প্রশ্ন হতে পারে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বেদনার বিষয় কী? দুই দফা অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইতিহাসে প্রথম হওয়া না বৃহত্তম গলফ টুর্নামেন্টের আয়োজক হিসেবে বাদ পড়া?

এটা ঠিক, গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবনে হামলার উস্কানি দেওয়ার পর থেকে তার সময় খুব খারাপ যাচ্ছে। তার ভাবমূর্তি এতটাই করুণ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে- এখন তিনি যে আগামী সপ্তাহে নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে সমর্থকদের গোলমাল না করতে বলেছেন, সেটাই উত্তম পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে। ২০২২ সালে ট্রাম্প ন্যাশনাল গলফ ক্লাবে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও হাততালি পাচ্ছে। তিনি ইতোমধ্যে টুইটারে নিষিদ্ধ হয়েছেন। এখন যদি তদন্ত কর্মকর্তারা টেলিভিশন উপস্থিতিও নিষিদ্ধ করেন, তাহলে তার সব খেল খতম।

নভেম্বরের নির্বাচনে হার স্বীকার না করার পর থেকেই ট্রাম্পের বহুমাত্রিক নাটক দেখতে হচ্ছে আমাদের। তিনি ভূতগ্রস্ত মানুষের মতো বারবার বলেই যাচ্ছেন যে বাইডেন সমর্থকরা নির্বাচনে জালিয়াতি করেছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প সমর্থকরা ওয়াশিংটন ডিসিতে জড়ো হয়েছিল, যেখানে তিনি 'উপদেশ' দেন- 'নারকীয় লড়াই না করলে এই দেশ আর আপনাদের থাকবে না।' তারা শিং উঁচিয়ে কংগ্রেস ভবনের দিকে ছুটে গিয়েছিল। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক জনপ্রতিনিধিরাও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজেদের দাপ্তরিক কক্ষ লণ্ডভণ্ড হতে দেখেছেন। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান পার্টির তৃতীয় শীর্ষ ব্যক্তি লিজ চেনি বলেছেন- 'ট্রাম্পই এই আগুনে দিয়াশলাই ঠুকেছে।' আর বুধবার প্রেসিডেন্টের নিজ দলের ১০ সদস্য তাকে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

অভিশংসনের পর হোয়াইট হাউস থেকে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্পকে বলতে শোনা গেছে- 'আমাদের দেশে সহিংসতা ও ভাঙচুরের কোনো স্থান নেই।' অথচ একদিন আগেই তিনি টেক্সাসে গিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্ত দেয়ালের একটি অংশ 'উদ্বোধন' করে তিনি সমালোচনার বন্যা সামাল দিতে পারবেন। অথচ ওই দেয়াল যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের পয়সায় নির্মিত। তার প্রতিশ্রুতি মতো মেক্সিকো এক পয়সাও দেয়নি। রওনা দেওয়ার আগে মিনিটখানেক থেমে বলেছিলেন- 'মানুষ মনে করে, আমি যা বলেছি তা সম্পূর্ণ যথাযথ।'

ট্রাম্পের এই 'মানুষ' কারা? তার পরিবারের বাইরে থাকতে পারে রুডি গুলিয়ানি। এই বাজে লোকটিও এখন ট্রাম্পের কাছে ঘেঁষতে চাচ্ছেন না। ট্রাম্পকে সবাই এখন এড়িয়ে চলছে এবং যত দ্রুত সম্ভব ছেড়ে যাচ্ছে। তিনিও যাকে সামনে পাচ্ছেন, তার পক্ষে কংগ্রেস ভবনে গিয়ে হামলা না করার জন্য এক হাত দেখে নিচ্ছেন। ফলে হোয়াইট হাউস খালি হওয়ার যেন হিড়িক পড়েছে।

সর্বশেষ ট্রাম্প হারিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে। বস্তুত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করা কতটা কঠিন, তার উত্তম উদাহরণ হলেন পেন্স। তিনি 'মহাপাপ' করেছিলেন এই ভনিতা না করে যে ট্রাম্প নির্বাচনে হারেননি। এর 'শাস্তি' হিসেবে ট্রাম্প সমর্থকরা 'মাইক পেন্সের ফাঁসি চাই' স্লোগান দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট নিজেও ভাইস প্রেসিডেন্টকে 'গোল্লায় যাও' বলেছেন।

হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন রিয়েলিটি শো চালু করতে পারেন- 'দেশপ্রেমিক হও অথবা গোল্লায় যাও'। কিছু একটা করার কথা তাকে ভাবতেই হবে। শেষ পর্যন্ত উপদেষ্টারা হয়তো তাকে বোঝাতে পেরেছেন যে আগামী সপ্তাহে তিনি আর প্রেসিডেন্ট থাকছেন না। যাকে তাকে ক্ষমতা দেখানো বা ক্ষমা করার সুযোগ তিনি আর পাবেন না।

একটা উপায় হতে পারত অবসর গ্রহণ। কিন্তু সেটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নয়। পরিণত বয়সের পুরো সময় তিনি নিজেকে 'অবিশ্বাস্য ধনী' দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তিনি 'অবিশ্বাস্য ঋণগ্রস্ত'। এখন যখন ট্রাম্পতরী ডুবছে, ঋণদাতা ইঁদুরগুলো একের পর এক ঝাঁপিয়ে সরে যাচ্ছে। যে ব্যাংকগুলো তাকে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ধার দিয়েছিল, এখন ফেরত চাইছে। যেমন ডয়েচে ব্যাংক ট্রাম্প কোম্পানির কাছে ৩৩ কোটি ডলার পাওনা। ওই অর্থ ২০২৩ সালের মধ্যে শোধ করার কথা। কিন্তু ব্যাংকটি এখনই সব ফেরত চাইছে। কারণ, তারা ধারণা করছে, তার আগেই ম্যানহাটন ডিস্ট্রিক্ট আইনজীবীরা ট্রাম্প কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যাংক ও ট্যাক্স ফাঁকির তদন্ত সমাপ্ত করে ফেলবে। ডুবন্ত জাহাজে কে আর বাজি ধরতে চায়?

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেসিডেন্সি যাওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প কোথায় যাবেন? তিনি তার জীবনের সব সাফল্য নিজের নামে চালিয়েছিলেন। এখন সেই নামটিই হয়ে উঠেছে ঠাট্টার পাত্র। রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন চাওয়ার সময়ই প্রশ্ন উঠেছিল- যে ব্যক্তি কোনোদিন কোনো 'পাবলিক সার্ভিস' দেননি, তিনি কীভাবে প্রেসিডেন্ট হবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প সবসময় যে 'অবদান' তুলে ধরেছেন, তা হচ্ছে নিউইয়র্ক সিটির সেন্ট্রাল পার্ক আইস-স্কেটিং রিঙ্ক। সবসময় গলা ফুলিয়ে বলে এসেছেন, ১৯৮৬ সালে তিনি এর সংস্কার করেছেন এবং তখন থেকে ক্রীড়া ক্ষেত্রটি ট্রাম্প কোম্পানির পক্ষে চালিয়ে আসছেন। সিটি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে।

হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর তিনি সেখানে গিয়ে 'মেরি গো রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড' করতে পারতেন। কিন্তু মঙ্গলবারই নিউইয়র্ক সিটি মেয়র জানিয়েছেন, তারা আইস স্কেটিং ক্ষেত্রটির ইজারা বাতিল করতে যাচ্ছেন।

লেখক ও কলামিস্ট; নিউইয়র্ক টাইমস থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে ভাষান্তরিত

মন্তব্য করুন