স্বাধীনতা পুরস্কার কার জন্য?

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০

ডা. এম এ হাসান

দেখা গেছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন- মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে, দেশের সাধারণের অসাধারণ ত্যাগগুলো মলিন করে, তাদের অবিশ্বাস্য অর্জনগুলো কেড়ে নিয়েছে সমাজের সুবিধাবাদী ও চতুর লুটেরাগোষ্ঠী। এভাবেই সাধারণের সম্পদ ও হিন্দুদের সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে সব পরিত্যক্ত সম্পদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অর্জন লুট হয়ে গেল স্বাধীনতার পরপর। এই কারণেই শুরু হলো বিত্তের ব্যবধান এবং উত্থান ঘটল তোষামোদের লেবাস পরা সর্বগ্রাসী এক লুটেরাগোষ্ঠীর। '৭১-এ যুদ্ধের ময়দানে ও পরে দেখেছি, কীভাবে প্রকৃত বীর ও গুণীর অমর্যাদা হয় বা তার অবদান আড়ালে চলে যায়।

কোনো প্রকৃত বীর কোনো পার্থিব লোভে প্রাণ বিসর্জন দেন না বা কোনো প্রত্যাশা নিয়ে লড়েন না। আর আমরা কোনো দান ও পুরস্কার দিয়ে তার দান ও প্রাণের মূল্য পরিশোধ করতে পারি না। যারা দেশের জন্য জেনেবুঝে প্রাণ দিয়েছেন বা জনগণের কল্যাণে, তাদের মনের ভুবন নির্মাণে, নিজেদের সবটুকু দিয়েছেন বা দিচ্ছেন, তাদেরকে কীভাবে আমরা ভরিয়ে দিতে পারি! আমরা যদি শহীদ মেজর হায়দার, শহীদ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন, শহীদ লে. সেলিম, শহীদ সুবেদার মোমেন, শহীদ সুবেদার ইসমাইল বা বীর দুলা মিয়ার মতো বীর যোদ্ধাদের সম্মানিত করতে না পারি- এ দীনতা সমগ্র জাতির। আমরা যদি শহীদ ড. জোহা, শহীদ ড. জিসি দেব, ড. শহীদুলল্গাহ্‌, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, মুনীর চৌধুরী, আবুল হাসিম, আবুল মনসুর, কমরেড মোজাফ্‌ফর ও মণি সিংহকে সর্বোচ্চ পদক দিয়ে সম্মানিত না করতে পারি, তাতে অসম্মানিত হয় জাতি। আমরা বঙ্গবন্ধুর মতো পাহাড়কে কোনো পদকের সীমাবদ্ধতায় না আনতে পারলেও তার কাছের মানুষ মওলানা ভাসানী ও তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ তার যোগ্য উত্তরসূরি শহীদ তাজউদ্দীন এবং শহীদ কামারুজ্জামানকে মরণোত্তর স্বাধীনতার পদক প্রদান করে পদকের মর্যাদা ওপরে ওঠাতে পারতাম। এতে পদকের সূচকও নির্ধারিত হতো।

ব্যক্তিগত আনুকূল্য, তোষামোদ, অর্থের বিনিময় ও সার্বিক ভ্রান্তিবিলাস স্বাধীনতার পুরস্কারকে কতটা কলঙ্কিত করতে পারে, তা জাতি দেখে ফেলেছে। '৭১-এর গণহত্যার সঙ্গে জড়িত এক পীরকে পদক দান থেকে শুরু করে বর্তমান সময়টাতে যে পদ্ধতিতে অযোগ্যদের স্বাধীনতার পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে, তা সমগ্র জাতির জন্য চূড়ান্ত অবমাননা। এক-আধজনকে পুরস্কারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়াটি প্রকৃত অর্থে কারও জন্য সম্মানজনক নয়। পুরস্কারের সঙ্গে 'স্বাধীনতা' কথাটি সংযুক্ত থাকায় স্বাধীনতার কারিগর তথা সব মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণের আত্মপরিচয় ও সম্মানের সঙ্গে এটি একাকার হয়ে আছে। সততার বেদিতে অধিষ্ঠিত থেকে যে ব্যক্তি ত্যাগ ও কর্মে জাতিকে গর্বিত করবে, তাদের চলার শক্তি জোগাবে, তাদের প্রেরণার আধার হয়ে থাকবে- মন ও মেধার সিঁড়ি নির্মাণ করবে পদক তাদের জন্য। বাঙালি মনের ভুবন নির্মাণে, রুচি, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের ভাণ্ডার নির্মাণে, মানবতার আলোকবর্তিকা নির্মাণে যারা ভূমিকা রেখেছে, পদক তো তাদেরই জন্য।

জনগণের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, জাতির পরিচয় সমুন্নত করার জন্য যারা নিজেদের আজীবন উৎসর্গ করেছে, তাদের জন্যই পুরস্কার। আমাদের মনের ভুবন নির্মাণে ধীরেন দত্ত ও রণদা প্রসাদ থেকে শুরু করে ড. শহীদুলল্গাহ্‌, ড. জিসি দেব, ড. আহমেদ শরীফ, স্যার ফজলে হাসান আবেদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- এদের চেয়ে কে বেশি অবদান রেখেছে! এরাই স্বাধীন জাতির মনন রূপায়ণের কারিগর। চিকিৎসকদের মধ্যে যারা বাতিঘর ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন- ডা. নন্দী, অধ্যাপক ডা. জোহরা, প্রয়াত অধ্যাপক ডা. রাব্বী, মনসুর মিডিয়ার আবিস্কারক অধ্যাপক ডা. মনসুর- এদের চেয়ে যোগ্য কে রয়েছে? ডা. সালেক তালুকদারের গুরু অধ্যাপক ডা. ঘাস্ট যিনি কিনা পঙ্গু হাসপাতালের রূপকার, তাকে সম্মানিত করলে সব চিকিৎসককে সম্মানিত করা হবে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ও অধ্যাপক রেহমান সোবহান এ পদকের যোগ্য দাবিদার।

আর ডা. জাফরুলল্গাহ যিনি কিনা মুক্তিযুদ্ধের সময় ২নং সেক্টরে বিশ্রামনগর হাসপাতাল ও গরিবের চিকিৎসালয় গণস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠায় এবং ওষুধনীতি প্রণয়নে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি পুরস্কারের বাইরে কেন? এ ক্ষেত্রে আরেকজনের নাম না করলেই নয়, তিনি হলেন অধ্যাপক ডা. হারুন, যিনি স্বল্পমূল্যে কিডনি চিকিৎসা সম্ভব করে অসামান্য অবদান রাখছেন। অন্ত্র বিশেষজ্ঞ ডা. মাহমুদের পরামর্শ ছাড়া ওই বিষয়ে বাংলাদেশে কেউ গবেষণা করে বলে আমার জানা নেই। খাবার স্যালাইন তৈরিতে যারা ভূমিকা রাখল তাদের কথা যেন চিকিৎসকরা ভুলেই গেছে। এই অভাগা দেশে গোলাম আযমের মতো স্বঘোষিত অধ্যাপকদের নাম শুনে আমাদের কান অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

কবি আল-মাহমুদ, আবুল হাসান, সিকান্দার আবু জাফর, আবুল হোসেন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহাকে পদকের হিসাবের বাইরে রাখা কতটুকু সঙ্গত, তা ভাবার বিষয়। এরা সবাই স্বাধীনতা পদক ও স্বীকৃতির দাবিদার। সাংবাদিকদের মধ্যে তোয়াব খানের প্রতি অবহেলার যৌক্তিকতা কতটুকু- সেটাও ভাবার বিষয়।

বঙ্গবন্ধু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি সোচ্চার ছিলেন সাধারণের অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির বিষয়ে। জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ ছিল তাঁর জীবনের আরাধ্য বিষয়। সম্ভবত এ কারণেই তাঁকে ঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা যেমন তাঁর ওইসব স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারিনি, তেমনি তাঁর হত্যার প্রেক্ষাপট তথা নেপথ্যের কুশীলবদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছি।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, গবেষক; আহ্বায়ক, ওয়ার ক্রাইম্‌স ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি