মহামারির ইতিহাস বলে, যে কোনো প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় পড়ে নারী ও শিশুরা। মহামারির আকার যখন ব্যাপক হয়, তখন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে রোগটি সামলাতে। আর তাই একটি মহামারি নারীদের জন্য পৃথিবীকে আরও বৈষম্যমূলক করে তোলে। পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার সংক্রমণ এর একটি উদাহরণ। পরিসংখ্যান বলছে, ইবোলার কারণে সেখানে যত মানুষ মারা গেছে, তার চেয়ে বেশি নারী মৃত্যুবরণ করেছেন প্রসবকালীন মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ায়। এর বাইরে বেড়ে গিয়েছিল নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের ঘটনাও।

বাংলাদেশে করোনা সংকটে নারী-পুরুষ সবাইকেই ঘরে থাকতে হচ্ছে। বেশিরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অনলাইন কর্মসূচির মাধ্যমে ঘরে থেকে অফিসের কার্যক্রম চালু করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, কাঁচাবাজার এবং ওষুধের দোকান ছাড়া সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট বন্ধ। ছেলেমেয়েরা গৃহবন্দি। বর্তমান সংকট যদি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক হতে থাকে, নারীর জীবনে এর নানামুখী নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেবে। বিশ্বময় এখনও একই বাস্তবতা- নারীরাই ঘর সামলান এবং বাচ্চাদের দেখাশোনা করেন। গত জানুয়ারি মাসে গ্যালাপের একটি জরিপ জানায়, সন্তানদের দেখাশোনা ও দেখভালের ক্ষেত্রে প্রতিদিন পুরুষদের তুলনায় নারীদের ৭ গুণ সময় দিতে হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নারীদের সেই চাপ আরও বাড়িয়ে তুুলেছে। গৃহবন্দি অবস্থায় নারীদের একই সঙ্গে অফিস ও গৃহস্থালি কাজ, সন্তান ও পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিদের যত্ন-আত্তি ইত্যাদি কাজের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে, যা নারীদের শারীরিক ও মানসিক অবসাদগ্রস্ততার ঝুঁকিতে ফেলছে।

করোনা ভাইরাসে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা; বিশেষ করে চিকিৎসক ও নার্সরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত লোকবলের ৭০ শতাংশই নারী। আমাদের দেশেও এ সংখ্যা কম নয়। ফলে এখন পর্যন্ত প্রতিষেধক আবিস্কার না হওয়ায় এ রোগের ক্ষেত্রে বিশাল ঝুঁকির মুখে রয়েছে এ খাতের নারীরা। এ ছাড়া, এই সংকটকাল দীর্ঘমেয়াদি হলে যেসব পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দু'জনই চাকরি করেন, তাদের একজনকে পারিবারিক স্বার্থে চাকরি ছাড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে নারীদের চাকরি ছাড়ার আশঙ্কাই বেশি। আয়ের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অসমতা এই সিদ্ধান্তে প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে।

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়, 'লকডাউন' পারিবারিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, বাল্যবিয়ে ইত্যাদির মতো অপরাধ বেড়ে যেতে পারে। গত ২৮ মার্চ দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির কারণে পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ার এক বৈশ্বিক চিত্র তুলে ধরেছে। সর্বত্রই সহিংসতার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে এবং জরুরি হেল্পলাইন নম্বরে সাহায্য চেয়ে ফোনকলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে বহু গুণ। অবশ্য নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বা ভয়ে অনেকেই ফোন করা থেকে বিরত থাকছেন। খুদে বার্তা এবং ই-মেইলের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার পরিমাণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভিন্ন চিত্র আশা করা যায় না।

আগে কাজের কারণে কিছু সময় অন্তত দূরে থাকা গেলেও এখন নির্যাতকের সঙ্গে একই বাসায় ২৪ ঘণ্টা থাকা নির্যাতনের মাত্রা যে আরও বাড়িয়ে দেবে, তা সহজেই অনুমেয়। অনেক প্রবাসী এই সংকটে দেশে ফিরে এসেছেন এবং অনেক জায়গায় বাল্যবিয়ে হচ্ছে বলে খবরও আসছে। এ ছাড়া, মানুষ এখন স্বাভাবিকভাবেই ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাবে। আর এ ক্ষেত্রে সাইবার অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, দুর্যোগ মোকাবিলায় আনুষঙ্গিক ক্ষতির আশঙ্কা রোধে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিলে সম্ভাব্য ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। তাই করোনা মোকাবিলায় জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি নারীর সুরক্ষায়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

ম্যানেজার, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং; জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি, ব্র্যাক

মন্তব্য করুন