করোনা ও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০

শাহদাব আকবর

অজানা অদৃশ্য ভাইরাস নামক এক শক্তি বিশ্বব্যাপী একচেটিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু। রাশ টানতে নাভিশ্বাস। আর পরাক্রমশালী সারাবিশ্বের আদম সন্তানরা চোরের মতো গর্তে ঢুকে বসে আছে। মাঝে মধ্যে খাদ্য অন্বেষণে বের হয়, তারপর আবার নিজের গর্তে এসে আশ্রয়। আজ মনটা খুব উদাস, অশান্ত। নানা রকম ভাবনা এসে মনে নাড়া দিচ্ছে। কখনও ভেবে দেখেছি, এই যে আমি বা আমরা কে? কিসের এত দম্ভ?

মানুষকে জন্ম থেকে জানানো হয়েছে, তারা সৃষ্টির সেরা জীব। মন ভালো করার জন্য বন্দুকের ট্রিগারে অঙ্গুলির স্পর্শেই আকাশে উড়ে যাওয়া একঝাঁক সাদা বক বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা, মাটিতে পড়ে লুটাচ্ছে। আর তা দেখে ট্রিগার দাবানো মনুষ্যহীন জীবরা উল্লাসে আত্মহারা। তারপর সেই মৃত পাখিগুলো হাতে ঝুলিয়ে বীর বেশে বাড়ি ফেরা।

বিশ্বে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য একের পর এক আনবিক বোমার পরীক্ষা। শিল্প বিপ্লবের ফলে প্রকৃতি দূষণ- কী করিনি আমরা। বিশ্বের হাজার কোটি মানুষ প্রতিবাদহীন- ভ্রুক্ষেপহীন নিশ্চুপ। এত যাদের ক্ষমতা তারা আজ চোখে না দেখা অজানা শত্রুর আতঙ্কে নিয়েছে গর্তে আশ্রয়। নিউক্লিয়ার, ক্যালাসনিকভ, মিসাইল- নাম না জানা কত অস্ত্র আজ যেন কোনো কাজেই আসছে না। কাজে আসছে না দুর্বল থেকে লুণ্ঠিত অঢেল সম্পদ। নিজেকে আজ যতবার আয়নায় দেখছি, ঘেন্নায় সর্বশরীর যেন ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে বারবার। খারাপ লাগছে এই ভেবে, হয় আমি অন্যায়কারী, নতুবা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছি- না হয় প্রতিবাদ করিনি। অন্যায়ের পর অন্যায়, অত্যাচারের পর অত্যাচার- এর হিসাবের খাতা যেন আকাশ ছুঁইছুঁই। কী আমাদের দম্ভ, হিংস্রতা, শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লোভ আর লালসা।

কখনও কি ভেবে দেখেছি আমাদের এই উপমহাদেশের কথা? ২০০ বছর শাসন করেছে ব্রিটিশরা। এক সময় শুরু হলো আন্দোলন। সে আন্দোলনে ছিল উপমহাদেশের সব ধর্মের সন্তানরা। কাঁধে কাঁধ- হাতে হাত মিলে কখন অহিংস কখন বা সহিংস আন্দোলনে সবাই দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা লড়াইয়ে অবতীর্ণ। জানা না জানা কত বীর আত্মাহুতি দিয়েছে মাকে মুক্ত করার জন্য। আলাদা হিন্দু-মুসলমান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কারও স্বপ্নেও ছিল না। কী মুসলিম, কী হিন্দু, কী খ্রিষ্টান, কী বৌদ্ধ- সবাই ছিল এক ও অভিন্ন আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ বংশপরাক্রমায়।

সেকালের রাজনীতিবিদদের অনেকে শুধু নিজেদের ক্ষমতার ভাগাভাগিতে ছিল উন্মত্ত। তারা ছিল দাবাড়ূ- আর জনতা সেই দাবার বোর্ডের জীবন্ত ঘুঁটি। ২০০ বছরের সংগ্রাম তাদের কাছে ছিল অর্থহীন-মর্মহীন। ২০০ বছর শাসন করা শত সহস্র মুক্তিকামী অমর শহীদদের হত্যাকারী ব্রিটিশরা বিদায় নিল সসম্মানে। আর আমাদের উপমহাদেশ হলো ভেঙে চুরমার। ধর্মের নামে হলো দেশ ভাগ। যারা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এক হয়ে করেছিল আন্দোলন, নেতাদের ইন্ধনে ভাইয়ে ভাইয়ে শুরু হলো রক্তের হোলি খেলা। রক্তে রঞ্জিত হলো সমগ্র উপমহাদেশ। কখনও ভেবে দেখেছি কি জনসংখ্যার এই এক কি দুই ভাগ নেতার জন্য কোটি কোটি মানুষের অস্তিত্ব সেদিন হয়েছিল বিপন্ন। কত অসহায় মানুষের আহাজারিতে আকাশ, বাতাস, প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল নিশ্চুপ-নিথর। নীরবে বিসর্জন করেছিল অশ্রু। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধা আর এই উপমহাদেশের নাগরিকরা একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে উদ্ধত, বংশপরাক্রমায় থাকা হিন্দুরা পাকিস্তান ছেড়ে ভারত আর মুসলমানরা তার উল্টো।

শুনেছি, শত বছর আগে এক ধরনের ভাইরাসে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সারাবিশ্বে। সীমাহীন অন্যায়-অত্যাচার আর অসভ্যতার হিসেবের বাক্স পূর্ণ হওয়ায় আবার শতবর্ষ পর মরণঘাতী ভাইরাসের আবির্ভাব। প্রকৃতির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য হয়তো এই ব্যবস্থা।

হয়তো আবার একদিন ভাইরাস চলে যাবে, আবার সব স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। আসুন আমরা নতুন করে ভাবতে শিখি। সবাই মিলে সব ধরনের অন্যায়কে প্রতিরোধ করি। আমরা জনতা- আমরা সব শক্তির উৎস।

রাজনীতিক