স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করার মুহূর্তে অত্যন্ত লজ্জা ও পরিতাপের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, একাত্তরে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, স্বাধীনতার এত বছরেও সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন করা যায়নি!

সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল-জামুকার সুপারিশ ছাড়া ২০০২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যাদের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বেসামরিক গেজেটভুক্ত হয়েছে, ফের তাদের যাচাই-বাছাই করা হবে। আজব ব্যাপার হলো, জামুকার স্মারক নম্বর ৪৮.০২.৩০.২০৩.২০.০৭০.১৬/৬৭১, তারিখ-১৩ এপ্রিল ২০১৭, পত্রের আলোকে বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটির সভাপতি ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুছ, সদস্য সচিব ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঝুমুর বালা। সদস্য ছিলেন জেলা কমান্ডার প্রতিনিধি সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আ ন ম আবদুল হাকিম, জামুকার প্রতিনিধি সদস্য এসএম মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিনিধি সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আ. আউয়াল, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধি সদস্য হাবিলদার (অব.) আলী হোসেন এবং উপজেলা কমান্ডার মো. আ. ওয়াদুদ সরদার।

কমিটির সদস্যরা নির্মোহভাবে চুলচেরা বিশ্নেষণ ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেন। এতে ৬৭ জন অমুক্তিযোদ্ধা শনাক্ত হয়। শনাক্তকৃত অমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটি উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (স্মারক নম্বর ০৫.১০.০৬৯৪.০০২.০০১.১৭-৩১৭, তারিখ- ১০ মে সংখ্যায়) জামুকায় প্রেরণ করেন। বাছাইকৃত অমুক্তিযোদ্ধাদের ওই তালিকার মধ্যে বেসামরিক গেজেট ও লালবার্তাভুক্ত অমুক্তিযোদ্ধাও আছেন। উজিরপুর উপজেলার লালবার্তা পর্যালোচনা করে কমিটি দেখতে পেয়েছে যে, লালবার্তায় অনেক অমুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন এবং তাদের যাচাই-বাছাই করে অমুক্তিযোদ্ধা বলে শনাক্ত করেছে, জামুকা তা কার্যকর করেনি। অন্যদিকে, মুক্তিবার্তায় বেশকিছু সংখ্যক সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে যা আদৌ লাল তালিকাভুক্ত হয়নি। বিগত বাছাইয়ে বাদ পড়া কিছু মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহণের শর্ত হিসেবে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে মুচলেকা দিয়ে ভাতা গ্রহণ করছেন। সে মুচলেকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে সংরক্ষিত আছে। অপ্রিয় হলেও সত্য, একমাত্র ভারতীয় তালিকা বাদে অন্যান্য বার্তা যেমন- লালবার্তা, মুক্তিবার্তা, বেসামরিক গেজেটগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রই ত্রুটিপূর্ণ। বর্তমানে জামুকার নির্দেশনা রয়েছে কেবলমাত্র বেসামরিক গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হবে না? প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলেছেন, 'আমার প্রতিস্বাক্ষরিত সার্টিফিকেটেও যদি কোনো অমুক্তিযোদ্ধার প্রমাণ পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রেও তাকে বাদ দিতে হবে।' সে ক্ষেত্রে লাল মুক্তিবার্তাও যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আসে।

আরও প্রশ্ন থেকে যায়, জামুকার নির্দেশনা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পরও উজিরপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কেন এত টানাহ্যাঁচড়া? বিগত সরকার ও বর্তমান সরকারের আমল মিলিয়ে উজিরপুরে অন্তত পাঁচবার যাচাই-বাছাই হয়েছে। প্রত্যেকবারেই মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ চিত্র শুধু এক উপজেলার নয়, দেশের সর্বত্রই একই অবস্থা। বিগত যাচাই-বাছাইয়ে উজিরপুরে যারা অমুক্তিযোদ্ধা শনাক্ত হয়েছিলেন, বর্তমানে জামুকার পত্র নং ৪৮.০২০০০০.০০.০০.২৯২.১৮.০৫ তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০২১ অনুযায়ী তারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। আর যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তারা পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় এসেছেন। জামুকার এই তুঘলকি পরিপত্র মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে বিভ্রান্ত করছে।

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির গর্ব এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের নিয়ে নানা বিভ্রান্তি চলছে এবং নানাভাবে হেয় করা হচ্ছে। জাতি যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে, ঠিক তখন আবার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, মুক্তিযোদ্ধাদের হয়রানি করার জন্যই কি এই তালিকা? বয়সের ভারে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা নুয়ে পড়েছেন। তার পরও তালিকায় নাম নেই অনেকের। আবার অনেক অমুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকায় আছে। বারবার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে এভাবেই চলছে ছেলেখেলা। পাশাপাশি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করে মুক্তিযোদ্ধাদের আবারও হয়রানি করছে। এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্যও অপমানজনক বটে।

আমাদের জানামতে, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতেও গড়িয়েছে। এই মর্মে সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনাকে পাশ কাটিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে একটি স্বার্থান্বেষী মহল জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার সব তালিকা শক্ত হাতে বাছাই করা হলে সম্মানী ভাতা নামক বেহাত হওয়া রাষ্ট্রীয় অনেক অর্থের সাশ্রয় হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এমতাবস্থায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়নের জন্য দুটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রচলিত নিয়মানুযায়ী হাইকোর্টের নির্দেশনায় একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে অমুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে থেকে প্রথিতযশা কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন সাহসী যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজ নিজ থানা এলাকায় সুপরিচিত এবং বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিতর্কহীন, তাদের সমন্বয়ে এগারো সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এতে করে জাতি একটি নির্ভুল মুক্তিযোদ্ধা তালিকা পেতে সক্ষম হবে বলে আমরা মনে করি। প্রয়োজনে অধিকতর স্বচ্ছ বাছাইয়ের জন্য ইউনিয়নে বাছাই কমিটি করা যেতে পারে। বর্তমান সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ-দুঃখ নিরসনকল্পে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জামুকার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক: বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা

মন্তব্য করুন