দক্ষ হয়ে বিদেশ গেলে...

জনশক্তি

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯      

হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সুবাতাস বইছে। অক্টোবর মাসে ১৬৪ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন তারা। এই অঙ্ক এক মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। আর গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে বেড়েছে ৩২ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ নিয়ে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা; যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে অভিবাসন খাত থেকে আয় হয়েছে ১৬,৪২ বিলিয়ন ডলার।

অভিবাসী খাত এমন একটি খাত, যা বিনা বিনিয়োগে ও ব্যক্তির নিজস্ব প্রচেষ্টায় উঠে দাঁড়িয়েছে। এ খাতে সরকারের বিনিয়োগ অতি সামান্য হলেও এ খাতের অর্জিত অর্থ টেকসই উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।

সারাবিশ্বে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। আবার প্রতিবছর গড়ে ৬-৭ লাখ লোক কর্মের সন্ধানে বিদেশে গেলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ প্রশিক্ষিত। বাকিরা আধাদক্ষ ও অদক্ষ হিসেবে বিদেশে যায়। বিশেষ করে জনশক্তি প্রেরণ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগে সৃষ্ট কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ও সরকারের টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যতটা সম্ভব দক্ষ কর্মীরা বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। অভিবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট কেউই দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা, ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের জন্য বিশেষ অঞ্চল বা জমি বরাদ্দ, ব্যাংক ঋণ সুবিধা ইত্যাদি কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুবিধা পায় না। অভিবাসন খাতটি একটি সম্ভাবনাময় খাত হওয়া সত্ত্বেও এ খাতের প্রতি সরকারের নজর বা পৃষ্ঠপোষকতা আরও বাড়াতে হবে।

কিছুদিন আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি মনমোহন প্রকাশ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ কিংবা বিদেশে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণ করতে না পারলে অর্থনীতির বর্তমান উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তাই কোনোভাবেই রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলার মতো নির্দিষ্ট একটা সেক্টরকে কেন্দ্র করে আমাদের এগোনো ঠিক হবে না। রপ্তানির বিকল্প খাতগুলোকেও ব্যাপকভাবে সচল করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রণোদনা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে জনশক্তি প্রেরণ খাত আমাদের বিকল্প আয়ের একটা বিশাল উৎস হতে পারে। এ খাতটিকে যদি আরও সমৃদ্ধ করা যায় অর্থাৎ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাসহ অধিক পরিমাণে প্রফেশনাল বিদেশে প্রেরণ করা যায়, তাহলে এ খাত থেকে আমাদের বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ ফরেন রেমিট্যান্স আয় বেড়ে যাবে। বিদেশে আমাদের জনশক্তির বিপুল চাহিদা রয়েছে।

বলা হয়ে থাকে, দক্ষ জনশক্তি এক বিশাল জনসম্পদ। দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জরিপ অনুযায়ী- বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৬২ শতাংশ অদক্ষ, ৩৬ শতাংশ আধাদক্ষ ও ২ শতাংশ মাত্র অতিদক্ষ। যে কারণে এসব কর্মীর মজুরিও কম। তাই এই মানবসম্পদকে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সব ধরনের টেকনিক্যাল বা কারিগরি, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ প্রদান পদ্ধতি তথা সার্টিফিকেট যেন লেবার রিসিভিং কান্ট্রিগুলো আস্থায় নেয়। তা না হলে উন্নত দেশগুলোতে ডাক্তার, নার্স, ইঞ্জিনিয়ার ও বিভিন্ন কারিগরি জ্ঞানসমৃদ্ধ দক্ষ জনশক্তির বিপুল চাহিদা থাকলেও তারা আমাদের দেশ থেকে এ ধরনের জনশক্তি নেবে না। তাই এ বিষয়টির প্রতি অধিকতর নজর দিয়ে এবং বিশ্ব চাহিদা ও মান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোসহ প্রশিক্ষকের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন। সারাবিশ্বে এখন দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের আর কোনো বিকল্প নেই।

অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সকে দেশের অর্থনীতির অক্সিজেন বললেও ভুল হবে না। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের সময়ও আমরা দেখেছি, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিএমইটির তথ্যমতে, বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মোট শ্রম অভিবাসীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তবে শুধু শ্রম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেই হবে না, তাদের অধিকার সুরক্ষার কৌশলগুলো মজবুত করতে হবে। অভিবাসীদের সার্বিক কল্যাণকে যদি গুরুত্ব দিয়ে না দেখা হয়, তাহলে আমাদের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বিভিন্ন দেশ কর্তৃক বহুবিধ নিয়ম আর শর্ত আরোপ করায় এবং অভিবাসনে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিবাসীদের উন্নয়নে একটা নেতিবাচক প্রভাব আছে। তাই বর্তমান সময়ে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদ, সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদারের কোনো বিকল্প নেই। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অভিবাসী ইচ্ছুকদের দক্ষ করতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান, অনলাইন ভিসা পদ্ধতি, কর্মী প্রেরণে ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতির ব্যবস্থা, স্মার্টকার্ড প্রবর্তন, ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস, বীমা- এসব উদ্যোগ নিরাপদ অভিবাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

প্রতিবছরের মতো এ বছরও প্রবাসীকল্যাণ বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় যথাযোগ্য মর্যাদায় আগামী ডিসেম্বরে 'আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস-২০১৯' পালন করতে যাচ্ছে। ১৯ ডিসেম্বর সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে বর্ণাঢ্য এ আয়োজনের উদ্বোধন করবেন। বিকেলে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ এমপি অভিবাসী কর্মীদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনার গল্প নিয়ে আয়োজিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- 'দক্ষ হয়ে বিদেশ গেলে, অর্থ-সম্মান দুই-ই মেলে'। এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করার জন্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কারণ দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ মানবসম্পদই পারে ফরেন রেমিট্যান্স অর্জনের মাধ্যমে অভিবাসন খাতের এই সেক্টরকে আরও সমৃদ্ধ করতে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে যে ধরনের মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি বা টেকনিক্যাল জ্ঞানসহ আরও যেসব প্রয়োজনীয় উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেখানে দক্ষ কর্মী গড়ে উঠবে এবং চাহিদাকৃত দেশগুলোতে এই কর্মী প্রেরণের মাধ্যমে বিপুল ফরেন রেমিট্যান্স অর্জনে বিশাল ভূমিকা রাখবে। এতে করে দেশ-বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, বাংলাদেশকে সবাই আলাদা করে চিনতে পারবে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি যে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তার বিকল্প খাত হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত হিসেবে উঠে দাঁড়াতে পারে এই অভিবাসন খাত। তাই অভিবাসী ইচ্ছুক ভাইবোনদের বলতে চাই- 'দক্ষ হয়ে বিদেশ যাও, অর্থ-সম্মান দুই-ই বাড়াও।'
[email protected]

শ্রম ও অভিবাসন বিশ্নেষক; চেয়ারম্যান

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি