তিন অধ্যায়ের সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সমাবর্তন

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯      

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ এবং উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয় হিসেবে এটি সমগ্র বিশ্বে সুপরিচিত ও স্বনামধন্য। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অতীত ও ঐতিহ্যিক ইতিহাস। পৃথিবীর সব দেশই নিজস্ব ও বৈশ্বিক প্রয়োজনে উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ হিসেবে গড়ে তোলে নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ ঐতিহ্যের অধিকারী; একটি জাতিরাষ্ট্রের জন্মদানে গৌরবময় ভূমিকা পালনকারী পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি স্বতন্ত্র মর্যাদায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোন্নত মর্যাদা ও অবস্থানে সমাসীন হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, '৭১-এর মহান মুক্তিসংগ্রাম, '৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, ২০০৭-এ ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তনসহ বাঙালির অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সব আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎসমূলেও রয়েছে প্রাণপ্রিয় এই বিদ্যাপীঠ; দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রাণকেন্দ্র হিসেবেও এ বিশ্ববিদ্যালয় অব্যাহত গতিতে তার ঈপ্সিত ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বাঙালি জাতি ও স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব সম্পূর্ণ আলাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯২১ সালের ১ জুলাই তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক আর ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছিল। রজতজয়ন্তী, সুবর্ণজয়ন্তী, হীরক জয়ন্তী, প্লাটিনাম জয়ন্তী শেষে এ বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে তার শতবর্ষ জয়ন্তীর পানে। আর মাত্র এক বছরান্তেই সমুপস্থিত হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ; এক শতাব্দীকালের সাক্ষী আর ইতিহাসের তিন অধ্যায়ের (ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ) পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার এক অনন্য রূপ পরিগ্রহ করবে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালের ছোট্ট জ্ঞানবৃক্ষটি স্বল্প পরিসরে তার যাত্রা শুরু করলেও কালের পরিক্রমায় আজ তা অভিজ্ঞতা, স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও খ্যাতির মানদণ্ডে বিশাল এক মহিরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয় এক হাজার ৯৯৯ জন শিক্ষক, চার হাজার ৪৫৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৪৩ হাজার ৩৮৫ জন শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর; রয়েছে ১৩টি অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৬০টি গবেষণা কেন্দ্র, ১৯টি আবাসিক হল ও চারটি ছাত্রাবাস নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর পরিবার। অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প কলেজ ও ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ১৩৮টি; এরই সঙ্গে সম্প্রতি দেশের বিখ্যাত সাতটি সরকারি কলেজ, এক হাজার ১৫৮ জন শিক্ষক, ৮১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আর প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়েছে। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অন্যতম বৃহত্তম শিক্ষায়তন হিসেবে পরিগণিত। বাস্তবিক অর্থে এ বিশ্ববিদ্যালয় আজ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য বিনির্মাণ ও ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন অভিযাত্রার সক্রিয় ও গর্বিত অংশীদার। শুধু পরিসংখ্যান আর কলেবরেই নয়, শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক মানদণ্ডে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকৃত। আজ ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত গ্র্যাজুয়েটদের অংশগ্রহণে ইতিহাসের ৫২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে; যাতে ২০ হাজার ৭৪৬ জনকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, ৮২ জনকে এমফিল ও ১১১ জনকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ৭৫ জনকে ৯৪টি স্বর্ণপদক দেওয়া হবে। রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এ সমাবর্তনে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর কসমিক রে রিসার্চের পরিচালক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থবিজ্ঞানী ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. তাকাকি কাজিতা আমন্ত্রিত সমাবর্তন বক্তা হিসেবে অভিভাষণ প্রদান করবেন। সমাবর্তনে তাঁকে 'ডক্টর অব সায়েন্স' প্রদান করা হবে।

ব্রিটিশ শাসনাধীন সময়ে লর্ড লিটন বাংলার গভর্নর থাকাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। অবশ্য এর পূর্বে প্রথম বিশেষ সমাবর্তন ১৯২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্জন হলে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নিয়মিত ২৪ বার (১৯২৪-১৯৪৬) সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে সর্বশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালের ২১ নভেম্বর। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম সমাবর্তন হয় ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমলে ১৫ বার (১৯৪৮-১৯৭০) সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়, যার সর্বশেষটি ছিল ১৯৭০ সালের ৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯তম সমাবর্তন। দীর্ঘ ২৯ বছর বিরতির পর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর, সেটি ছিল ৪০তম সমাবর্তন। অথচ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর প্রথম সমাবর্তনের ইতিহাস রচিত হওয়ার কথা ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সেই সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমাবর্তনের যাবতীয় প্রস্তুতি সুসম্পন্ন করেছিল। জাতীয় দৈনিকে এ উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল বিশেষ ক্রোড়পত্র। কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেটে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে সেই স্বর্ণালি ইতিহাস সেদিন রচিত হতে পারেনি। এরপর ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আরও দশটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়, যার ছয়টিই অনুষ্ঠিত হয়েছে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের মেয়াদকালে (২০০৯-২০১৭)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনে বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক'জন হলেন- আর্ল অব রোলান্ডসে জিসিআইই (ডক্টর অব লজ), পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম (ডক্টর অব সায়েন্স), ড. ফ্রেডারিকো মায়ার (ডক্টর অব সায়েন্স), ড. আব্দুল্লাহ গুল (ডক্টর অব লজ), বান কি মুন (ডক্টর অব লজ), ইরিনা বোকোভা (ডক্টর অব লজ), প্রণব মুখার্জি (ডক্টর অব লজ), ড. রল্‌ফ ডিয়ে্যটার হিউয়ার (ডক্টর অব সায়েন্স), ফ্রান্সিস গ্যারি (ডক্টর অব লজ), ড. অমিত চাকমা (ডক্টর অব সায়েন্স), ইউকিয়া আমানো (ডক্টর অব লজ) প্রমুখ। উচ্চতর গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১-২০১৮) সর্বমোট এক হাজার ৫৮৮ জনকে এমফিল ও এক হাজার ৭০৮ জনকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করেছে। কালের পরিক্রমায় আজ ৫২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি একদিকে যেমন উৎসবের সমাবর্তন; অন্যদিকে এই দ্বিতীয়বারের মতো ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিন্ন তাঁবুতে অধিভুক্ত সাত কলেজের গ্র্যাজুয়েটবৃন্দ সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করছেন। পুরো ক্যাম্পাসই সেজেছে অপরূপ সাজে, সর্বত্রই তারুণ্যের বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর ক্যামেরার ঝলকানিতে মুখরিত হচ্ছে প্রাণের এই বিদ্যাপীঠ। সমাবর্তন দিবসটি একদিকে যেমন আনন্দের, সম্মানের; অন্যদিকে বিদায়ের বিষাদময় সুরও যেন বেজে ওঠে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে অংশগ্রহণকারীদের উল্লাসে ভরে উঠুক ঐতিহ্যিক ও মায়াবী ক্যাম্পাস আর সাফল্যের বনলতায় আচ্ছন্ন হোক ৫২তম সমাবর্তন- এ প্রত্যাশাই রইল।

অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়