উচ্চ আদালতে মুখোমুখি দু'পক্ষ

বিএনপির আইনজীবীরা আইনের ঊর্ধ্বে নন

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯      

ফরিদুল আলম

ডিসেম্বরের ৫ তারিখ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি নিয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা যে কায়দায় আদালতের প্রতি জামিনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছেন, তা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে নজিরবিহীন। আপিল বিভাগের নির্দেশের পরও সিনিয়র আইনজীবীসহ দলীয় আইনজীবী ও একশ্রেণির বহিরাগত মিলে যেভাবে 'জামিন চাই', 'জামিন চাই' বলে আদালতের বিচারকার্যকে বাধাগ্রস্ত করেছেন, এই অবস্থায় প্রধান বিচারপতি বাধ্য হয়ে মন্তব্য করেছেন- 'বাড়াবাড়িরও একটা সীমা আছে।' এরপরও তারা আদালত কক্ষের ভেতর ও বাইরে দিনভর তাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যান। একটি সামান্য বিষয় অর্থাৎ আদালত খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে যে কোনো উপায়ে প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়ার পরও আইনগত প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা না করে সর্বোচ্চ আদালতে দাঁড়িয়ে এ ধরনের প্রতিবাদ কেবল আদালত নয়, দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি তাদের চরম অশ্রদ্ধার প্রকাশ।

সঙ্গত কারণেই বলা যায়, তারা কি আসলে আইন-আদালতের ঊর্ধ্বে? একজন সাধারণ মানুষের জন্য দেশের প্রচলিত আইন যেভাবে কাজ করবে, তাদের জন্য ভিন্নভাবে কাজ করার কোনো অবকাশ নেই। আমরা জনসাধারণ এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, সর্বোচ্চ আদালত বিচার প্রার্থীর শেষ ঠিকানা। এর মর্যাদার সঙ্গে সবার স্বার্থ জড়িত রয়েছে। তারা যদি এহেন কর্ম করে রেহাই পেয়ে যান, তবে এটি একটি দুঃখজনক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাই প্রত্যাশা থাকবে, বিষয়টি যেন গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে বিচার বিভাগের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখা হয়।

খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে এতদিন ধরে বিএনপির পক্ষ থেকে বলে আসা হচ্ছিল যে, সরকার চায় না বলে তার জামিন হচ্ছে না। যখন দেখা গেল তার এই জামিনের বিষয়টি আদালতের পক্ষ থেকেও একাধিকবার নাকচ করে দেওয়া হলো, তখন নতুন করে গল্প ফাঁদা হলো- তিনি শারীরিকভাবে ভীষণ অসুস্থ এবং তার উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে বাইরে যাওয়া দরকার। যেখানে দেশের বরেণ্য চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড একাধিকবার এ বিষয়ে তাদের প্রতিবেদনে উলেল্গখ করেছে যে, তার যে সমস্যা তা অনেকটা বার্ধক্যজনিত এবং তিনি এমন কোনো অসুস্থতায় ভুগছেন না, যার সমাধান দেশের বাইরে চিকিৎসার মধ্য দিয়ে হতে পারে। এর আগেও বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের পরিচালক এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, চিকিৎসকরা নিয়মিতভাবে তার চিকিৎসাসেবার জন্য গেলেও অনেক সময় তার পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করা হচ্ছে না। তার শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি জানানোর পর আইনগতভাবে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এখন তিনি যদি সহযোগিতা না করেন, এর অর্থ দাঁড়ায়- হাসপাতালে তার যথেষ্ট চিকিৎসা হচ্ছে না এবং তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বাইরে যেতে হবে। বিষয়টি অনেকটা আদালত কক্ষের ভেতর বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের আচরণের মধ্য দিয়ে প্রমাণ পাওয়া গেল। এখানে স্পষ্টভাবে যে বিষয়টি টের পাওয়া যাচ্ছে তা হচ্ছে, জামিন নিয়ে বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজনে এই মুহূর্তে যা করা প্রয়োজন, তারা সেটা করতে দ্বিধা করছেন না।

খালেদা জিয়া যে অন্যায় করেছেন এবং যে শাস্তি ভোগ করছেন, তা জামিনযোগ্য। তাই প্রশ্ন, একটি জামিনযোগ্য মামলায় তারা নেত্রীকে জামিনে বের করে নিয়ে আসতে পারছেন না কেন? তারা আসলে আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি, প্রতিবাদ ও সর্বশেষ আদালত কক্ষের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতেই যদি অধিক মনোযোগী থাকেন, তবে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পাদনের কাজটি নিশ্চয়ই তাদের হয়ে সরকার করে দেবে না। তারা কি আসলে এটাই বোঝাতে চাইছেন? জনগণের সামনে 'সরকার খালেদা জিয়াকে জামিন দিচ্ছে না'- এমন যুক্তি যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, এর বিপরীতে জনগণের মধ্যেও যে স্বাভাবিকভাবে এই বোধের উদয় ঘটছে, সরকার আসলে জামিন দেওয়ার কে- সে বিষয়ে তারা কোনো ধারণাই রাখেন না।

বিএনপিকে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এটাও স্মরণে রাখতে হবে যে, একটি দলের প্রধান কারাগারে বন্দি, তার মুক্তির জন্য সংগ্রাম এবং আইনি চেষ্টা যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ জনগণের উন্নয়নে তারা কতটুকু কর্মসূচিনির্ভর হয়ে তাদের রাজনীতি করে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে আলোচনা করার মতো এবং সরকারের সমালোচনার মতো অনেক উপাদান রয়েছে। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে একটিবারের জন্য জনগণের হয়ে তাদের প্রতিবাদ করতে দেখা গেল না। ফলে সরকারের অনেক সাফল্যের পরও কিছু ব্যর্থতা না চাইলেও মানুষকে নীরবে হজম করে যেতে হচ্ছে। ব্যক্তিপূজার যে রাজনীতি, এর অবসান না ঘটলে জনস্বার্থের রাজনীতির বিকাশ ঘটবে না।

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়