জন্মদিন

রাজনীতির কিংবদন্তি

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২০

আবুল খায়ের

রাজনীতির কিংবদন্তি

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তোফায়েল আহমেদ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য, লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সুদূর মফস্বল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসা তোফায়েল আহমেদের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তার পিতা আজহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ জীবন্ত কিংবদন্তি। ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সব পর্বে তিনি প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছেন। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানুষের ভোটের অধিকার থেকে ভাতের অধিকার- সব ক্ষেত্রে তিনি থেকেছেন প্রথম সারিতে। কখনও বঙ্গবন্ধুর পাশে, কখনও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পাশে। জন্মদিন উপলক্ষে তাকে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন ও সংগ্রামী শুভেচ্ছা।

১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ 'আগরতলা মামলা'য় আটক সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তিদানে তার নেতৃত্বে গণআন্দোলন গড়ে তোলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে জাতির পিতাকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন তিনি। ১৯৬৯ সালে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর ২ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ-পূর্ব ছাত্র ও গণআন্দোলনে সফল নেতৃত্ব প্রদান করায় তিনি দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেন।

১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলতখাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে 'মুজিব বাহিনী'র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেন। ১৯৭৩ সালে নিজ জেলা ভোলা থেকে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ঘোষণার পর তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় 'রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী' নিযুক্ত হন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে সফরসঙ্গী হন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পরপরই তাকে প্রথমে গৃহবন্দি ও পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি অবস্থায় তাকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়। ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। জেনারেল জিয়ার আমলে তার আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়; হাইকোর্ট তাকে জামিন প্রদান করলেও স্বৈরশাসক তাকে মুক্তি দেয়নি। তখন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে দীর্ঘ ৩৩ মাসের বন্দিদশা থেকে তিনি মুক্তিলাভ করেন। স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন মেয়াদে চারবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০২ সালে খালেদা-নিজামী জোট সরকারের শাসনামলে সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনৈতিক জীবনে সর্বমোট সাতবার তিনি দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। এর মধ্যে সর্বমোট তিনবার তাকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়।

১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের গণরায়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

ষাট বছরের রাজনৈতিক জীবনে একই আদর্শ ও দলে ধারাবাহিকভাবে স্বীয় অবস্থান সমুন্নত রেখে 'রাজনৈতিক ইন্টেগ্রিটি' বজায় রাখার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। অনাগত দিনে স্বাধীন বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ সহচর তোফায়েল আহমেদ দেশের চরম দুঃসময়ের কালপর্বে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে দুঃসাহসের প্রতীক। আমরা দেশবরেণ্য এই সংগ্রামী নেতার দীর্ঘজীবন কামনা করি।

 বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

khayer69@gmail.com