সমস্যার সৃজনশীল সমাধান

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২০      

রহমান মৃধা

বছরের প্রথমেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ দেখে ভালো লেগেছে। আমাদের সময় এমনটি সম্ভব হয়নি, যা এখন হচ্ছে। এখন দরকার প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষার ধরন পাল্টানো, যাতে করে দেশে ভালো, সৃজনশীল ও সুশিক্ষা পাওয়া সম্ভব হয়। কারণ শিক্ষা এমন একটি বিষয়, যা কাজে লাগাতে না পারলে হতাশার সৃষ্টি হয়। পরে তা অকেজো হয়ে সমাজে অশান্তিরও কারণ হতে পারে। সার্টিফিকেট থাকবে অথচ তাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাবে না, তা হবে কেন? অথচ আমরা সেটাই দেখছি, বাংলাদেশে ভূরি ভূরি সার্টিফিকেটধারী শিক্ষার্থী রয়েছে, অথচ একই সঙ্গে বেকারত্বের হারও অনেক। হয়তো বলা হবে, লোকসংখ্যার তুলনায় কর্মের হার কম, যার কারণে বেকারের সংখ্যা বেশি।

আমাদের দেশ কৃষিকাজে ভালো বিধায় অধিক ফলনের কারণে দেখা যায়, কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না। সে ক্ষেত্রে অনেক সময় রাগ করে উৎপাদিত ফসল পুড়িয়ে ফেলে। আবার দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় ফসলের উৎপাদন কম হলে দেশে সংকট দেখা দেয়, সিন্ডিকেট করা হয় সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য। এমন দুষ্টু লোকেরও অভাব নেই দেশে।

এ ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য নানা ধরনের পরিকাঠামো রয়েছে, যাদের কাজ দেশের অবকাঠামোর ধ্রুব উন্নতি (কনস্ট্যান্ট ইম্প্রুভমেন্ট) সাধন করা। এসব কর্তৃপক্ষ যখন তা করতে ব্যর্থ হয়, তখন দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ দেখা দেয়। সবসময় সমস্যা লেগেই থাকে। একটার সমাধান করতেই আরেকটি এসে হাজির। যেমন শিক্ষার ওপর নানা ধরনের রদবদল করা হচ্ছে, ভালো-মন্দ দুটিই হচ্ছে। তা সত্ত্বেও স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না। যেহেতু জনবহুল দেশ, সীমিত সুযোগ-সুবিধা আমাদের; তাই সবসময় সৃজনশীল উপায়ে সমাধান খুঁজতে হবে। সে ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যে যেমন জার্মানিতে প্রাইমারি স্তরের তৃতীয় শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীকে যাচাই-বাছাই করা হয়, কোন শিক্ষার্থী কী পড়বে বা কার পক্ষে কী হওয়া সম্ভব।

অনেকটা আমাদের দেশের কৃষকদের মতো। যেমন তারা জ্যৈষ্ঠ মাসে পাট নিড়ানি ও বাছাই কাজ সম্পন্ন করে কোন পাটগাছ ভালো হবে এবং কোন গাছটি হবে না তার ওপর যাচাই-বাছাই করে ভালো পাট উৎপাদনের জন্য। জার্মান শিক্ষা প্রশিক্ষণ পদ্ধতির মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে নবম শ্রেণির পর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা হবে নাকি কর্মজীবন বেছে নেবে। তবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের প্রশিক্ষণের দরজা খোলা থাকে, যদি কেউ পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষা নিতে চায়, যা জার্মানিতে সম্ভব নয়। কারণ এদের বেলা বাছাই পর্ব শেষ হলে নতুন কোনো সুযোগ নেই উচ্চশিক্ষার জন্য।

পাশ্চাত্যের শিক্ষা মডেলকে বিবেচনা করে বাংলাদেশের প্রশিক্ষণের কিছুটা রদবদল করতে পারলে দেশের শিক্ষার মান বাড়বে বৈ কমবে না। সে ক্ষেত্রে যেমন যারা অষ্টম শ্রেণি শেষ করেছে, পড়ার প্রতি আগ্রহ কম বা কর্মে জড়িত হতে চায়, তাদেরকে সেভাবে সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে; যেমন- কাজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা (অন দ্য জব ট্রেনিং)। জোর করে যেহেতু ভালো কিছু করানো সম্ভব নয়, তখন শিক্ষার্থীর চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ধরন তৈরি করে নাগরিকের হাতে দেশের দায়ভার তুলে দেওয়া হতে পারে সাফল্যের এক চমৎকার পরিকল্পনা। মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীর সাফল্য মানেই দেশের সাফল্য।

একজন শিক্ষার্থী যদি অর্ধশিক্ষা গ্রহণ করে, বেকার হয়ে জীবন শুরুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করে এবং পরে যদি সে কোনো কর্ম জোগাড় করতে সক্ষম হয়, তার থেকে তেমন আশানুপাত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হয় না। সৃজনশীলতা ও সহনশীলতা দুটি ভিন্ন জিনিস- এ কথা মনে রেখে দেশের শিক্ষা প্রশিক্ষণ পরিকাঠামোর ওপর কাজ করা আশু প্রয়োজন।

[email protected]