কৃষকের 'রানীমা' ইলা মিত্র

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২০

শফিক আজাদ

কৃষকের 'রানীমা' ইলা মিত্র

ইলা মিত্র: (১৯২৫-২০০২)

সদ্য স্বাধীন দেশে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের কথা পাঠ্যপুস্তকে কিছুটা স্থান পেলেও ইতিহাস বিকৃতি ও সংকোচনের ধারায় তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। আমার বাবা অল্প শিক্ষিত হলেও খুব মজা করে গল্প বলতে পারতেন। ছোটবেলায় বাবা বাড়ির কাজ করার সময় তার পাশে বসে অগ্নিযুগের বিপ্লবী চন্দ্রশেখর, আজাদ, ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম বসু, বাঘা যতীন, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, নাচোলের রানী ইলা মিত্র প্রমুখ বিপ্লবীর জীবনী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। এখনকার বাবা-মায়েরা সেসব বিপ্লবী সম্পর্কে তেমন কিছু জানেনও না এবং তাদের বাচ্চাদের সে সম্পর্কে কোনো গল্পও শোনান না।

কয়েকদিন আগে দেখলাম ৫০-৬০ জন তরুণ-তরুণী শাহবাগ চত্বরে গোল হয়ে ধর্ষণবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। কানে ভেসে এলো 'ইলা মিত্রের বাংলায় ধর্ষকদের ঠাঁই নাই, সূর্য সেনের বাংলায় ধর্ষকদের ঠাঁই নাই, ইলা মিত্র শিখিয়ে গেছে লড়াই করে বাঁচতে হবে, এই লড়াই বাঁচার লড়াই ... ইত্যাদি স্লোগান। দেখতে দেখতে চারপাশ লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। মনে হলো, এই স্লোগানগুলো যেন এই বুর্জোয়া প্রাণহীন শহরে জীবনের স্পন্দন জাগিয়ে তুলছে।

আজ ১৮ অক্টোবর তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্রের জন্মদিন। ১৯২৫ সালের আজকের এই দিনে ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল নগেন্দ্রনাথ সেনের ঘরে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ইলা মিত্র। তাদের আদি নিবাস ছিল তৎকালীন যশোরের ঝিনাইদহে বাগুটিয়া গ্রামে। শানিত মেধার অধিকারী ইলা সেন কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ ও পরে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। বেথুন কলেজের ছাত্রী থাকাকালে সনাতনপন্থি হিন্দুদের হিন্দু কোড বিলের বিরোধিতা করে মহিলা সমিতির সক্রিয় সদস্য হিসেবে নারী আন্দোলনে পদার্পণ করেন ইলা সেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইলা সেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভের মাধ্যমে বিপ্লবের দীক্ষা গ্রহণ করেন।

১৯৪৫ সালে নবাবগঞ্জের জমিদারপুত্র প্রখ্যাত কমিউনিস্ট রমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে রাখিবন্ধনে আবদ্ধ হন ইলা সেন এবং ইলা মিত্র নাম ধারণ করেন। রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের পুত্রবধূ হলেও অতি অল্প সময়ে গ্রামের কৃষক-প্রজাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার সখ্য। জমিদার পরিবারের প্রাচীর ডিঙিয়ে স্বামী ও স্বামীর বন্ধুর সহায়তায় গড়ে ওঠা স্কুলে গ্রামের নিরক্ষর মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার মহান ব্রত কাঁধে তুলে নেন ইলা মিত্র। গ্রামের গরিব কৃষকদের প্রতি তার দরদ ও ত্যাগের জন্যই এলাকাবাসী হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেন এবং ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠেন নাচোলের রানীমা।

বাংলা ১৩৫০ মন্বন্তরের সময় বাংলার কৃষকদের ওপর জমিদারদের শোষণের মাত্রা আরও তীব্র হয়ে উঠলে দানা বাঁধে তেভাগা আন্দোলনের। ইলা মিত্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তেভাগা আন্দোলন স্থায়ী হয়েছিল পাকিস্তান আমল পর্যন্ত।

১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে ইলা মিত্র নোয়াখালীর দাঙ্গাবিধ্বস্ত হাসনাবাদে পুনর্বাসন কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর অধিকাংশ হিন্দু ভারতে পাড়ি জমালেও ইলা মিত্র ও রমেন্দ্র মিত্র ভালোবাসার টানে থেকে যান এপার বাংলায়। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতাদের ওপর নেমে আসে অমানুষিক জুলুম-নির্যাতন। ইলা মিত্র ও তার স্বামী রমেন্দ্র মিত্র নাচোলের চণ্ডীপুর গ্রামে আত্মগোপন করলে সেখানকার কৃষকরা রানীমা ইলা মিত্র ও তার স্বামী রামেন্দ্র মিত্রকে তাদের বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে শাহবাগ চত্বরে ইলা মিত্রের নামে স্লোগান, লাঠি মিছিল, রাত ১২টায় শাহবাগ থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত নারীদের শিকল ভাঙা পদযাত্রা ইত্যাদি কর্মসূচি আমাদের ধর্ষণ, নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনা ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখায়।

ইতিহাসের পাতায় ইলা মিত্রের জীবন কাহিনি ব্যাপকভাবে বিবৃত না হলেও ধর্ষণ-নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ইলা মিত্র আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক