কেউ কেউ বলেন, পোয়েট আর প্রোফেটরা প্রায় এক কাতারের মানুষ। তারা একই রকমের প্রাজ্ঞ এবং দূরদর্শী মানুষ। তাদের মানসচক্ষে তারা ভবিষ্যৎ দেখতে পান। অর্ধশতকেরও বেশি আগে জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, 'অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।' এ আঁধার শুধু বাংলাদেশে বা ভারতে নামবে সে কথা কবি বলেননি। বলেছেন, পৃথিবীর কথা। আজ এই তামাম পৃথিবীতে যে অদ্ভুত আঁধার নেমে এসেছে তার নাম করোনা। হন্তারক করোনার আরেক নাম কভিড-১৯। সারা পৃথিবীতে তার মৃত্যুর তাণ্ডব এখনও থামেনি।

নিউজিল্যান্ড করোনামুক্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে। জার্মানিও দাবি করেছে তারা করোনামুক্ত হতে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ করোনামুক্ত হতে পারেনি। বরং তার প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ও ভারতে। বাংলাদেশ ও ভারত দুটি দেশে জনসংখ্যা বেশি এবং ঘনবসতির দেশ। বাসিন্দাদের মধ্যে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা বেশি। এসব দেশে সরকার চাইলেও মহামারি কমাতে পারে না।

বাংলাদেশে প্রথমদিকে হাসিনা সরকার সাফল্যের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধিনিষেধ আরোপ করে করোনার প্রকোপ ঠেকিয়েছিলেন এবং সে জন্যে বহির্বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিলেন। তারপর কী হলো? অবস্থা একটু ভালো হতেই গার্মেন্টস-মালিকেরা আব্দার জানালেন, তাদের কর্মীরা না খেয়ে মরছে। সরকার তাদের কিছু শর্ত দিয়ে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খোলার অনুমতি দিলেন। ব্যবসায়ীরা সেসব শর্ত একটিও মানেননি। লোভের কাছে জীবনের নিরাপত্তা তুচ্ছ হয়ে গেল। গার্মেন্টস কর্মীদের দেখাদেখি অন্যান্য কলকারখানা, শপিংমল খুলে গেল। দলে দলে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে রাস্তায় নেমে এলো। বলা হলো দিনমজুরেরা না খেয়ে মরছিল। এখন তারা বাঁচছে কিনা সে প্রশ্ন কেউ তুলছে না।এখন আবার সরকার কঠোর হয়েছে। লকডাউন ও সোশ্যাল ডিসট্যান্সের ব্যবস্থা আরোপিত হবে বা জোনভিত্তিকভাবে আরোপিত হয়েছে বলে শুনেছি। তাতে বালাই যাবে না। কারণ করোনাভাইরাস যতটা ছড়াবার ততটা এতদিনে সারাদেশেই ছড়িয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষ তো মরেছেই, এখন সে হাত বাড়িয়েছে ওপরতলার দিকে। গত কয়েক দিনে আমরা সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, প্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ, সিলেটের জনপ্রিয় মেয়র কামরানকে হারিয়েছি। হারিয়েছি একদল খ্যাতনামা ডাক্তারকে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। বহু কষ্টে তার প্রাণ বাঁচানো হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনায় আক্রান্ত হননি বটে কিন্তু হোয়াইট হাউসে করোনা ঢুকেছে। বেশ কিছু কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

আমার একান্ত প্রার্থনা বাংলাদেশের গণভবনে যেন করোনা ঢুকতে না পারে। সরকারেরই উচিত সে জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের জীবনের নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর রাখেন না। অনেক সময় বেপরোয়াভাবে সরকারি দায়িত্ব পালনে চলে যান। তাকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির মতো বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাই। তার নিজের জন্য নয়, জাতির স্বার্থে তাকে বেঁচে থাকতে হবে। সুস্থ ও নিরোগ থাকতে হবে।

শুধু গণভবন নয়, সারাদেশের মানুষের জন্যও আমার একান্ত প্রার্থনা, তারা জীবনানন্দ দাশের এই অদ্ভুত আঁধার থেকে যেন মুক্ত হন। মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হোক সারা দুনিয়ায়। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। রোজ ঘরে ঘরে হাহাজারি উঠছে। শেখ হাসিনা দেশের মানুষকে বাঁচাতে তার সাধ্যের বেশি করছেন। কিন্তু তার প্রশাসন? দেশবাসীর মনে আশা ও ভরসা জোগাবার পরিবর্তে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ড. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, 'আগামী দু'তিন বছরেও করোনাভাইরাস তাড়ানো যাবে না।' এখানেই প্রশ্ন ওঠে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আগামী দু'তিন বছরেও যদি ব্যবস্থা নেওয়া না যায়, দেশের মানুষকে বাঁচানো না যায়, তাহলে ড. আজাদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের পদটি আঁকড়ে ধরে আছেন কেন? তিনি পদত্যাগ করে কোনো যোগ্য লোককে পদটি ছেড়ে দেন না কেন?

করোনাভাইরাস আগামী দু'তিন মাসে কেন, সারা বছরেও একেবারে যাবে না। একবার যখন এসেছে তখন যক্ষ্ণা, কলেরা, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া ইত্যাদি ভাইরাসের মতো থেকে যাবে। যক্ষ্ণা, কলেরার মতো প্রতিষেধক আবিস্কৃত হলেই তার প্রকোপ কমবে। এক শ্রেণির বিজ্ঞানী মনে করেন, প্রতিষেধক আবিস্কার ও তার ব্যবহার শুরু হলে করোনার বর্তমান ভয়াবহ প্রকোপ দূর হবে। তবে যক্ষ্ণা, বসন্তের মতোই বছরের একটা মৌসুমে তার আবির্ভাব দেখা যাবে। মানুষকে তার আগে প্রতিষেধক (ইনজেকশন অথবা টিকা) গ্রহণ করে নিজেদের নিরাপদ রাখতে হবে- কলেরা, বসন্ত থেকে যেমন আমরা নিজেদের নিরাপদ রাখি। এই প্রতিষেধক আবিস্কারের জন্য কয়েকটি দেশেই বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই প্রতিষেধক আবিস্কারে এক বছর লাগতে পারে। আবার এক মাসেও আবিস্কৃত হতে পারে। এ ছাড়াও আবহাওয়ার পরিবর্তনে করোনার উপদ্রব হ্রাস পেতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে ড. আবুল কালাম আজাদ কেন দেশের মানুষকে দু'তিন বছর করোনা মহামারি চলবে বলে ভয় দেখাচ্ছেন? নাকি তিনি মানুষকে এই ভয় দেখাচ্ছেন তার স্বাস্থ্য বিভাগের যে অক্ষমতা, অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অনাচারের অভিযোগ কয়েক বছর ধরে শোনা যাচ্ছে, তা ঢাকা দেওয়ার জন্য?

গত শতকের পঞ্চাশের দশকে- অর্থাৎ প্রাচ্য-প্রতীচ্য স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় কম্যুনিজমবিরোধী প্রোপাগান্ডার সবচাইতে বড় লেখক ছিলেন আর্থার কোয়েসলার। সম্ভবত তার পরাভূত দেবতা (The god that failed) গ্রন্থে শেষ চ্যাপ্টারটিতে দেখানো হয়েছে, জওয়াহেরলাল নেহ্‌রুর মতো ভারতের সবচাইতে জনপ্রিয় নেতা (তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন) কম্যুনিস্টদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কম্যুনিস্ট মিত্রদেরই বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষমতা হারিয়ে পার্লামেন্ট ভবন একা একা ছেড়ে আসছেন। কেউ নেই তাকে বিদায় সংবর্ধনা দানের জন্য। এমনকি তার এতকালের স্তাবকের দল ছিল না। নেহ্‌রু যখন পার্লামেন্ট ভবনের সিঁড়ি বেয়ে একা ভবনের গার্ডেনে এসে শেষবারের মতো দাঁড়ালেন, তখন গার্ডেনের বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া বৃদ্ধ মালি গাছ থেকে একটা লাল গোলাপ ছিঁড়ে এনে নেহ্‌রুর কোটের বাটন-হোলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের বিএনপি-জামায়াতিরা এবং বকধার্মিক সুশীল সমাজ নাকি আশা করছেন, শেখ হাসিনা দেশের যতই উন্নয়ন ঘটিয়ে থাকুন না কেন, যদি বাংলাদেশে তার প্রশাসনের অযোগ্যতায় করোনায় ভয়াবহ মৃত্যুর থাবা থেকে দেশবাসীকে বাঁচাতে না পারেন তাহলে তার সরকার ক্ষমতা হারাবে। তখন পার্লামেন্ট থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার চারদিকের স্তাবকদের একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি গার্ডেনের মালিও তাকে একটি লাল ফুল উপহার দেবে না। সবাই 'উদিত সূর্যের পূজায়' ব্যস্ত হয়ে পড়বে।

বিএনপি-জামায়াত ওপরের এই আশায় করোনা-প্রতিরোধে জাতীয় প্রচেষ্টায় অংশ না নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারে এবং তাদের সমর্থক প্রশাসনের একটি অংশও এই একই আশাতে করোনা প্রতিরোধে সক্রিয় না হয়ে দেশের মানুষকে হতাশার কথা শোনাচ্ছে বলে আমার ধারণা। তবে নেহ্‌রু সম্পর্কে আর্থার কোয়েসলারের বিখ্যাত গ্রন্থের ভবিষ্যদ্বাণী যেমন সঠিক হয়নি, তেমনি শেখ হাসিনা সম্পর্কেও 'শকুনি দলের' নেতা ও আমলাদের স্বপ্ন সফল হবে না। নেহ্‌রু ক্ষমতা হারিয়ে নিঃসঙ্গভাবে পার্লামেন্ট ভবন ত্যাগ করেননি। জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেই আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন।

শেখ হাসিনাও জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকে করোনা দূর ও দেশকে অভাব ও দারিদ্র্য মুক্তির পথে এগিয়ে দেওয়ার পর নিজের ইচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সময়মতো সরে দাঁড়াবেন বলে আমার ধারণা। ততদিনে বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত ও তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টের জড়াগ্রস্ত নেতৃত্বের অবসান হবে। দেশ নতুন নেতৃত্বে সুস্থ ও গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের আবির্ভাব দেখবে।

করোনা পরিস্থিতির কথায় আসি। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বেরই করোনার কমবেশি তাণ্ডব চলছে। গত মার্চ মাসে করোনা যখন বাংলাদেশে প্রথম দেখা দেয়, তখনই আমাদের স্বাস্থ্য দপ্তর সতর্ক ও সচেষ্ট হতে পারেনি। তবু প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রয়াসে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল। তারপর যে কারণেই হোক লকডাউন কার্যত তুলে নেওয়ার সময় যে সাবধানতা গ্রহণ করা উচিত ছিল, আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য বিভাগ তা গ্রহণ করতে পারেনি। বিদেশ থেকে- বিশেষ করে করোনা-কবলিত ইতালি থেকে যখন দলে দলে বাংলাদেশিরা দেশে ফিরছিলেন, তাদের সম্পর্কে সতর্কতা গ্রহণ, তাদের প্রয়োজনীয় সময় আলাদা করে রাখার ব্যাপারেও প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। এখন করোনা সম্পর্কে দেশবাসীকে হতাশার বাণী না শুনিয়ে কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন জয়ী হবেই।

মন্তব্য করুন