আমাদের রাজনীতির ব্যক্তিবাদী বিভাজন

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯      

আহমদ রফিক

রাজনীতির মূল লক্ষ্য মোটা দাগে বরাবরই জনগণ। অর্থাৎ দেশের জনগণের ভালোমন্দ, সুখ-দুঃখ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ বিবেচনা। আধুনিকতার নিরিখে ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, ভিন্ন মতপ্রকাশের অধিকার, সর্বোপরি এক কথায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা রাজনীতি ও রাজনৈতিক শাসনের মূল কথা। সেইসঙ্গে সমাজে দুর্নীতিমুক্ত মানবিক চেতনা, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ নিশ্চিত করা এবং সেই ধারায় সমাজকে গড়ে তোলা। রাজনীতি ও রাজনৈতিক শাসনের পথচলা ওই একই ধারায়।

রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংগঠনের মতাদর্শগত পার্থক্য সত্ত্বেও এ কথাগুলো সবার জন্য সত্য। তা সে রাজনীতি জাতীয়তাবাদী বা সমাজতন্ত্রী বা মিশ্র গণতন্ত্রী যে ধারারই হোক। এতে দেশের, দশের, সমাজের মঙ্গল। ব্যক্তিবিশেষেরও মঙ্গল, যদি সে ব্যক্তি লোভের-লাভের অনৈতিকতায় বিশ্বাসী না হন।

বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আদর্শিক বয়ানে মোটামুটি এ জাতীয় চিন্তার আদর্শই স্বীকৃত; যদিও আদর্শ ও তার বাস্তবিক প্রয়োগে বিস্তর ফারাক বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। সেটাও এক ধরনের অবাঞ্ছিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতায়-বিবৃতিতে আদর্শিক কথাগুলোই বারবার উচ্চারিত হতে থাকে। যেমন রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনৈতিক নেতাদের মুখে, তেমনি সমাজের এলিট শ্রেণির ধীমানদের বয়ানে বা লেখায়।

এমন এক স্বীকৃত চিন্তাভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিককালে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রযন্ত্র বা প্রচলিত ভাষ্যে সরকারের জন্য যে দুটি শব্দ অবশ্যপালনীয় বলে বিবেচিত হয়ে থাকে তা হলো, দলনিরপেক্ষ সুশাসন ও জবাবদিহির সরকার। জবাবদিহি কার কাছে? অবশ্যই জনগণের কাছে, যারা সরকারকে দায়িত্ব পালনের অধিকার দিয়েছে, তাদের রাষ্ট্রীয় শাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তাদের জীবনযাত্রা সুশৃঙ্খল ও সুসহ করে তোলার অঙ্গীকারে।

সুশাসনও সবার জন্য সমান অধিকার, সমান সুখ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য। সেইসঙ্গে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, সবার জন্য নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করা। জনগণের নির্বাচিত সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকারে এসব সুসমাচার ব্যক্ত করে থাকে, থাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলেরই, ক্ষমতাসীন না হলেও।

দুই

রাষ্ট্র পরিচালনার মতাদর্শিক বিভিন্নতার মধ্যে মূল স্বীকৃত কথাটি হলো, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সেটা ব্যক্তি ও সমষ্টি, সমাজ ও রাজনীতির সর্বক্ষেত্রে। বাংলাদেশের বর্তমান কয়েক দশকের রাজনীতির সার্বিক হালচাল বুঝতে একটু পেছন ফিরে তাকানো দরকার। আসলে কান টানতে মাথা আসার মতো এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ভারতে দেশীয় রাজনীতির মতাদর্শিক চিত্রচারিত্র্যের বৈশিষ্ট্যও বুঝে নেওয়া দরকার। দরকার তৎকালীন রাজনীতির বিভাজন চরিত্র- সে আলোচনা সূত্রাকারেও এতটা দীর্ঘ হবে যে, তা আপাতত বারান্তরের জন্য উহ্য থাক। শুধু এটুকু বলি, কিছুটা হলেও তার উত্তরাধিকার বর্তমান উপমহাদেশীয় রাজনীতি বহন করছে। করছে বাংলাদেশও।

পাকিস্তানি আমলের সূচনালগ্ন থেকে মুসলিম লীগের ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মওলানা ভাসানী ও কিছুসংখ্যক গণতন্ত্রী রাজনীতিকের উদ্যোগে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। ছাত্র রাজনীতি একই ধারায়; বলিষ্ঠ রূপ না পেলেও। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ থেকে '৫২-তে ছাত্র রাজনীতিকে আদর্শিক ধারায় সংহত হতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, জন্ম দিয়েছিল গণতন্ত্রী জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিবাদী ছাত্র রাজনীতির।

সে রাজনীতি ছিল একান্তভাবেই আদর্শিক ও স্বাদেশিকতার এবং মূলত দুই ধারার জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রী। কিন্তু তাতে ব্যক্তিক স্বার্থের দূষণ অনুপস্থিত ছিল বলা চলে। জাতীয় রাজনীতিও মূলত একইভাবে দ্বিভাজিত। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও টেকেনি ত্রিধারার ব্যক্তিত্ব দ্বন্দ্বে, মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে। এটা ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

তেমনি দুর্ভাগ্যজনক ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, সংক্ষেপে ন্যাপের বিভাজন। ন্যাপও সূচনালগ্নে বিপুল রাজনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভাজক অজুহাতে অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদের অদূরদর্শী পদক্ষেপে ন্যাপের বিভাজন ব্যক্তিতন্ত্রবাদী ধারায় (মোজাফ্‌ফর ন্যাপ)। পরবর্তীকালে ছাত্র রাজনীতিতেও অনুরূপ বিভাজন প্রবণতা ব্যক্তিতন্ত্রভিত্তিক- যেমন ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ, মতিয়া গ্রুপ ইত্যাদি)। এটাও দীর্ঘ আলোচনার বিষয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অবাঞ্ছিত চরিত্র ব্যক্তিত্ববাদী বিভাজন, নেপথ্যে আদর্শিক প্রভাব থাকলেও এই ব্যক্তিত্ববাদী রাজনীতি সাংগঠনিক ও যৌথ নেতৃত্ব বিচারে শুভ ফল দিয়েছে বলে মনে হয় না। সংগঠনের গুরুত্ব তাতে কমেছে। এ দেশের কিংবদন্তিসুলভ প্রভাবশালী হাতেগোনা কয়েকজন নেতার ক্ষেত্রে কথাটা সত্য। তাতে দলে প্রেরণা সঞ্চারিত হলেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আদর্শ পুরোপুরি রক্ষিত হয়নি। এ বিষয়টিও দীর্ঘ আলোচনার, আপাতত উহ্য।

তিন

পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশক, একুশ থেকে একাত্তর- জাতীয় রাজনীতি ও ছাত্র রাজনীতিতে যে উদ্দেশ্য-লক্ষ্য ও আদর্শিক প্রেরণা ছিল, তাতে কিছু বিভ্রান্তি বা সমালোচনার বিষয় থাকলেও তাতে দুর্নীতি ও সমাজবিরোধী চরিত্রের বিন্দুমাত্র আভাস ছিল না। এটা একদিক থেকে অগণতন্ত্রী, সমরতন্ত্রী, ফ্যাসিস্ট রাজনীতির প্রতিক্রিয়ার দান। তাই একাত্তরে 'স্বাধীন বাংলাদেশের' পক্ষে স্লোগান দলমত নির্বিশেষে। তখনকার রাজনৈতিক ইশতেহার ও প্রচারপত্রগুলো তার প্রমাণ বহন করে।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আবারও বিভাজন, পাকিস্তানি সমরতান্ত্রিক শাসনের ভূত, যা স্বৈরশাসন নামে পরিচিত। ইতোমধ্যে রাজনীতিতে একদিকে আদর্শিক দূষণ, অন্যদিকে দুর্নীতি, যা ব্যাপক আর্থসামাজিক দুর্নীতিতে পর্যবসিত। রাজনীতিতে এর অনুপ্রবেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্র রাজনীতিকেও দূষিত করেছে। সে দুর্নীতির নানারূপ- চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গুম, খুন থেকে বহু অনৈতিকতায় বিস্তৃত। শিক্ষায়তন এ ধারায় দূষিত, বিশেষ করে নানা ধারার বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়ে। অনেক হত্যায় কলুষিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বুয়েট, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী। আপাতত শেষ উদাহরণ বুয়েটে নির্মম নির্যাতনে মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যা, যা ছাত্রসমাজসহ দেশকে তোলপাড় করেছে। আর অনৈতিকতার বিশেষ উদাহরণ আলোড়ন সৃষ্টিকারী মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান হত্যা।

এই ছাত্র-রাজনৈতিক দূষণ ব্যাপক সামাজিক দুর্নীতি শুধু সামাজিক মূল্যবোধই বিনষ্ট করেনি, মানবিক চেতনারও বিনাশ ঘটিয়েছে। অন্যদিকে উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রবল করে তুলেছে একটি অর্থনৈতিক শ্রেণির সীমিত ভার্টিক্যাল প্রবৃদ্ধি-শ্রীবৃদ্ধি, যা নৈতিক মূল্যবোধও নষ্ট করেছে। অনৈতিকতার বহু সামাজিক ঘটনা তার প্রমাণ, যা আবার ছাত্রসমাজকেও প্রভাবিত করেছে।

সামাজিক দুর্নীতির উদাহরণ সীমা-পরিসীমাহীন। সেটা মূল আলোচ্য নয়, আনুষঙ্গিক। এ বিষয়ে দু-একবার ওবায়দুল কাদেরের সমালোচনামূলক মন্তব্য শোনা গেছে। ভূমিখেকো, বালুখেকো, পাহাড়খেকোরা বেপরোয়া। একটি ছোট্ট শিরোনাম- 'বুড়িচং-এ বেপরোয়া সিন্ডিকেট'/গোমতীর বালু লুটে প্রতিবাদ করলেই প্রাণনাশের হুমকি। প্রাণ বড় সস্তায় বিকোয়। ভাবা যায় না, বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে এত নির্মমতা, এত দুর্নীতি! 'সিন্ডিকেট' প্রশ্নে এসে যায় বিগত দিনেই 'চাল নিয়ে চালবাজি' (কথাটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার), আর এখন পেঁয়াজ নিয়ে পেঁয়াজবাজি (মুনাফাবাজি)। কিছুতেই পেঁয়াজের দাম কমছে না অবিশ্বাস্য শিখরচূড়া থেকে। থাক সামাজিক প্রসঙ্গ।

প্রবীণ সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলন উপলক্ষে লেখা কলামে একে পূর্ব আদর্শের চর্চায় ফিরে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আর আমি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের রাজনীতির উদাহরণ টেনে একই কথা বলব। কে একজন যেন, ঠিক মনে নেই, দলপ্রধানের উদ্দেশে বলেছিলেন : 'ছাত্রলীগকে সামলান'। এখন তো শুধু ছাত্রলীগ নয়, অবস্থাদৃষ্টে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের বিরুদ্ধে, সেই সুবাদে ক্যাসিনোকাণ্ডের চরম দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীকে এমন নির্দেশ দিতে হয়। একটি দৈনিকে খবর : 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলে দেশের প্রকৃত আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সুশাসনভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।' তার বক্তব্য, সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা। এটা দেশের মানুষ মাত্রেরই কথা।

আমরা তার সদিচ্ছায় আস্থা রেখেই বলছি, এই যে পেঁয়াজ নিয়ে মুনাফাবাজ সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে সাধারণ মানুষের আর্থিক সমস্যা তৈরি করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা লুটছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপাতত দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি নেই। গুদামে অভিযান চালালেই বোঝা যাবে। এদেরকে থামানো কি খুব কঠিন কাজ?

বরাবরের মতো আবারও আমাদের আহ্বান : রাজনৈতিক সুশাসনের সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ চালাতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ হবে না। দুর্নীতির বিষবৃক্ষ বাড়তেই থাকবে। ক্যাসিনোকাণ্ড ও পেঁয়াজকাণ্ডের মতো নানা কাণ্ডের নেপথ্য নায়কদের মুখোশ উন্মোচন অত্যাবশ্যক। অভিযানে চাই শতভাগ স্বচ্ছতা। সেইসঙ্গে রাজনীতির পরিচ্ছন্নতা। না হলে সব সাধু উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।

ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক