অজস্র খবর ও তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি উদ্যোগের খবরও বাদ যায়নি। কিন্তু কাজের কাজ যেটি হওয়া উচিত ছিল অর্থাৎ খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে পারা, তা কিন্তু সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মাসাধিককাল ধরে প্রকাশিত হয়েছে বাণিজ্যমন্ত্রী, বাণিজ্য সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ খোদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি। কিন্তু এগুলোর কোনো কিছুই পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনই ব্যর্থ হয়েছে দেশের মানুষকে আশার আলো দেখাতে বা আশ্বস্ত করতে।

বাণিজ্য সচিব বলেছেন, 'এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পেঁয়াজের বেশি দাম রাখছেন।' অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, 'কষ্টটা বোধহয় আমাদের আরও একটা মাস করতে হবে।' দু'জনের বক্তব্যের সূত্র ধরে আমরা প্রশ্ন করতে পারি, অসাধু ব্যবসায়ীরা যদি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পেঁয়াজের দাম বেশি রাখে, তাহলে সংকট উত্তরণে ওই অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিয়েছে? ব্যবসায়ীরা যদি অনেক বেশি মুনাফাই করে, তাহলে মন্ত্রণালয় তাদের মুনাফাকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে কী ভূমিকা পালন করেছে? নতুন পেঁয়াজ ওঠার কথা ডিসেম্বরের শুরুতে। তখনই যদি বাজার ঠিক হয়, তাহলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কৃতিত্ব কোথায়? বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, 'চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এবং ঢাকার শ্যামবাজারের দুই বাজারেই সিন্ডিকেট রয়েছে।' সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো ব্যবস্থা কি এতদিনেও মন্ত্রণালয় নিতে পেরেছে? খোদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সর্বসাধারণের উদ্দেশে এমন বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে :'পেঁয়াজের দাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাজারে প্রচুর পেঁয়াজ রয়েছে।' আমরা ভেবে আশ্চর্য হই, এমন উদ্ভট বিজ্ঞপ্তি কীভাবে প্রচার করা হয়?

যখন দেখাই যাচ্ছে যে, পেঁয়াজের প্রকৃতপক্ষে কোনো সংকট নেই অথচ দাম রয়েছে আকাশচুম্বী, তখন সরকার কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্টের ভিত্তিতে পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দিতে পারত। কারণ ২০১২ সালে সরকার এই আইনের অধীনেই ১৭টি পণ্যকে অত্যাবশ্যকীয় ঘোষণা করেছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় সে পথও মাড়ায়নি। পেঁয়াজ নিয়ে গত সোয়া মাস ধরে যা চলছে, তার প্রায় পুরোটাই জাতির জন্য হতাশার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জাতির যা প্রত্যাশা ছিল, তাও পূরণ হয়নি।

অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়