নদনদী হত্যায় মানুষের হাতে অস্ত্র না থাকলেও মনে থাকে লোভ। এই লোভে তারা নিজেদের সঙ্গে পুরো জনপদকেও ডুবিয়ে দেয়। এতে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কৃষি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা হারিয়ে যায়, কোপ পড়ে জীবন-জীবিকায়। সঙ্গে মৃত্যু ঘটে নদীমুখী সংস্কৃতির। নদীকে বাঁচতে না দেওয়ার মানে তাই কেবল এর জলধারা বন্ধ করাই নয়, সভ্যতার ধারাপ্রবাহও রুদ্ধ করা।

বঙ্গদেশে নদনদী দখল-দূষণের যে বিপুল বিঘ্নহীন 'আয়োজন' তাতে বিষয়টি কেবল 'স্বাভাবিকতার' রূপই পায়নি, উৎসবের আবহও যেন যুক্ত হয়েছে এতে! যদিও নদনদী-সংশ্নিষ্ট অবৈধ দখল, দূষণ, নাব্য হরণসহ পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি ফৌজদারি অপরাধ। পানি আইন, দণ্ডবিধি ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেও আছে শাস্তির বিধান। তবে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়ার সুযোগ আইনে থাকলেও কোনো 'নদীখোর' এখন পর্যন্ত ১০ দিনও কারা ভোগ করেছে, এমনটা জানা যায় না। অথচ নদীরক্ষা কমিশনের হিসাবে সারাদেশে নদী দখলদারের সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৪৯ জন। অবশ্য কমিশনের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ১৮ হাজার ৭৮২ দখলদারকে উচ্ছেদেরও দাবি করা হয়েছে।

'জীবন্ত সত্তা' ঢাকার বুড়িগঙ্গার পাড়ে নাক না চেপে অবশ্য দুই দণ্ড দাঁড়ানো যায় না। বসতবাড়ি, অফিস-কাছারি ও কলকারখানায় মানুষের পক্ষে যত ধরনের বর্জ্য তৈরি সম্ভব, তার সবই গিয়ে মিশছে নদীতে। 'ভাগাড়ের নাম বুড়িগঙ্গা' বলে কেউ চ্যালেঞ্জ ছুড়লে তাকে মোকাবিলা করার 'সাহস' বোধহয় কারও নেই। অথচ ঢাকার জন্ম হয়েছে শুধু এর চারপাশে ছয়টি নদনদী আছে বলে। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-নিরক্ষর, রাজনীতিক-ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের কোনো শ্রেণিপেশার মানুষ নদনদী দখল-দূষণে যুক্ত নয়? নদীর প্রাণসংশয় মানে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য টলমল। নদীর মৃত্যু মানে জনপদেরও মরণদশা।

বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও কর্ণফুলী ইত্যাদি নদীর দখল-দূষণ রোধে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। আদালত রায়-নির্দেশনাও দিয়েছেন। কিন্তু নদীর শুশ্রূষা হয়নি। ঢাকার নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ভুল জায়গায় পিলার বসানোর খবরে তাই বিস্ময় জাগে না! অবশ্য নদী ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এই ভুল ধরিয়ে দেওয়ার 'এখতিয়ার' নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিআইডব্লিউটিএ। দেশবাসী এর আগে একই ধরনের প্রশ্ন তুলতে দেখেছে এক সংসদ সদস্যকে। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের মোট ৫৪ একর জায়গা দখল করে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার তথ্য উঠে এসেছে। কমিশন বলছে, এই দখল পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অথচ তিনি এর এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি আদালতেরও দ্বারস্থ হন।

নদনদীর মালিকানা ও স্বত্ব জনগণের, এমনকি রাষ্ট্রেরও নয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, এই মালিকানা ও স্বত্ব রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার। এর পরও নদনদী দখল-দূষণের মচ্ছবে এতটুকু লাগাম পড়েনি। তবে 'কাগুজে' অগ্রগতি হয়েছে বৈকি।

নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্তকরণসহ নাব্য বৃদ্ধি, জনসচেতনতা তৈরিতে সব মিলিয়ে ১২২টি সুপারিশ করেছে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন। আইনের খসড়াও প্রস্তুত। বাংলাদেশের সব নদনদী, জলাধার, খালবিল, সমুদ্র উপকূল, হাওর-বাঁওড়, জলাভূমি, জলাশয়, ঝরনা, হ্রদ, পানির উৎস- সবকিছুই এই আইন ও কমিশনের আওতায় থাকার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে নদনদী, জলাধার, পানির উৎস রক্ষা করা, অবৈধ দখলমুক্তকরণ, নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ, বিলুপ্ত বা মৃতপ্রায় নদী খননের বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরির কথা। প্রতিটি বিভাগে স্থাপন করা হবে এক বা একাধিক 'নদীরক্ষা আদালত'। এক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আরেক কর্তৃপক্ষের কাছে 'হাতবদলে' নদনদীকে বাঁচানো যাবে না। দরকার কর্তৃপক্ষের 'হাত' সক্রিয় হওয়ার। তাহলেই নদী হত্যার দাগ আর কেউ নদীর জলে ধুয়ে পার পাবে না।

সাংবাদিক

hello.hasanimam@gmail.com

মন্তব্য করুন