উচ্চ আদালতে মুখোমুখি দু'পক্ষ

রাষ্ট্রপক্ষের বাড়াবাড়িই হট্টগোলের কারণ

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯      

আবদুল লতিফ মাসুম

খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদনের শুনানি পেছানোকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার আদালত কার্যক্রমে যে অচলাবস্থা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ ২২ মাস ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে। গত বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চেরিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মামলার শুরু থেকে এ পর্যন্ত নানা ধরনের জটিলতা ও সময়ক্ষেপণে তার জামিন আবেদনে ইতিবাচক সাড়া পায়নি- এ অভিযোগ আইনজীবীদের। আইনগতভাবে এ ধরনের মামলায় সাধারণত জামিন দেওয়া হলেও খালেদা জিয়ার মুক্তি হয়নি। বরাবরই এই অভিযোগ খুব শক্তভাবে উচ্চারিত হয়েছে যে, খোদ সরকারই তার জামিনের প্রধান প্রতিবন্ধক। মামলার পর মামলা এবং খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়া সত্ত্বেও তাকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না। মানবিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ সরকারি মহলে কোনো অনুভূতি সৃষ্টি করছে না। উল্লেখ্য, গত ২৮ নভেম্বর খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানতে মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্ট তলব করেন আপিল বিভাগ। ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রতিবেদন আপিল বিভাগে দাখিল করতে বলা হয় এবং একই তারিখে জামিন আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য করা হয়। যথারীতি শুনানি শুরু হয়। মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন জমা না পড়ায় জামিনের আবেদনের শুনানির জন্য সময় চান অ্যাটর্নি জেনারেল। সেই প্রেক্ষাপটে শুনানি পিছিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ দিন ধার্য করেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ৬ সদস্যের আপিল বিভাগ। এর পর বিএনপির আইনজীবীরা শুনানির তারিখ এগিয়ে আনতে আদালতে তাদের দাবি উচ্চকণ্ঠে তুলে ধরেন। এক পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের বিদ্বেষের কাছে যখন আইনকানুন, রীতি-রেওয়াজ ও সম্মান-সৌজন্য উপেক্ষিত হয়, তখন 'সংক্ষুব্ধ' হওয়ার কারণ ঘটে বেকি।

বাংলদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১-এ বলা হয়েছে, 'আইনের আশ্রয় লাভ ও আইন অনুযায়ী ও কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের ও সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইন অনুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।' ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য অনুচ্ছেদ ২২ অনুযায়ী- 'নির্বাহী বিভাগ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ' করা হয়েছে। বিষয়টি কিতাবে থাকলেও বাস্তবে ছিল না। ১/১১-এর অজনপ্রিয় সরকার এই জনপ্রিয় পৃথক্‌করণের প্রয়াস নেয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিষয়টি যখন আইনে পরিণত করা হয়, তখন অবশ্য এর অনেক ব্যবচ্ছেদ ঘটে। যাই হোক, সর্বোচ্চ আদালতের সীমা-পরিসীমা নিয়ে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিণতি কী হয়েছে, তা সবারই জানা। যাকে উচ্চ আদালতের সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত দেখা গেছে, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন এখন অর্থ আত্মসাতের মামলা দিয়েছে। 'সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!'

বিএনপির আইনজীবীদের সংক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহাবুবে আলমের বক্তব্য। আদালতের শুরুতেই শুনানিতে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, 'আজ মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল। তবে কিছু পরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন দিতে হবে, সময় প্রয়োজন বলে তাকে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।' তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, '৩০ অক্টোবরের একটি রিপোর্ট আছে, শুনানি হতে পারে।' অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, 'এই রিপোর্ট আমাদের দেওয়া হয়নি।' জয়নুল আবেদীন বলেন, 'ওই বোর্ড তো আমরা করিনি। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা খারাপ। চিকিৎসার জন্য বাইরে নেওয়া দরকার।' ওই বোর্ডের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, 'অথরিটি হচ্ছেন বিএসএমএমইউর উপাচার্য। তিনি বলেছেন, 'টেস্ট শেষে রিপোর্ট দিতে পারবেন, সময় লাগবে।' এ সময় জয়নুল আবেদীন বলেন, 'মানবিক আবেদন, জীবন রক্ষার জন্য জামিন দেন।' তখন অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, 'ইমোশনাল কথা বলবেন না।' এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ উত্থাপন করেন, তিনি জানতে পেরেছেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা সংক্রান্ত প্রতিবেদন যথাসময়ই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে সেটি আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে তার জামিনে বাধা দেওয়া হয়। মহাসচিব অন্যত্র বলেন- 'প্রধানমন্ত্রী বললেন, তিনি জেলে রাজার হালে আছেন। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যখন বলেন, সব ঠিক আছে, তখন চিকিৎসকদের ঘাড়ে কয়টা মাথা যে তারা বলবেন, তিনি খুব খারাপ আছেন।'

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ মামলটি বর্তমান সরকার দায়ের করেনি- এ কথা সত্য। 'মাইনাস টু ফর্মুলা' অনুযায়ী দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে ১/১১-এর সরকার কয়েকটি মামলা দিয়েছিল। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় যে, একজনের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আইনানুগভাবে প্রত্যাহার করা হলে অন্যজন সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন কেন? মামলাটি অতি সাধারণ। একজন শাসক আর একজন সাবেক শাসকের নামে প্রতিষ্ঠিত কার্যক্রমে অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন। অলসতায় অথবা অবহেলায় অর্থ ব্যয়িত হয়নি। তা পরে সুদে-মূলে বেড়েছে অনেক। একটি পয়সাও খরচ হয়নি। একটি টাকাও কেউ চুরি করেনি। চুরি না করলে তাকে কি চোর বলা যায়? দায়িত্ব-কর্তব্যের ব্যাপারে আদালতের রায় থাকতে পারে। কিন্তু দেশের আইন অনুযায়ী যেটি অতি সাধারণ মামলা, তা ২২ মাসেও জামিন হবে না, তা কি বিশ্বাসযোগ্য? ৫ থেকে ৭ বছরের সাজার শত শত মামলার জামিন হয়ে যাচ্ছে অথচ খালেদা জিয়াকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না।

মানুষ স্বাভাবিকতার পক্ষে। যখনই অসম্ভব কিছু ঘটে, তখন অস্বাভাবিক আচরণ স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। সর্বোচ্চ আদালতে যা ঘটছে তা নিশ্চয়ই স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট হলো ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল। এটি নষ্ট হলে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। দেশের মানুষ তা চায় না।

অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়