আমরা সবাই মিলে পারব

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯      

ফাত্তাহ তানভীর রানা

একটি কাল্পনিক ঘটনা দিয়ে শুরু করি। শোনা গেল বাজারের নদীর ঘাটে বেশ ভিড় জমেছে। একটি যুবতীর লাশ নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। এটা দেখতেই এত ভিড়। সময়টা বর্ষার মৌসুম ছিল না; তাই নদীতে স্রোতও কম ছিল। সাধারণভাবে বলা যেতে পারে, নদী ও লাশের গতি একই ছিল। এ কারণে সাধারণ মানুষ একটু বেশি সময় ধরে লাশটি দেখার সুযোগ পাচ্ছিল। অবশ্য দু-একজন আগেই সংবাদ পেয়েছিল, উজান থেকে একটা লাশ ভেসে আসছে। লাশটি খুব বেশি ক্ষতবিক্ষত হয়নি, হয়তো এক দিন আগের হবে। উপস্থিত সবাই বলাবলি করছিল, লাশটি এখনও শনাক্ত করা সম্ভব; কিন্তু আরও এক দিন পেরোলে হয়তো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

সাধারণ জনগণ এই লাশটি উদ্ধার না করলেও থানায় খবর দিয়েছে। এসব খবর অবশ্য দিতে হয় না, বাতাসের গতিতে ছড়ায়। থানার কর্মকাণ্ড খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হলো। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটেছে, কারও মৃত্যু হয়েছে, এতে কর্তব্য রয়েছে- এ রকম কোনো ব্যাপার থানার ভেতরে লক্ষ্য করা গেল না। অবশ্য এ সমস্যাগুলো এদের নিত্যদিনের; তাই আগ্রহ কম। সমাধান তো হবেই যে কোনোভাবে!

একজন জনপ্রতিনিধি ঘটনা শুনে বললেন, দুঃখজনক ঘটনা। এরপর বিভিন্ন জনে ভিন্ন ভিন্ন কথা! আহা! কে মেরেছে মেয়েটিকে? এভাবে মায়ের বুক খালি করল! কী নৃশংস! দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত ইত্যাদি। এক দিন খুব সকালে নদীর কোনো এক বাঁকে লাশটি কচুরিপানার সঙ্গে আটকে যায়। এরপর উৎসুক জনতা লাশটি থানায় দেওয়ার ব্যবস্থা করে। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। তারপরও কেউ কেউ এগিয়ে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। অবশ্য এর ভেতরে পুলিশ লাশটি উদ্ধারের জন্য গিয়েছিল, সঙ্গে সংবাদকর্মীরাও ছিলেন।

লাশটি উদ্ধারের পর বাকি কাজ সম্পাদনের জন্য পুলিশি তৎপরতা যথানিয়মেই চলতে লাগল। একজন সাব-ইন্সপেক্টর যথারীতি বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নিলেন। লাশটি কোন ঘাটে ভিড়ল? কে তুললেন? কে প্রথম দেখলেন? ইত্যাদি নানা ধরনের প্রশ্ন। ওসি সাহেব লাশের বাকি কাজ সম্পাদনের জন্য দায়িত্বও দিলেন।

লাশটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পৌঁছল। এখন মামলা হবে, তারপর চার্জশিট হোক বা ফাইনাল রিপোর্ট হোক অথবা অন্য কিছু- ব্যবস্থা একটা হবেই। মৃত্যু স্বাভাবিক কি অস্বাভাবিক, কে তার মা-বাবা? কী তার ঠিকানা? একসময় হয়তো তার জবাবও মিলবে। শেষ হবে শবের গল্প। আমি-আপনি কেউই দায়িত্ব নিতে না চাইলেও ঘটনার যবনিকাপাত ঘটবে। এটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে যথাসময়ে দায়িত্ব নিলে ভালো হয়।

প্রসঙ্গত, আমরা যদি দায়িত্ব নিতাম, তাহলে বরগুনার কলেজছাত্রী মিন্নির স্বামী এভাবে খুন হতেন না! আমরা যদি প্রতিবাদী হতাম, রুখে দাঁড়াতাম, তাহলে খুনিরা খুন না করে পালানোর পথ খুঁজত। মিন্নির স্বামী রিফাত শরীফ যদি খারাপ ছেলে হতো, তবে খুনিদের বলছি- তোমরা পুলিশের কাছে কেন গেলে না? আদালতের শরণাপন্ন কেন হলে না? এভাবে মানুষ মারার কোনো অধিকার কারও নেই। আমরা সচেতন-সাহসী হলে নাটোরের কলম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলার রহমান ফুনু অথবা বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ নূর বাবু প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হতেন না। বেঁচে থাকার অধিকার সবারই রয়েছে। আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার সব নাগরিকের জন্য সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদের বন্ধুরা যদি নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে রুখে দাঁড়াতেন, তাহলে ফাহাদকে এভাবে অকালে মরতে হতো না, বরং অপরাধীরা হল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হতো। আমরাও এভাবে দেশের একজন রত্নকে হারাতাম না।

এত ভয় কেন? আসুন, আমরা দল বেঁধে একসঙ্গে প্রতিবাদ করি।

দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং অর্জনগুলো সমুন্নত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এ ছাড়াও মাদক, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। দায়িত্ব কি শুধু রাষ্ট্রের? নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা ব্যক্তিগত ও সমন্বিত উদ্যোগে যদি অন্যায়গুলো সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করি, তবে রাষ্ট্র ও সরকারের কাজ সহজ হবে। যে কাজ আমি একা পারব না, আমরা সবাই মিলে তা করতে পারি। সমাজের মুষ্টিমেয় দুষ্টলোকের জন্য অধিকাংশ ভালোমানুষ ভুগবেন কেন?
[email protected]